২৪ জানুয়ারি চীন ঘোষণা করে যে তাদের দুই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, জেনারেল ঝাং ইউশিয়া এবং লিউ ঝেনলি- দলীয় শৃঙ্খলা ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্তের আওতায় এসেছেন।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা “চেয়ারম্যান রেসপন্সিবিলিটি সিস্টেমকে গুরুতরভাবে পদদলিত করেছেন”—অর্থাৎ তারা সরাসরি রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বকে অমান্য করেছেন এবং পার্টি ও পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) যুদ্ধক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।
তদন্তের গতি ও তীব্রতা চীনে স্বাধীন কর্তৃত্বের শেষ অংশটুকু অপসারণের ক্ষেত্রে শি’র দৃঢ় সংকল্পকে প্রতিফলিত করে। আগামী বছরের ২১তম পার্টি কংগ্রেসে নেতৃত্ব পুনর্নবীকরণের আগে পিএলএ-তে সম্ভাব্য ‘পর্বত-শীর্ষ’গুলোকে আগেভাগেই সরিয়ে দেওয়াই এই শুদ্ধিকরণের মূল লক্ষ্য।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—চীনের প্রতিরক্ষা নীতির জন্য এই শুদ্ধিকরণের অর্থ কী এবং এটি ভারতের নিরাপত্তার ওপর, বিশেষ করে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) বরাবর, কী প্রভাব ফেলতে পারে?
একটি কঠিন পছন্দ
পতিত জেনারেল ঝাং একজন ‘রাজপুত্র’, শি’র শৈশবের বন্ধু এবং ২০১২ সাল থেকে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। দীর্ঘদিন ধরে একজন অভিজ্ঞ সামরিক পেশাদার হিসেবে বিবেচিত ঝাং ও লিউ পিএলএ-র পুরোনো রক্ষীদের অন্তর্ভুক্ত এবং ভিয়েতনামে যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা।
অনুমান করা যায়, তাইওয়ানের আকস্মিক পরিস্থিতির জন্য পিএলএ-র দ্রুত পুনর্গঠন নিয়ে শি’র যে তাড়না, তার সঙ্গে তারা পুরোপুরি একমত হতে বা তাল মেলাতে পারেননি। পলিটব্যুরো সদস্য লি হংঝং যেমন বলেছেন, শি’র দৃষ্টিতে “যে আনুগত্য পরম নয়, তা পরম আনুগত্য নয়।” এই দৃষ্টিকোণ থেকেই শুদ্ধিকরণটি অনিবার্য হয়ে ওঠে।
তা সত্ত্বেও, এই পদক্ষেপ কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে নীরব উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বেইজিং দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে সম্ভাব্য অস্থিরতা ঠেকাতে—সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক পরিসরে একাধিক নিয়ন্ত্রণমূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে, এমনকি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মিডিয়াতেও কঠোর দেশপ্রেমিক আচরণের বার্তা ধারাবাহিকভাবে ছড়ানো হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা নীতির ওপর প্রভাব
চীনের অভিজাত রাজনীতিতে, বিশেষ করে পিএলএ-র ভেতরে, এই উত্থান-পতন কয়েক বছর ধরে চলতে পারে। পুরোনো প্রজন্মের পরিবর্তে কলঙ্কমুক্ত নতুন নেতৃত্ব দিয়ে একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশন (সিএমসি) পুনর্গঠনে সময় লাগবে। এমনকি আগামী বছরের পার্টি কংগ্রেসে নতুন মুখ যুক্ত হলেও যাচাই-বাছাই দীর্ঘ ও কঠোর হবে।
তবে পিএলএ-র প্রকৃত যুদ্ধক্ষমতা—যা মূলত থিয়েটার কমান্ড ও নিম্নস্তরের নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল—বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার সম্ভাবনা কম। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শীর্ষ পর্যায়ে ঝাঁকুনি এসেছে, পিএলএ এখনো মেজর জেনারেলসহ হাজার হাজার জেনারেল-র্যাঙ্কের কর্মকর্তায় পরিপূর্ণ। ফলে শি’র হাতে একাধিক দফায় পদোন্নতি ও শুদ্ধিকরণের সুযোগ থাকবে, যতক্ষণ না তিনি নিজের পছন্দের ও অনুগত কাঠামো দাঁড় করাতে পারেন।
