‘বিদেশি সরকার কিংবা আন্তর্জাতিক চাপের কাছে আমরা মাথা নত করব না’—১৯৫১ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দাঁড়িয়ে এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক।
সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে আজ, যখন একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরির বহর ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে মিসাইলবাহী জাহাজ, তখন মোসাদ্দেকের সেই কথা ইতিহাসের উদ্ধৃতি নয়, বরং চলমান বাস্তবতার ভাষ্য বলে মনে হয়।
যুদ্ধজাহাজ কাকতালীয়ভাবে কোথাও গিয়ে ভেড়ে না। তাদের গতিবিধি উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দেয়। একইভাবে তথাকথিত গোয়েন্দা নথিপত্রও সাধারণত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য তৈরি হয় না। এগুলো বানানো হয় সামরিক আগ্রাসনের পক্ষে জনমত তৈরির জন্য। হস্তক্ষেপের যে কাঠামো আগেই দাঁড় করানো থাকে, এসব নথি তারই খুঁটি।
এ প্রেক্ষাপটেই ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়েছে এমন এক তথাকথিত চূড়ান্ত প্রমাণ, যার দাবি অনুযায়ী সাম্প্রতিক দেশব্যাপী দমন অভিযানে ইরানি কর্তৃপক্ষ শত শত আটক বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে। তেল আবিব এখন নিজেকে ইরানের বিরুদ্ধে প্রমাণ সরবরাহকারী নিরপেক্ষ মানবাধিকার সাক্ষী হিসেবে হাজির করছে। বিষয়টি হাস্যকরই হতো, যদি এর পরিণতি এত ভয়াবহ না হতো।
যে রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য লবিং করেছে, যে রাষ্ট্র প্রকাশ্যেই ইরানে সরকার পরিবর্তনকে কৌশলগত লক্ষ্য বলে ঘোষণা দিয়েছে এবং ইরান ভেঙে পড়লে যে রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে, তাকেই আজ নিরপেক্ষ বিচারকের আসনে বসানো হয়েছে। তেল আবিবকে কার্যত প্রধান কৌঁসুলি বানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্যকে প্রচারণা হিসেবে নয়, সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে।
এর অর্থ এই নয় যে ইরান সংকটে নেই। ইরান গভীর সংকটে আছে। কয়েক দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক অবরোধে মানুষের জীবনে যে ক্লান্তি জমেছে, তার ফলেই বিপুলসংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমেছে। তাদের অভিযোগ বাস্তব। তাদের ক্ষোভ অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু ইতিহাস বলে, ঠিক এমন মুহূর্তেই গণ-আন্দোলন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। শুধু রাষ্ট্রীয় দমন নয়, বাইরের শক্তির কবজায় পড়ার ঝুঁকিও তখন তীব্র হয়। বাইরের শক্তিরা অসন্তোষ তৈরি করে না। তারা বিদ্যমান অসন্তোষকে নিজেদের মতো করে পরিচালনা করে।
এই কাঠামো নতুন নয়। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে জোয়াও গুলার্তের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান, ১৯৭৩ সালে চিলিতে সালভাদোর আলেন্দের পতন, তারও আগে ১৯৬১ সালে কঙ্গোতে প্যাট্রিস লুমুম্বার উৎখাত ও হত্যা, এরপর আরব বসন্তের পরবর্তী দীর্ঘ পাল্টা বিপ্লবের ইতিহাস একই ছকে সাজানো। সব ঘটনা এক নয়। কিন্তু কাঠামো এতটাই পরিচিত যে সতর্ক হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যখনই কোনো দেশ বা আন্দোলন পশ্চিমা স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে, প্রথমে এসেছে নিষেধাজ্ঞা। তারপর পরিকল্পিত অর্থনৈতিক সংকট। অভ্যন্তরীণ বিভাজন উসকে দেওয়া। মিডিয়া প্রচারণা। পাল্টা বিপ্লবের অর্থায়ন। আর এসব ব্যর্থ হলে অভ্যুত্থান, দখলদারি বা তথাকথিত মুক্তির নামে যুদ্ধ।
ইরানের কাছে এসব তত্ত্ব নয়, বরং তাদের জীবন্ত স্মৃতি। ১৯৫৩ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছিল, কারণ তিনি ইরানের তেল জাতীয়করণ করেছিলেন। তখন অ্যাংলো–ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি ইরানকে তার নিজস্ব সম্পদের লাভের মাত্র ১৬ শতাংশ দিত।
