দীর্ঘ স্থবিরতার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে বহুদিন ঝুলে থাকা টেলিকম সংস্কার আবার আলোচনায় এসেছে। তবে কর ভার, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও মীমাংসিত না হওয়া বিরোধগুলো এখনও বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী ইয়াসির আজমান এ চ্যালেঞ্জগুলো সামনে তুলে ধরেছেন।
সম্প্রতি একাধিক গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “গত এক বছরে টেলিকম খাতে নীতিগতভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সমন্বিত টেলিকম লাইসেন্সিং নীতিমালার খসড়া, সাতশ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নিলামের প্রস্তুতি, সেবার মান সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনা এবং নতুন টেলিযোগাযোগ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ। এগুলো ভবিষ্যতের জন্য সুযোগ তৈরি করছে, তবে নতুন চ্যালেঞ্জও আনছে।”
ইয়াসির আজমান আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত অপারেটরদের কার্যক্রম কিছুটা সহজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নেটওয়ার্ক বা সিম-লকড হ্যান্ডসেট বিক্রির অনুমতি, সেবা প্যাকেজের সংখ্যা নির্ধারণে সীমা প্রত্যাহার, ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে কল করার সুবিধা এবং ডার্ক ফাইবার লিজ ব্যবহারের অনুমোদন। তিনি বলেন, “এসব সিদ্ধান্ত নেটওয়ার্ক সক্ষমতা ও গ্রাহক অভিজ্ঞতা উন্নয়নে সহায়ক হবে।”
বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে তিনি অতিরিক্ত কর ও আর্থিক চাপের কথা তুলে ধরেছেন। ইয়াসির আজমান বলেন, “করপোরেট কর, মূল্য সংযোজন কর, সম্পূরক শুল্ক, রাজস্ব ভাগ, সামাজিক দায় তহবিলসহ বিভিন্ন খাত মিলিয়ে গ্রাহকের ব্যয়ের বড় অংশ সরকারের কাছে চলে যায়। এই পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এটা শুধু আমাদের কোম্পানির সমস্যা নয়, পুরো খাতের বিষয়।”
তিনি নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আর্থিক বিরোধের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। “প্রায় তিন দশকের কার্যক্রমে একটি বার্ষিক নিরীক্ষা বিরোধ এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। এটি বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে অনিশ্চিত করে তুলছে। আন্তর্জাতিক সালিশ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে আমরা এটি সমাধানের চেষ্টা করছি এবং নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।”
প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক কাঠামোকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তিনি। ইয়াসির আজমান বলেন, “বাজারক্ষমতাসম্পন্ন অপারেটর হিসেবে প্রতিটি নতুন পণ্য বা সেবার জন্য দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। এতে বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত নতুন সেবা চালু করা কঠিন হয়ে পড়ে।”
স্পেকট্রাম ইস্যুতে তিনি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, “সাতশ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের নিলাম গুরুত্বপূর্ণ হলেও গ্রাহক পর্যায়ে ৫জি চাহিদা এখনও সীমিত। তাই প্রথমে ৪জি নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা প্রয়োজন, বিশেষ করে ভবনের ভিতরে এবং গ্রামীণ এলাকায় কাভারেজ বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
ইয়াসির আজমান মনে করেন, টেলিযোগাযোগ খাতকে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক খাত হিসেবে দেখা চলবে না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল সেবা ও অর্থনীতির বিস্তারে এর ভূমিকা অপরিহার্য। তাঁর ভাষায়, “নীতিগত স্থিতিশীলতা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না থাকলে দেশের ডিজিটাল উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।”

