যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তা যারা ওয়াশিংটন ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সংক্রান্ত আলোচনার সঙ্গে পরিচিত তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের বিশ্বাস হলো সময় তাদের পক্ষেই রয়েছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হবে কি না—এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এক ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির ও প্রশমনের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে–নিচে “বুনন” করছেন।
নেতৃত্ব পর্যায়ে সরবরাহ করা বিশ্লেষণ সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা জানান, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে না যে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভগুলো শিগগিরই থেমে যাবে।
ইরানের ভেঙে পড়া অর্থনীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে এসব বিক্ষোভ শুরু হয়। এগুলো পরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ঐতিহ্যগত সমর্থনভিত্তি—যেমন গ্রামীণ শহর ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
“প্রশাসনের বিশ্বাস, এই বিক্ষোভগুলোকে আর আগের মতো বাক্সের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখা যাবে না, এবং এটাই সরকার পরিবর্তনের উপযুক্ত মুহূর্ত। তারা বিবেচনা করছে—বিক্ষোভকে সমর্থন করতে কোন ধরনের হামলা সবচেয়ে কার্যকর হবে এবং কী ধরনের পরিবর্তন দরকার,” তারা বলেন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবী বাসিজ মিলিশিয়ার ঘাঁটি।
ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্প নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন এবং দেশটি দূর থেকে “পরিচালনা” করার জন্য তার সরকারের অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে কাজ করার পথ বেছে নেন।
আবার ইরানের ক্ষেত্রেও যদি ট্রাম্প একই কৌশল প্রয়োগ করতে চান, তবে অপেক্ষা করার যুক্তি রয়েছে বলে জানান এক সাবেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা, যিনি সম্প্রতি পর্যন্ত ইরান–সংক্রান্ত কাজে যুক্ত ছিলেন।
তিনি বলেন, “যদি বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে এগোতে দেওয়া হয়, তাহলে বোঝা যাবে কে টিকে আছে এবং জনগণ আসলে কী চায়। বাস্তবতা হলো—পুরো দেশজুড়ে আমাদের গোপন অভিযান রয়েছে, অন্য দেশগুলোর সম্পদও আছে। তারা এই বিক্ষোভগুলোকে প্রভাবিত করছে। এখনই সামরিক পদক্ষেপ নিলে তা এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।”
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ভেতরে কোনো ধরনের অভিযানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে বিদেশি শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে কিছু নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন, যারা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলা করতে দেরি করার পেছনে লজিস্টিক কারণও রয়েছে।
ইন্টারসেপ্টর ও যুদ্ধজাহাজ
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী ও এর স্ট্রাইক গ্রুপ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা করছে, তবে সেখানে পৌঁছাতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগবে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তুত থাকতে হবে—ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের ওপর পাল্টা হামলা চালায়।
জুনে হামলার পর ইরান ইসরায়েলের দিকে ৫০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন ও ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভূপাতিত হয়, তবুও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে তেল আবিবের কেন্দ্রস্থলে আঘাত হানে।
প্যাট্রিয়ট প্যাক-৩, এসএম-৩ ও থাড ইন্টারসেপ্টরের মতো প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মার্কিন মজুত এখনো কম—এমনটাই জানিয়েছেন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পকে ইরানে হামলা পিছিয়ে দিতে অনুরোধ করেছিলেন বলেও জানা যায়।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর জবাবে ইরান কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। ইরান আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছিল, ফলে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত ছিল। তবে এবার, বিশেষজ্ঞদের মতে, তেহরান যখন ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে তারা অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখতে পারে। এতে তারা আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে—মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানো বা বৈশ্বিক তেলের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হওয়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে।
বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন ইরানে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতে ২,৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন।
ইরান–সংক্রান্ত আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সামনে রয়েছে শহীদ স্মরণ অনুষ্ঠান, রমজান, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের বার্ষিকী এবং নওরোজ।
ছুটির সময়গুলোতে উত্তেজনা বাড়ার ইতিহাস রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত শাহের বিরুদ্ধে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবও বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর বার্ষিকী ঘিরে গতি পেয়েছিল। ইরানি নববর্ষ নওরোজ ২০ মার্চ, আর রমজান শুরু হওয়ার কথা আগামী মাসে।
এক বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান প্রশমন সাময়িক। পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে ইরানের ভেতরের পরিস্থিতির অগ্রগতির ওপর। তার ভাষায়, ট্রাম্প ধারণা করছেন—এই শাসনব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে না।
এ ছাড়া ট্রাম্প যে অনিশ্চয়তা কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন, সেটিও সুপরিচিত।
‘তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ’
মাসের পর মাস ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় হামলার ইঙ্গিত দিয়ে মাদুরোর সরকারকে চাপে রেখেছিলেন। পরে এক দুঃসাহসিক রাতের অভিযানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার নেতাকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে।
এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, “এটাই হলো ‘উইভ’। ট্রাম্প কখনো উত্তেজনা বাড়ান, কখনো কমান। প্রশ্ন হলো—এত তাড়াহুড়া কিসের?”
ট্রাম্পের উত্তেজনা প্রশমনের ভাষ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় আরব মিত্রদের—বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতার, সঙ্গে তুরস্ক—চাপের ফল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানকে তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালাতে নিষেধ করেছে। একই দেশগুলো জুনেও ট্রাম্পকে হামলা না করতে অনুরোধ করেছিল, তবে তিনি তা উপেক্ষা করেন।
এক সাবেক আরব কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পের জুনের হামলা পুরো অঞ্চলকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তার ভাষায়, “এবার সৌদি আরবের চাপ বিশেষভাবে তীব্র।”
তিনি বলেন, “আগে উপসাগরের দেশগুলো মনে করত না ট্রাম্প সত্যিই ইরানে হামলা করবেন। এখন ঝুঁকিটা বাস্তব হয়ে উঠেছে।”
‘সংকেত দেওয়া’
এক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্প উপসাগরীয় মিত্রদের তুষ্ট করার চেষ্টা করছেন—যারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ প্রযুক্তিপণ্য কিনছে এবং তার পরিবারের ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে।
তার ভাষায়, “ট্রাম্প শক্তি প্রয়োগের হুমকিকে একটি প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। যদি তা কাজ না করে, তবে মিত্রদের দেখাতে পারবেন—হুমকি দিয়েও ফল পাওয়া যায়নি।”
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরবে। ইরান এসব দেশের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তবে ওই ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলো বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
কূটনৈতিক ক্ষতি সীমিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র কাতারকে একটি বাধ্যতামূলক নয়—এমন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেয়। ন্যাটো সদস্য হওয়ায় তুরস্কের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সাবেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা ডেভিড শেঙ্কার বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি দেওয়া নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি “ট্রাম্প যখন হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন, তখন একটি বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।”
তার মতে, “এই নথিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট রাখা হয়েছে, যাতে প্রেসিডেন্টের হাতে নমনীয়তা থাকে। তবে এতে জটিলতাও বাড়ে।”
ট্রাম্প বলেন, “সহায়তা পথে রয়েছে,” এবং ইরানের বিক্ষোভকারীদের সরকারি প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানান। তিনি এই হুমকিকে বিক্ষোভকারীদের হত্যার সঙ্গে যুক্ত করেন। পরদিন তিনি দাবি করেন, হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে এবং বলেন, “আমরা অনেক প্রাণ বাঁচিয়েছি।”
শেঙ্কার বলেন, “যা কিছু করা হয়েছে, সবই যুক্তরাষ্ট্রকে এই (হামলার) জন্য প্রস্তুত করার অংশ। তিনি সংকেত দিচ্ছেন যে এটা আসছে।”
সূত্র: মিডল ইস্ট আই

