গত এক দশক ধরে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ক্রমেই সংকটময় হচ্ছে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ পর্যন্ত দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আনার জন্য খরচ হতে যাচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা।
সরলভাবে বললে, এই বিশাল অর্থ বিদেশ থেকে গ্যাস কেনার জন্য ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই অর্থের একটি অংশ দেশের ভেতরে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও কূপ খননে ব্যবহার করা হতো না কি? এতে হয়তো বর্তমান সংকট এতটা তীব্র হতো না।
তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০২২—মোট ২২ বছরে—বাংলাদেশে মাত্র ২৬টি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে একটিরও কম কূপ খনন হয়েছে। তুলনায় প্রতিবেশী দেশ ভারত শুধু ২০১৭-১৮ অর্থবছরেই ৫৪৫টি অনুসন্ধান কূপ খনন করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় অনুসন্ধান ও কূপ খননে যথেষ্ট তৎপরতা না থাকায় বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো নতুন মাত্রা অর্জন করতে পারেনি। ফলশ্রুতিতে, বিদেশ থেকে গ্যাস আনার উপর নির্ভরশীলতা ক্রমেই বেড়েছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে সমস্যা আরও গভীর হচ্ছে।
এ অনুসন্ধানহীনতার ফল কী হয়েছে? গত দুই দশকে বাংলাদেশ প্রায় ১৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস খরচ করেছে, কিন্তু নতুন আবিষ্কার হয়েছে মাত্র ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। মানে আমরা যা পাচ্ছি তার চেয়ে ছয় গুণের বেশি খরচ করছি। এটা অনেকটা সঞ্চয় না বাড়িয়ে শুধু খরচ করে যাওয়ার মতো—একসময় তলানিতে ঠেকতেই হবে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট প্রমাণিত গ্যাস মজুদ ছিল ২৮.৭৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে জুন ২০২৩ পর্যন্ত ২০.৩৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট তুলে ফেলা হয়েছে। বাকি আছে মাত্র ৮.৪৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমান হারে খরচ হলে এ মজুদ কত বছর টিকবে, সেই হিসাব কষলে উদ্বেগ আরো বাড়ে।
প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে একটা ‘সিন্ডিকেট’ স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান আটকে রেখেছিল। এ বিষয়টা বুঝতে হলে দামের দিকে তাকাতে হবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিট মাত্র ৪ টাকা। অথচ আমদানি করা এলএনজির দাম ৭০-৭১ টাকা—প্রায় ১৮ গুণ বেশি। যারা এলএনজি আমদানির সঙ্গে জড়িত, তারা এ দামের পার্থক্য থেকে লাভবান হন। তাহলে স্থানীয় সস্তা গ্যাস পাওয়া গেলে তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এ যুক্তি থেকেই ‘সিন্ডিকেট’ তত্ত্বের জন্ম। অবশ্য এটা প্রমাণ করা কঠিন, কিন্তু প্রশ্ন তো থেকেই যায়: দুই দশক ধরে অনুসন্ধান কেন প্রায় বন্ধ ছিল?
আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি বুঝতে হলে একটু বাইরের দিকে তাকানো দরকার। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করলে ইউরোপ হাড়ে হাড়ে টের পেল আমদানিনির্ভরতার মূল্য কী। জার্মানি তার গ্যাসের ৪৫ শতাংশ রাশিয়া থেকে আনত। যুদ্ধ শুরু হতেই রাশিয়া সরবরাহ কমিয়ে দিল, তারপর একেবারে বন্ধ করে দিল। গ্যাসের দাম ১০ গুণ বেড়ে গেল। জার্মান পরিবারগুলো বাড়িতে গরম কমিয়ে দিল, কম গোসল করল, এমনকি অনেকে অফিসে গিয়ে গোসল সারতে লাগল। নেদারল্যান্ডসে ৮৩ শতাংশ বাড়ি গ্যাসে চলে—তারা কাঁপতে কাঁপতে শীত পার করল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শক্তি আমদানিনির্ভরতা ২০২১ সালে ছিল ৫৫.৫ শতাংশ, ২০২২ সালে বেড়ে হলো ৬২.৫ শতাংশ—সংকটের মধ্যেও নির্ভরতা বাড়ল, কারণ বিকল্প উৎস দ্রুত তৈরি করা যায়নি।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি ইউরোপের চেয়ে অনেক দুর্বল। ইউরোপ ধনী, তারা বেশি দামে গ্যাস কিনতে পারে। বাংলাদেশ পারে না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের ওয়ার্ল্ড এনার্জি আউটলুক ২০২৫ রিপোর্টে বলেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি আমদানিকারক হবে, পাকিস্তানকেও ছাড়িয়ে যাবে। তখন বছরে প্রায় ৪২-৪৪ বিলিয়ন ঘনমিটার এলএনজি কিনতে হবে। এখন যা কিনছি তার চেয়ে অনেক বেশি। সেই সময়ে যদি আবার কোনো বৈশ্বিক সংকট দেখা দেয়—যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা অন্য কিছু—তখন বাংলাদেশের কী হবে?
পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা এ প্রশ্নের একটা উত্তর দেয়। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে গানভর ও এনি নামের দুটো আন্তর্জাতিক কোম্পানি পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও এলএনজি কার্গো ইউরোপে পাঠিয়ে দিল। কারণ সেখানে তিন গুণ বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছিল। চুক্তিতে জরিমানার শর্ত ছিল, কিন্তু বেশি দামের লোভে কোম্পানিগুলো সেই জরিমানা দিয়েও ইউরোপে বিক্রি করাটাই লাভজনক মনে করল। পাকিস্তানের কারখানা বন্ধ হয়ে গেল, শ্রমিকরা বেকার হলো, সার কারখানা বন্ধে খাদ্য উৎপাদন হুমকিতে পড়ল। বিকল্প কার্গো কিনতে কাতারকে আগের চুক্তির চেয়ে ২৩০ শতাংশ বেশি দাম দিতে হলো। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছয় সপ্তাহের আমদানি খরচের সমান হয়ে দাঁড়াল, দেশ দেউলিয়া হওয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল।
বাংলাদেশও স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনে। চলতি অর্থবছরে ১১৫ কার্গো আমদানির পরিকল্পনা আছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি কিছু সুরক্ষা দেয় বটে, কিন্তু পাকিস্তানের উদাহরণ দেখায় যে সংকটের সময়ে সেই চুক্তিও সরবরাহকারীরা মানতে নাও পারে। তাছাড়া বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার—পাকিস্তানের চেয়ে ভালো, কিন্তু বড় ধরনের সংকট সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি পেট্রোবাংলাকে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের গ্যারান্টি দিয়েছে যাতে ২.১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেসরকারি অর্থায়নে এলএনজি কেনা যায়। এর মানে হলো দেশ এখন ঋণ করে জ্বালানি কিনছে।
প্রতিবেদনে এলপিজি সংকটে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কথা সংক্ষেপে বলা হয়েছে, কিন্তু পুরো চিত্রটা সেখানে নেই। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ৫০টিরও বেশি কোম্পানি, ব্যক্তি ও জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। মার্কিন ট্রেজারির বিবৃতি অনুযায়ী, ‘গ্যাস ডায়ার’ নামের পানামা-নিবন্ধিত একটি জাহাজ ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে ১৭ হাজার টনের বেশি ইরানি এলপিজি এনেছিল। এ জাহাজের মালিক পানামাভিত্তিক এয়ারিলিন শিপিং ইনক এবং সরবরাহকারী ছিল অক্টেন এনার্জি এফজেডসিও—দুটোই এখন নিষেধাজ্ঞার আওতায়। এর আগে ২০২৪ সালের শেষে ‘এডা’ (আগের নাম ক্যাপ্টেন নিকোলাস) জাহাজও বাংলাদেশে ইরানি এলপিজি এনেছে। এ ক্যাপ্টেন নিকোলাস জাহাজটিই ২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরের নোঙরে আগুনে পুড়েছিল।
এ তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শুধু ইরানের জন্য নয়, যারা ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করে তাদের জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে। এর নাম ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’। বাংলাদেশী কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান যদি এ নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ বা কোম্পানির সঙ্গে লেনদেন করে তাহলে তারাও মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী প্রতিবেদনে বলেছেন, ‘স্যাংশনভুক্ত দেশ থেকে এলপিজির কার্গো এসেছে দেশে, বিষয়টি জানানোর পরও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’ এটা উদ্বেগজনক, কারণ স্বল্পমেয়াদে সস্তায় জ্বালানি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে পাঁচটি কোম্পানির উৎপাদন কমার পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে, কিন্তু কেন কমছে সেটা বিস্তারিত বলা হয়নি। কারণগুলো জানা দরকার। প্রথমত, দেশের বড় গ্যাস ক্ষেত্রগুলো—তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ—দশকের পর দশক ধরে উৎপাদন দিয়ে আসছে। স্বাভাবিকভাবেই এদের চাপ কমে