মুদ্রানীতি, মুদ্রাস্ফীতি আর মূল্যস্ফীতি—এই তিনটি শব্দ একে অপরের সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠ, যে একটির ছোঁয়ায় অন্য দুটি সরাসরি প্রভাবিত হয়। ভাবুন, মুদ্রানীতি হলো মূল নীতি, যা অর্থনীতির চলাচল নির্ধারণ করে। এ নীতির ওপর নির্ভর করে মুদ্রাস্ফীতি, অর্থাৎ বাজারে টাকা কত দ্রুত ঘুরছে বা কমছে। আর এই মুদ্রাস্ফীতি ঠিক করে শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম কতটা ওঠবে—যাকে আমরা মূল্যস্ফীতি বলি।
সহজভাবে বলতে গেলে, মুদ্রাস্ফীতি হলো কারণ, আর মূল্যস্ফীতি তার প্রমাণ। যেখানে টাকা বেশি সহজলভ্য, সেখানে দাম বাড়ার প্রবণতা থাকে। অর্থাৎ, মুদ্রার গতিপথই নির্ধারণ করে অর্থনীতির দামের ওঠানামা। এক কথায়, মুদ্রানীতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং মূল্যস্ফীতি একসাথে অর্থনীতির গল্প বলে।
বাজারে মুদ্রার পরিমাণ বেশি হলে তাকে বলে মুদ্রাস্ফীতি। তবে মূল্যস্ফীতির জন্য এককভাবে মুদ্রাস্ফীতি দায়ী নয়। মুদ্রাস্ফীতির ফলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক দাম বেড়ে যাওয়া, যা সাধারণত চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকলে ঘটে থাকে। আমাদের দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি কিন্তু তাই নির্দেশ করে। দেশের অর্থনীতিবিদদের মতে চলমান মূল্যস্ফীতি সরবরাহজনিত। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবারের মুদ্রানীতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন দেশের জনগণ। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে তো বিস্তর আলোচনা প্রায় প্রতিদিনই চলছে। দেশের পত্র-পত্রিকা বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় চোখ রাখলে কোনো না কোনো জায়গায় এ নিয়ে প্রতিবেদন দেখতে পাবেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন কোনো বিষয় নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর তীব্রতা এত বেশি যে এটা নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনাচরণে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চলছে। খাদ্যপণ্য, চিকিৎসা, জ্বালানি, পরিবহন, শিক্ষা—এমন কোনো খাত নেই যেখানে মূল্যবৃদ্ধির ছাপ পড়েনি। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ-দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টসকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীরা। ওএমএসের ট্রাকের সামনে মানুষের ভিড় দেখলে তা আরো দৃশ্যমান হয়। দেশের চলমান এ পরিস্থিতির মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় মুদ্রানীতি এ মাসের শেষের দিকে প্রকাশ করতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার যদিও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে এবং দুই অংকের ঘর থেকে এক অংকে নিয়ে এসেছে। তথাপিও এটা সহনীয় মাত্রার অনেক ওপরে অবস্থান করছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ তথ্য বলছে, টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী হয়ে গত ডিসেম্বরে সামগ্রিকভাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশের দেশ ভারতে মূল্যস্ফীতির হার এখন ২ দশমিক ৭ শতাংশ। শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৭ দশমিক ১ শতাংশ থাকতে পারে। আইএমএফ চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) মুদ্রাস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর কয়েক দফা নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বেশকিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক-কর কমিয়ে বাজারের আমদানিপ্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাতে করে কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা অনুযায়ী মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রায় আসেনি।
তাই আসন্ন মুদ্রানীতিতেও ১০ শতাংশ নীতি সুদহার রাখা হতে পারে বলে জানা গেছে। কারণ এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনাও জরুরি। কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। দেশ যেহেতু একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে তাই এ সময়ে মানুষ নতুন উদ্যোগ নিতে ভেবেচিন্তে এগোতে চায়, সেক্ষেত্রে মুদ্রানীতি স্থিতাবস্থায় থাকাটাই হয়তো ভালো। সে কারণেই ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর মতো কোনো শিথিলতার পথে আপাতত যাচ্ছেন না নীতিনির্ধারকরা।
তবে ঋণের চাহিদাও কম এতে কোনো সন্দেহ নেই। ঋণপ্রবাহ বাড়ালেও এ মুহূর্তে নতুন বিনিয়োগ নাও হতে পারে বলে অনেকের ধারণা। নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে তাদের অর্থনৈতিক নীতি দেখে ব্যবসায়ী মহল নতুন উদ্যমে ব্যবসাবাণিজ্য প্রসারে এগিয়ে আসবেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তবে অনেকের ধারণা, যেহেতু রিজার্ভ বেড়েছে এবং ডলারের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, আমদানির খরচও কম তাই মুদ্রানীতিতে কিছুটা ছাড় দেয়া যেতে পারে। দেখা যাক কেমন হয় নতুন মুদ্রানীতি।
আনোয়ার ফারুক তালুকদার: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। সূত্র: বণিক বার্তা

