চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক ও বড় টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। ২০০২ সালে বেগম খালেদা জিয়া এর নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেছিলেন। এ টার্মিনাল ঘিরে ছিল অনেক স্বপ্ন। ভাবা হচ্ছিল বন্দর গতিশীল হবে, অর্থনৈতিক অগ্রগতি হবে। দেশীয় কোনো অপারেটরের কনটেইনার পরিবহনের অভিজ্ঞতা ছিল না বিধায় এ টার্মিনালে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগ হবে এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ একটি টার্মিনাল গড়ে উঠবে—এটাই ছিল পরিকল্পনা।
৫৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এক হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের এ টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। বৈশ্বিক টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। ডিপি ওয়ার্ল্ড, এপিএম ইন্টারন্যাশনালসহ বিশ্বখ্যাত চারটি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হলেও আওয়ামী লীগ শাসনামলে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ আছে বিভিন্ন কৌশলে আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিল করে স্বার্থান্বেষী মহল এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয় অনভিজ্ঞ দেশীয় অপারেটরকে। বন্দরের অর্থে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য। দেশের উন্নতির স্বপ্ন রুদ্ধ করে লাভবান হয় ক্ষমতার শীর্ষে থাকা গুটিকয়েক রাজনীতিবিদ, আমলা ও দেশীয় অপারেটর। তার পরও চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের ৪০ শতাংশ এসেছে এনসিটি থেকে।
দীর্ঘ সময়কাল বন্দরের নিয়ন্ত্রণে রেখে দেশীয় অপারেটর দিয়ে পরিচালনার পর ২০২৩ সালের ১২ জুন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ-দুবাই জয়েন পিপিপি প্লাটফর্ম সভায় এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা যে বন্দর তা সুস্পষ্ট হয়। সরকার এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেয়ার উদ্যোগ নেয়ার পরই বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি আসতে থাকে। নানা কর্মসূচি পালন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠন।
উচ্চ আদালতেও মামলা করা হয়। কিন্তু গত ২৯ জানুয়ারি উচ্চ আদালতের আদেশের পর এনসিটিতে বিদেশী অপারেটর নিয়োগের বাধা অপসারিত হয়। এরই মধ্যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে সরকার ক্ষমতার শেষ প্রান্তে এসে অতি দ্রুত প্রক্রিয়ায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করতে যাচ্ছে এনসিটি হস্তান্তরের। এর বিরুদ্ধে বন্দরে নানা কর্মসূচি পালন শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে আগে সরকারের নীতি প্রথমে ‘বুঝিয়ে রাজি করানোর’ কথা বলা হলেও পরবর্তী সময়ে ‘প্রতিরোধ করা’র কথা বলা হয়। কিন্তু এনসিটির ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট যে লালদিয়ার মতো নয় তা সম্ভবত বিদেশ থেকে আসা সরকারের বন্দরবিষয়ক অনভিজ্ঞ নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারছেন না।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতাকারীদের সরকার প্রথম থেকে বন্দরের আধুনিকায়নের বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে। বিরোধিতাকারী সবার দৃষ্টিভঙ্গি এক ছিল না। কেউ রাজনৈতিক কারণে বিরোধিতা করেছে, কেউ বিরোধিতা করেছে নানা সিন্ডিকেটের স্বার্থে, কারো বিরোধিতা ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি টার্মিনালকে কেন বিদেশীদের দিতে হবে এ যুক্তিতে, আবার কেউ বিরোধিতা করেছে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে না দিয়ে কেন জিটুজিতে করা হচ্ছে সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলে।
যৌক্তিক আপত্তি ছিল যে এনসিটিতে প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, এখানে বিদেশী বিনিয়োগের আর তেমন কোনো সুযোগ নেই। ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটির কনটেইনার পরিবহন সক্ষমতা খুব বেশি বৃদ্ধি করতে পারবে না। তারা কয়েকশ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে লক্ষ কোটি ডলার নিয়ে যাবে। এ যুক্তির কোনো জবাব সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি। ২০২৩ সালের পর থেকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের যেসব লোকজন চট্টগ্রাম বন্দরে নানা সার্ভের কাজে জড়িত ছিল এবং সভায় উপস্থিত ছিল তারা বেশির ভাগই ভারতীয় নাগরিক। বন্দরের শ্রমিক নেতারা এ বিষয়ে আগে বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। বন্দরসংশ্লিষ্ট মহলে এ আশঙ্কা রয়েছে যে দুবাই থেকে নয়, ডিপি ওয়ার্ল্ড ইন্ডিয়া বাংলাদেশের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনা করবে। প্রচারিত আছে যে প্রভাবশালী একজন আওয়ামী লীগ নেতা যাকে এ সরকারের সময় গ্রেফতারের পর অতি দ্রুত জামিন মঞ্জুর করা হয়েছিল তিনি ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্থানীয় অংশীদার। সচেতন মহলের যৌক্তিক উদ্বেগগুলোকে কোনো গুরুত্ব প্রদান করা হয়নি।
এনসিটিতে কনটেইনার পরিচালনার সঙ্গে আরো প্যাকেজ বিনিয়োগের প্রস্তাব থাকলে দেশ লাভবান হতো। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বব্যাপী লজিস্টিক ও সাপ্লাই চেইনে বিপুল অংকের বিনিয়োগ করে থাকে। প্রতিবেশী ভারতে তিন দশকে ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পর ডিপি ওয়ার্ল্ড তিন মাস আগে ইন্টিগ্রেটেড সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য অতিরিক্ত ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। একই সময়ে মিসরে ৮৫ মিলিয়ন ডলারের লজিস্টিক পার্ক উদ্বোধন করে ডিপি ওয়ার্ল্ড। আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনের একটি ডেডিকেটেড করিডোরের চাহিদা দীর্ঘ বছরের। এ ধরনের একটি রেলপথ নির্মাণের সঙ্গে যদি এনসিটিতে বিনিয়োগ যুক্ত করা যেত তাহলে বিদেশী বিনিয়োগ গ্রহণ দেশের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হতো। কিন্তু সঠিক কৌশল গ্রহণের যোগ্যতার অভাবে আমরা বিশ্বখ্যাত এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে লালদিয়ার চুক্তিতেও হেরেছি, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে তড়িঘড়ি চুক্তিতেও দেশের ক্ষতি হয়ে যাবে অপূরণীয়।
বন্দর খাতে বিদেশীদের বিনিয়োগের আওয়ামী আমলের প্রস্তাবগুলো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। রিসেট বাটনে চাপ দেয়ার কথা বলার পর সরকারের এ ধরনের তৎপরতা সবাইকে ক্ষুব্ধ করছে। ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসে সরকার নির্বাচনে হ্যাঁ ভোটের প্রচারের সময় এনসিটি নিয়ে এভাবে অগ্রসর হবেন না এটাই সবার প্রত্যাশা।
মহীউদ্দিন আল ফারুক: এমএসসি (পোর্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড শিপিং), ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি, সুইডেন; অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব। সূত্র: বণিক বার্তা