যাচ্ছে, উৎপাদন কমছে। এটা ঠেকাতে ‘ওয়ার্কওভার’ বা পুনর্খনন দরকার, নতুন প্রযুক্তি দরকার—যেটাতে যথেষ্ট বিনিয়োগ হয়নি। দ্বিতীয়ত, শেভরনের তিনটি ক্ষেত্র থেকে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে। বিবিয়ানা—দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস ক্ষেত্র—সেখানে প্রাথমিক মজুদ ছিল ৮,৩৮৩ বিলিয়ন ঘনফুট, উত্তোলনযোগ্য ছিল ৫,৭৫৫ বিলিয়ন ঘনফুট। জানুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত ৫,৮২৭ বিলিয়ন ঘনফুট তুলে ফেলা হয়েছে—মানে উত্তোলনযোগ্য মজুদের চেয়ে বেশি। নতুন রিজার্ভ না পেলে এ ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমতেই থাকবে।
পেট্রোবাংলা বলছে, প্রতিদিন গ্রিড থেকে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কমে যাচ্ছে। নতুন কূপ থেকে যা যোগ হচ্ছে, তা এ ক্ষয় পূরণ করতে পারছে না। এটা অনেকটা বালতিতে ফুটো থাকা অবস্থায় পানি ঢালার মতো—যত ঢালছি তত বেরিয়ে যাচ্ছে। ৫০ কূপ খননের যে প্রকল্প ছিল, তার মধ্যে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মাত্র ২০টির কাজ শেষ হয়েছে। এ ২০ কূপ থেকে ২১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এখন পর্যন্ত যোগ হয়েছে মাত্র ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মানে হলো পরিকল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ফারাক রয়ে যাচ্ছে।
২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ মীমাংসার পর বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে বিশাল এলাকা পেয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এটাকে বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। অনুসন্ধান ব্লকের সংখ্যা বেড়ে ২৭ হলো। কিন্তু এরপর ১২ বছরে কী হলো? প্রায় কিছুই না। অফশোরে এখন পর্যন্ত মাত্র ২১টি অগভীর পানির কূপ খনন হয়েছে, গভীর পানিতে একটিও হয়নি। কনোকোফিলিপস ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করে কোনো বাণিজ্যিক মজুদ না পেয়ে ২০১৯ সালে চলে গেছে। আকর্ষণীয় চুক্তির অভাব, গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের প্রযুক্তিগত জটিলতা—এসব কারণে বিদেশী কোম্পানিগুলো আগ্রহ হারিয়েছে।
অথচ সম্ভাবনা বিশাল। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ (ইউএসজিএস) ২০০১ সালে অনুমান করেছিল, বাংলাদেশে আরো গড়ে ৩২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকতে পারে। নরওয়ের পেট্রোলিয়াম অধিদপ্তরের অনুমান ছিল ৪১.৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এ পরিমাণ গ্যাস পেলে বাংলাদেশের জ্বালানি চিত্র পাল্টে যেত। প্রতিবেশী মিয়ানমার রাখাইন অফশোরে বড় বড় গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করে তার প্রমাণিত মজুদ ২০১৬ সালে ১০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট থেকে ২০১৭ সালে ২৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করেছে—দ্বিগুণেরও বেশি। এ ক্ষেত্রগুলোর ভূতাত্ত্বিক গঠন বাংলাদেশের সীমানার কাছাকাছি—মানে বাংলাদেশের পাশেও একই ধরনের মজুদ থাকার সম্ভাবনা আছে।
প্রতিবেদনে যা বলা হয়নি তা হলো বাংলাদেশ শুধু কম গ্যাস পাচ্ছে না, যা পাচ্ছে তাও সঠিকভাবে ব্যবহার করছে না। বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে যে গ্যাসচালিত ক্যাপটিভ জেনারেটর আছে, তাদের গড় দক্ষতা মাত্র ৩৫ শতাংশ। মানে ১০০ টাকার গ্যাস পুড়িয়ে মাত্র ৩৫ টাকার বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইএফএ) বলছে, এ দক্ষতা ৪৫ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। শুধু এই একটি কাজ করলেই বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি কমানো যেত। গ্যাস পরিবহন ও বিতরণে সিস্টেম লসও আছে। ক্যাপটিভ জেনারেটরের দক্ষতা বাড়ানো আর সিস্টেম লস ২ শতাংশে নামানো—এই দুটো মিলিয়ে বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ঘনফুট বা ২০২৪ সালের মোট