বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ অর্থবছরের বাকি বছরের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এবারও একই প্রশ্ন উঠেছে—সুদের হার কমানো উচিত কি না এবং অর্থনীতিতে শিথিল নীতি নেওয়া উচিত কি?
প্রাথমিক চাপ বোঝা যায়। হেডলাইন মুদ্রাস্ফীতি শীর্ষ থেকে কমেছে, বাস্তব সুদের হার ইতিবাচক, তবে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ এখনও দুর্বল। ব্যবসায়ীরা সস্তা ঋণের দাবিতে চাপ দিচ্ছে। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে যে সুদের হার কমানো সহজ এবং রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়।
কিন্তু তথ্য বিশ্লেষণ, জুলাই ২০১৯ থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত মাসিক তথ্য অনুযায়ী দেখায়, বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি কিভাবে বৃদ্ধি পায়, ছড়ায় এবং ধীরে কমে। এটি বোঝায় যে, এখনই সুদের হার কমানো হলে বিনিময় হারের মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি আবার বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে, স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস ধীর হবে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সহজ হবে না।
বাংলাদেশে হেডলাইন ভোক্তা মূল্যসূচক মুদ্রাস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী, তবে অপ্রতিরোধ্য নয়। একবার বৃদ্ধি পেলে কয়েক মাস ধরে পরিবারের ক্রয় ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তবে এটি অনির্দিষ্টভাবে বাড়ে না; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল মূল্যগত প্রবণতার দিকে ফিরে আসে।
এই স্থায়ীত্বের প্রধান কারণ হলো খাদ্যদ্রব্যের দাম। খাদ্য মূল্যস্ফীতি হেডলাইন মুদ্রাস্ফীতিকে দীর্ঘ সময় উচ্চ রাখে। তাই অর্থনীতি সংকীর্ণ হলেও মুদ্রাস্ফীতি অনেক সময় জেদি থাকে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ধীরগতিসম্পন্ন। প্রায় ৮৫% খাদ্য মূল্যধাক্কা এক মাস থেকে পরের মাসে চলে আসে। দামও অসমভাবে পরিবর্তিত হয়—শক পড়লে দ্রুত বাড়ে, কিন্তু পরিস্থিতি ভালো হলে ধীরে ধীরে কমে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ নীতি বা ঋণের বৃদ্ধির প্রভাব কম অনুভব করে। একবার বৃদ্ধি পেলে, মাসে মাত্র প্রায় ১৫% ধাক্কা কমে, ফলে হেডলাইন মুদ্রাস্ফীতিতে দীর্ঘ সময় উচ্চতা বজায় থাকে। এটি মূলত খাদ্য বাজারের কাঠামোগত সমস্যার কারণে। বাজারে প্রধান মধ্যস্থতাকারী, মূল্য নির্ধারণ এবং অনিয়মিত উপার্জন প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয়। তাই বিনিময় হার বা ঋণের অবস্থান এখানে বড় প্রভাব ফেলে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তথ্যও এটি নিশ্চিত করে—খাদ্য মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহ শৃঙ্খলে সীমিত প্রতিযোগিতা ও কাঠামোগত বাধার কারণে, অতিরিক্ত চাহিদির কারণে নয়। যদি খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী থাকে, তবে অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতি হলো সেই মাধ্যম যার মাধ্যমে শক সমগ্র অর্থনীতিতে ছড়ায়। অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতি দ্রুত প্রভাবিত হয় খাদ্যদ্রব্য ও বিনিময় হারের চাপের দ্বারা।
ধারণা অনুযায়ী, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে বাসভাড়া, সেবা চার্জ এবং মার্কআপও বাড়তে শুরু করে। প্রায় অর্ধেক স্থায়ী খাদ্য মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত অ-খাদ্য দামে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু উল্টো ঘটে না—অ-খাদ্য মূল্যবৃদ্ধি খাদ্য দামের ওপর প্রভাব ফেলে না।
অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতি বিনিময় হারের প্রতি সংবেদনশীল। টাকার ১% অবমূল্যায়ন কয়েক মাসের মধ্যে অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.১৫ পয়েন্ট বাড়ায়। এটি দ্রুত এবং অসমভাবে কাজ করে: অবমূল্যায়ন দাম বাড়ায়, কিন্তু টাকার মান বৃদ্ধি দাম কমাতে ধীরে প্রভাব ফেলে। এই কারণে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু ধীরে এবং অসমভাবে কমে। একবার বিনিময় হার স্থিতিশীল হলেও, খাদ্যদ্রব্যের দাম না কমলে হেডলাইন মুদ্রাস্ফীতি উচ্চ থাকে।
অর্থনৈতিক নীতির প্রভাব:
বাংলাদেশে মুদ্রানীতি প্রচলিত চাহিদা-ভিত্তিক মডেলের মতো কাজ করে না। মূল্যস্ফীতি অর্থাৎ খাদ্য ও জ্বালানি বাদে ভোক্তা মূল্যসূচক , এখানে অতিরিক্ত চাহিদার নির্দেশক নয়।
বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি মূলত বিনিময় হারের মাধ্যমে ছড়ায়। ঋণ সম্প্রসারণ বা সুদের হার কমালে আমদানি চাহিদা বাড়ে, যা টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। টাকার অবমূল্যায়ন দ্রুত এবং অসমভাবে অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, মুদ্রাস্ফীতি চাহিদা-নির্ভর নয়, বরং বিনিময়-নির্ভর।
অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতি “মূল্যস্ফীতির মূল অংশ হিসেবে কাজ করে, তবে এর মানে অতিরিক্ত চাহিদা নয়। এটি দেখায় কিভাবে খাদ্যদ্রব্যের দাম ও বিনিময় হারের চাপ সমগ্র অর্থনীতিতে ছড়াচ্ছে।
আসন্ন মুদ্রানীতি ঘোষণার মূল্যায়ন হবে: বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার কমাবে কি না, না কি স্থিতিশীল রাখবে। প্রমাণ দেখায়, এখনই সুদের হার কমানো ততটা যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নয়। এতে বিনিময় হার দুর্বল হতে পারে, মুদ্রাস্ফীতি আবার বৃদ্ধি পেতে পারে, এবং মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে।
মুদ্রানীতি একাই খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক খাদ্য বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন, বিদেশি মুদ্রা ও বাণিজ্যিক ঋণ ব্যবস্থায় স্পষ্ট, পূর্বনির্ধারিত নিয়ম প্রয়োগ করা। এতে সরবরাহ বাড়বে, দামের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
সরাসরি সুদের হার কমানো বা আমদানি ভর্তুকি দেয়ার চেয়ে, বাজারে কাঠামোগত সংস্কার ও নিয়মিত প্রবেশাধিকার দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর।
জাহিদ হোসেন: বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।