তাইওয়ান ও ভারত
এই ঘটনাপ্রবাহ তাইওয়ানকে সাময়িক স্বস্তির সুযোগ দিয়েছে। শি যতই তাড়াহুড়ো করুন, তিনি এখনো একজন যুক্তিবাদী অভিনেতা এবং তাইওয়ান ফ্রন্টে পিএলএ-র সাফল্য নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী নন বলেই মনে হয়। একই সঙ্গে পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে পিএলএ-র প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন পাওয়া তার জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
তরুণ অফিসাররা নেতিবাচক তথ্য উপরে পাঠাতে দ্বিধা করতে পারেন, বিশেষ করে সাম্প্রতিক পতনের পর শি’র আস্থা অর্জনের চাপ আরো বেড়েছে। শি ধূসর-জোন অভিযানে তুলনামূলকভাবে আত্মবিশ্বাসী থাকবেন, কারণ সেগুলো ইচ্ছামতো ক্যালিব্রেট করা যায় এবং তাই এই কৌশল অব্যাহত থাকবে। কিন্তু সরাসরি সামরিক হামলা একটি বড় জুয়া, যা তার সব অর্জনকে অনিশ্চিত ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। ফলে শি এই ধরনের পদক্ষেপের খরচ ও লাভ নতুন করে হিসাব করবেন।
ভারতের ক্ষেত্রেও অনুরূপ চিত্র দেখা যায়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশ সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে—অর্থনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে এবং পারস্পরিক যোগাযোগ সহজ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাঠামোগত প্রতিযোগিতা কমেনি এবং প্রায় ৫০ হাজার সেনা এখনো এলএসি বরাবর মোতায়েন রয়েছে।
অপারেশন সিন্দুর চলাকালে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং ভারত মহাসাগরে তার বাড়তে থাকা উপস্থিতিও আস্থা জাগায় না। ফলে এই শুদ্ধিকরণ এলএসি-তে তুলনামূলক শান্ত কিন্তু পরিচালিত স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে পারে, যদিও দীর্ঘমেয়াদে পিএলএ তার প্রভাব বাড়িয়েই চলবে।
অস্ত্র হিসেবে সময়
ভারত চীনের সঙ্গে তিনটি কৌশলগত বিষয় নিয়ে প্রায়ই ভুল ধারণা পোষণ করে—চুক্তি, সময় এবং অস্পষ্টতা। ভারত চুক্তিকে বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখে, কিন্তু চীন এগুলোকে প্রতিপক্ষের আচরণ প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, নিজের কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা বজায় রেখে। ফলে নয়াদিল্লির আত্মসংযম অনেক সময় বেইজিংয়ের সুবিধা বাড়ায়।
একইভাবে, ভারত সময়কে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার উপাদান মনে করে, কিন্তু চীন সময়কে প্রস্তুতি, সংহতি এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা বদলের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। তাছাড়া, চীন অস্পষ্টতা দূর না করে বরং সেটিকেই কৌশলগত সুবিধা হিসেবে ধরে রাখে।
এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভারতের উচিত এলএসি নীতিকে প্রতিক্রিয়াশীল না রেখে আরো সক্রিয় ও ফলাফলনির্ভর করা। পিএলএ-র অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ভারতের জন্য নিজের আপেক্ষিক শক্তি বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।
- হর্ষ ভি. পন্ত: তিনি অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট
- অতুল কুমার: একজন ORF-এর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের ফেলো। সূত্র: ‘এনডিটিভি’র ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত।