এলএনজি আমদানির ৩৯ শতাংশ বাঁচানো সম্ভব বলে আইইএফএ মনে করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ৭০-৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার। এটা বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের তিন-চার গুণ। এ বিনিয়োগ কোথা থেকে আসবে? স্পষ্টতই বিদেশী কোম্পানি বা ঋণদাতাদের কাছ থেকে। কিন্তু বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী যা বলেছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ: বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কোনো অনিশ্চিত সরকারের ওপর বিনিয়োগে ঝুঁকতে চায় না। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ সীমিত, নির্বাচন আসছে—এ অনিশ্চয়তায় কে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে? জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের ফল পেতে বছরের পর বছর লাগে, অথচ রাজনৈতিক পরিবর্তন হতে পারে যেকোনো সময়।
প্রতিবেদনে ‘রফতানিমুখী আয়েও নেতিবাচক প্রভাব’ বলা হয়েছে, কিন্তু কতটা নেতিবাচক? ২০১৭ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ছিল প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার, সেই সময় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ছিল বছরে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ১.০৮৪ কোয়াড্রিলিয়ন বিটিইউ)। এখন রফতানি বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, কিন্তু গ্যাস উৎপাদন কমে ২০২৩ সালে ০.৮২৩ কোয়াড্রিলিয়ন বিটিইউতে নেমেছে। রফতানি বাড়ছে প্রায় ২৯ শতাংশ, অথচ গ্যাস উৎপাদন কমছে—এ ব্যবধান কীভাবে টেকসই হবে? আরেকটা বিষয় প্রতিবেদনে নেই: ইউরোপীয় ক্রেতারা এখন ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ দেখেন। কয়লা বা এলএনজি দিয়ে তৈরি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে বাংলাদেশী পোশাক কিনতে তারা অনাগ্রহী হতে পারে বা অতিরিক্ত ‘কার্বন ট্যাক্স’ দিতে হতে পারে।
পুরো প্রতিবেদনে সৌর বা বায়ুশক্তির কথা প্রায় নেই, অথচ এটাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। বাংলাদেশ ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত ৫ শতাংশেরও কম এসেছে। একটা তুলনা দেয়া যাক: সৌর-বায়ু-ব্যাটারি সমন্বিত ব্যবস্থায় (হাইব্রিড রিনিউয়েবল) বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ০.০৫-০.০৭ ডলার। অথচ ২০২২ সালের সংকটের সময় পাকিস্তানে কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়েছিল প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ০.১৯ ডলার—প্রায় তিন গুণ বেশি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু সস্তা নয়, এটা বিদেশনির্ভরতাও কমায়। সূর্যের আলো বা বাতাসের ওপর কোনো দেশ নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত কথা হলো, জ্বালানি সংকট শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সমস্যা নয়—এটা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। যে দেশ নিজের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে দেশের অর্থনৈতিক নীতি, এমনকি পররাষ্ট্রনীতিও অনেকটা অন্যের হাতে চলে যায়। ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসে নির্ভরশীল থাকায় বছরের পর বছর রাশিয়ার সঙ্গে শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। বাংলাদেশ যদি এলএনজি আমদানিতে আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তাহলে কাতার, ওমান বা যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারীদের ইচ্ছার ওপর দেশের অর্থনীতি নির্ভর করবে। এটা কোনো দেশের জন্যই কাম্য নয়। তাই এখনই সময় নিজের গ্যাস খোঁজার, দক্ষতা বাড়ানোর, এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করার—অন্যের দয়ায় না থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর।
সৈয়দ আবুল বাশার: অর্থনীতিবিদ ও গবেষক। সূত্র: বণিক বার্তা

