২০২৫ সাল বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য এক গভীর সংকটের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এ বছরটি ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক ধরনের কঠিন হিসাব-নিকাশের। যখন দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যাগুলো অচিন্তনীয় লুটপাট আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সাল বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য এক গভীর সংকটের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এ বছরটি ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক ধরনের কঠিন হিসাব-নিকাশের। যখন দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যাগুলো অচিন্তনীয় লুটপাট আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। ব্যাংক খাতের মূল সংকটের কেন্দ্রে ছিল উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়া খেলাপি ঋণ, যা তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি মূলধনের ঘাটতি, সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আমানতকারীদের আস্থা হ্রাস। এ সংকট মোকাবেলায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরি পদক্ষেপ নিলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য এখনো প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার।
খেলাপি ঋণ একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে হাজির: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকায়, যা মোট বকেয়া ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দেয়ার মতো একটি সংকেত। কিছু ব্যাংকে এ হার ৬০-৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। বড় করপোরেট গ্রুপগুলো, বিশেষ করে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ঋণ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো—এ খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশের জন্য দায়ী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকগুলো ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে আসে, যা সমস্যাটির গভীরতা আরো স্পষ্ট করে তুলেছে।
মূলধন সংকট ও তার প্রভাব: রাষ্ট্রায়ত্ত ও কিছু বেসরকারি ব্যাংকে মূলধনের মারাত্মক ঘাটতি দেখা গেছে। এ ঘাটতি শুধু ব্যাংকগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই ঝুঁকিতে ফেলেনি, বরং পুরো অর্থনীতিকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। উচ্চ সুদের হার (পলিসি রেট ১০ শতাংশ এবং ঋণের সুদের হার ১৪-১৫ শতাংশ) ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করেছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
সুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: ব্যাংক খাতের এ চরম সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো সুশাসনের অভাব এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে অদক্ষ ও রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকদের আধিপত্য, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং ঋণ অনুমোদনে স্বজনপ্রীতি এবং পরিচালক ও ব্যবস্থাপনার যোগসাজশ ব্যাংক খাতের সংকটকে আরো গভীরতর করে তুলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে অনেকাংশে অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল, যা সমস্যাগুলো সমাধানের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে বেশকিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে স্বতন্ত্র পরিচালকদের সমন্বয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেছে। এর প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে ব্যাংকগুলোয় সুশাসন ফিরিয়ে আনা।
আমানতকারীদের আস্থা হ্রাস ও তার ফলাফল: খেলাপি ঋণ ও আর্থিক কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ পাওয়ায় সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা নষ্ট হয়েছে। কিছু ব্যাংকে ব্যাপক তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে, যেখানে আমানতকারীরা তাদের টাকা তোলার জন্য ব্যাংক শাখাগুলোয় ভিড় জমিয়েছেন। এ আস্থাহীনতা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ: সংকট মোকাবেলায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। নতুন ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করে সরকার এটিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে, যা দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সহায়তা না দেয়ার একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।
আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স-২০২৫ এবং ডিপোজিট প্রোটেকশন অর্ডিন্যান্স-২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সংকটকালীন হস্তক্ষেপের জন্য একটি আইনগত কাঠামো প্রদান করা হয়েছে। আমানত সুরক্ষার সীমা ১-২ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যা ৯৩ শতাংশ আমানতকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।
অমীমাংসিত বিষয়গুলো ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জগুলো: সরকারের নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও বেশকিছু চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার-১৯৭২ সংশোধন করা, ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংস্কারসহ আরো কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নিতে হবে যা রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কখনো সম্ভব নয়। এছাড়া ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আইনের দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি এখনো খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের পথে বিরাট এক বাধা হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তা ও পুনঃতফসিলীকরণের বিভিন্ন সার্কুলার যা ঋণখেলাপি আপাতদৃষ্টিতে কমালেও ব্যাংকে নগদপ্রবাহের কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না থাকা এবং দুই বছর গ্রেস পিরিয়ডে এ ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ মূলত স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে বলেই অভিজ্ঞ ব্যাংকাররা মনে করেন।
সার্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ইতিবাচক দিকগুলো: ২০২৫ সালে উচ্চ মূল্যস্ফীতি (প্রায় ৮ শতাংশ), বৈদেশিক রিজার্ভের চাপ এবং অর্থনৈতিক নিম্নগামিতা ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলেছে। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ রেকর্ড পরিমাণে (৩০ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার) বৃদ্ধি এবং হুন্ডি/হাওলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা বৈদেশিক রিজার্ভকে ৩২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে সাহায্য করেছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে।
প্রযুক্তির ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: বর্তমান ব্যাংক খাত ডিজিটাল ব্যাংকিং, এআই-ভিত্তিক সেবাগুলো এবং সবুজ ও টেকসই অর্থায়নের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার জন্য চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকিং লাইসেন্সের জন্য পুনরায় আবেদন আহ্বান করেছে, যা ভবিষ্যতে ব্যাংকিং সেবাকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সংকট থেকে শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ: ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকট আমাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা দিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্বল নিয়মকানুন এবং জবাবদিহি ও সুশাসনের অভাব যেকোনো খাতকে অচিরেই ধ্বংস করতে পারে। অতি জরুরি পদক্ষেপগুলো প্রশংসনীয় হতে পারে কিন্তু টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন প্রকৃত সুশাসনের সুসংগঠিত কাঠামো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনের দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
ভবিষ্যতে এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরি—
খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা: দ্রুত ও দক্ষ ঋণ আদায় কার্যক্রম গ্রহণ, ফলপ্রসূ ঋণ ট্রাইব্যুনাল এবং বড় ও করপোরেট ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ;
সুশাসন নিশ্চিতকরণ: ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ পরিচালক নিয়োগ; অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন বিভাগ শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা।
আইনি ও নীতিগত সংস্কার: বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতকরণ, ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধিবিধান কঠোর করা এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা;
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো: ডিজিটাল ব্যাংকিং, এআই এবং ফিনটেকের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি।
আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা: আমানতকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা, যেকোনো অনিয়মের তদন্ত ও বিচার এবং ডিপোজিট প্রটেকশন জোরদারকরণ;
২০২৫ সাল আমাদেরকে দেখিয়েছে যে ব্যাংক খাতের সংকট শুধু একটি অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুও বটে। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দরকার সব মহলের সামগ্রিক সহযোগিতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সততা। আমরা স্বপ্ন দেখি, ২০২৬ সালে আমরা একটি অতিমাত্রায় স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেখতে পাব, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সত্যিকার অর্থেই ভূমিকা রাখবে।
ড. মো. তৌহিদুল আলম খান: এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী।
সূত্র: বণিক বার্তা