ব্রিটেন তখন অবরোধ আরোপ করে। আবাদান শোধনাগার বন্ধ করে দেয়। বিদেশি ক্রেতাদের ইরানি তেল কিনতে বাধা দেয়। অর্থনীতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ ব্যর্থ হলে লন্ডন ওয়াশিংটনকে ঠেলে আনে। শীতল যুদ্ধের ভয় দেখানো হয়। সিআইএর অপারেশন অ্যাজাক্সের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়। রাজনীতিকদের ঘুষ দেওয়া হয়। ধর্মীয় নেতাদের হেনস্তা করা হয়। অস্থিরতা তৈরি করা হয়। মোসাদ্দেককে সরানো হয়। শাহকে ফিরিয়ে আনা হয়। এখন সিআইএ নিজেই এই অভ্যুত্থানকে অগণতান্ত্রিক বলে স্বীকার করে।
এ ঘটনাই শুধু ইরানের পথ বদলায়নি। এটি একটি ছক তৈরি করেছে। আজও সেই ছকের উপাদানগুলো স্পষ্ট। ইরানের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে হামলার খবর সেই পুরোনো বিভাজন উসকে দেওয়ার কৌশলের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
ইসরায়েলের কিছু গণমাধ্যম আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, সরকার পতনের পর ইরানকে সিরিয়ার মতো করে পুরোপুরি সামরিকভাবে অক্ষম করা হবে। অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনই শেষ কথা নয়। সেটি আরও বড় ধ্বংসের প্রথম ধাপ।
১৯৭৯ সালের পর থেকে ইরান আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে। সম্পদ জব্দ, তেল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শুরু হয়ে তা আর্থিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞাকে শান্তিপূর্ণ বিকল্প বলা হয়। বাস্তবে এটি ধীর অবরোধ। এতে মুদ্রা ধ্বংস হয়। সমাজ ভেঙে পড়ে। রাজনীতি চরমপন্থায় ঝুঁকে পড়ে। ভুগতে হয় সাধারণ মানুষকে।
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কেবল মানবাধিকার নয়; ইরানের তেল চীনের জন্য কৌশলগত শক্তি। ২০২৫ সালে চীনের সমুদ্রপথে আমদানি করা তেলের প্রায় ১৩ শতাংশ এসেছে ইরান থেকে।
এ প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বারবার সরাসরি ইরানি জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন। রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকার পতনের পর সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট আরও খোলামেলা ভাষায় বলেছেন অদৃশ্য হাত দিয়ে ঘটনাপ্রবাহ চালানোর কথা।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমে এমনকি বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র সরবরাহের কথাও গর্বের সঙ্গে বলা হয়েছে। এসব বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়। এটি একটি বিস্তৃত প্রচারণার অংশ।
রেজা পাহলভিকে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাও এই পরিকল্পনার অংশ। যিনি নিজের দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হামলার পক্ষে কথা বলেন, তাঁকেই ভবিষ্যতের নেতা বানানোর চেষ্টা চলছে। ইতিহাস যেন আবার মঞ্চস্থ হচ্ছে।
এর কোনোটাই ইরানি কর্তৃপক্ষের দমনকে বৈধতা দেয় না। কিন্তু বিদেশি নৈতিকতার মুখোশ যে কতটা ফাঁপা, তা স্পষ্ট করে। যারা অর্ধশতাব্দী ধরে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করেছে, যারা আশির দশকে এক ভয়াবহ প্রক্সি যুদ্ধে ইন্ধন জুগিয়েছে, যারা আজও দেশভাগের কথা বলে, তারাই আবার ইরানের মুক্তির ঠিকাদার সেজেছে।
১ ফেব্রুয়ারি ইরানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৭৯ সালের এই দিনে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি তেহরানে ফিরে আসেন। তাঁর ফিরে আসার মধ্য দিয়ে বিদেশি শক্তির সমর্থনে টিকে থাকা রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং ইরান আবার নিজের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ফিরে পায়। ঠিক এ সময়েই নতুন সামরিক প্রস্তুতির গতি বাড়া কাকতাল নয়।
সাত দশক আগেও ইরান যা বলেছিল, আজও সেটাই বলছে—সার্বভৌমত্ব। স্বাধীনতা। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। আর এটাই এমন এক দাবি, যা বাইরের শক্তিগুলো কখনো মেনে নেয়নি। ক্ষমা করেনি এবং ছাড় দিতেও রাজি নয়।
-
সুমাইয়া ঘানুশি: ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখক ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি-বিশেষজ্ঞ। সূত্র: মিডিল ইস্ট আই-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত।

