নির্বাচনের বাকি হাতেগোনা কয়েকটি দিন। এ সময় অন্তর্র্বর্তী সরকারের সম্পূর্ণ মনোযোগ হওয়া উচিত নির্বাচনকেন্দ্রিক। কীভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করা যায় তা নিয়ে সরকারের ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে, সরকার নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে কিছু নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে অতি উৎসাহী।
শুধু সিদ্ধান্ত নয়, হঠাৎ করেই সরকারের মধ্যে কেনাকাটার ধুম পড়েছে। মামুলি কেনাকাটা নয়, সরকার রকেট গতিতে নির্বাচনের আগে এমন ব্যয়বহুল কেনাকাটা করছে, যা একটি নির্বাচিত সরকারও এভাবে কেনার চিন্তা করবে না।
এ ধরনের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে নির্বাচিত সরকারও দশবার ভাববে। শেষবেলায় এসে সরকারের এ তৎপরতা সাধারণ মানুষকে বিস্মিত করেছে।
এ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো প্রচণ্ড ব্যস্ত আছে নির্বাচনী প্রচারে। সরকারের কাজকর্মে নজর রাখা তাদের পক্ষে অসম্ভব। সরকার কি তাহলে এজন্যই এ সময়টা বেছে নিয়েছে? সরকার সবার অগোচরে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সেরে ফেলতে চাইছে কেন?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এ চুক্তি অনুষ্ঠান হবে।
এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীনের। তবে শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্কহার নিয়ে এর আগে আগস্টে সমঝোতা হয় দুই দেশের; তবে চুক্তি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে এখন সেই চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। চুক্তি করতে ৫ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন ও সচিব মাহবুবুর রহমান ঢাকা ছাড়ছেন।
তারা আগে জাপান যাবেন। ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের রাজধানী টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (বিজেইপিএ) সই হবে। সেখান থেকে বাণিজ্য সচিব ওয়াশিংটনে যাবেন আর ঢাকায় ফিরে আসবেন উপদেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ এবং পরে ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করলেও আলোচনার সুযোগ রাখে।
ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফা আলোচনার পর গত বছর ৩১ জুলাই এ হার কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। যদিও তখন কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। পরে শুল্ক আরো হ্রাস এবং মার্কিন তুলা ব্যবহৃত পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকে, যা এবার চুক্তির দিকে গড়াচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানান, এ সুবিধা পেতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আগামী কয়েক বছরে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনা, জ্বালানি তেল, এলএনজি, গম ও তুলা আমদানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।
এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২৫টি বোয়িং কিনবে। কতগুলো, কোন বছর সরবরাহ করতে পারবে, কী দাম হবে, আমাদের বোয়িংয়ের ভিতরের কনফিগারেশন কী হবে এসব বিষয় নিয়ে নেগোসিয়েশন আছে, সেটা এ চুক্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে বলে জানা গেছে। প্রশ্ন উঠেছে-নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এ ধরনের চুক্তি করার কি নৈতিক অধিকার একটি সরকারের আছে? মনে রাখতে হবে, বর্তমান সরকার অন্তর্র্বর্তী এবং অনির্বাচিত। এ সরকারের প্রধান কাজ হলো একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। শুধু অনির্বাচিত সরকার বলেই নয়, নির্বাচনের ঠিক আগে এ ধরনের চুক্তি কোনো গণতান্ত্রিক দেশের কোনো সরকারই করবে না।
এটা গণতন্ত্রের রীতিনীতির পরিপন্থি। কারণ এ ধরনের চুক্তির ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করার আইনি অঙ্গীকার করবে। যে আর্থিক দায় মেটাতে হবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে। দায়িত্ব গ্রহণের আগেই নতুন সরকারকে বিশাল অঙ্কের অর্থ দিতে বাধ্য করা হবে, যা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তা ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়টি বোয়িং কেনা হবে, কত দিনে কেনা হবে এসব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। নতুন সরকার গঠনের পর বাস্তবতার নিরিখে সবকিছু বিবেচনা করে এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু এ রকম একটি বিপুল আর্থিকসংশ্লিষ্ট বিষয় যদি আগেই তাদের মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তারা কাজ করবে কীভাবে? লক্ষণীয় বিষয় হলো, কদিন আগেই বিমানের পরিচালনা পর্ষদে সরকারের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে যুক্ত করা হয়। তাঁরা হলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
এ-সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিমান আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩০ (বি)-এর আওতায় তাঁদের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদ দেশের জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনসটির নীতিনির্ধারণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেকেই পরিচালনা পর্ষদ পুনর্ঠনের সঙ্গে বোয়িং কেনার যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন।
শুধু এ চুক্তি নয়, নির্বাচনের উত্তাপের মধ্যে গত কয়েক দিনে অন্তর্র্বর্তী সরকারের মধ্যে তাড়াহুড়া করে বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পেশ করা হয়। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। বলাই বাহুল্য, এ সরকার নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে পারবে না। আগামী নির্বাচিত সরকারের ওপর এ ধরনের বোঝা কেন চাপিয়ে দেওয়া হলো, তা অনেকেরই বোধগম্য নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে এখন জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে। ২৮ জানুয়ারি মতামত নিতে খসড়াটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
এ বিষয়ে মাত্র তিন দিনের মধ্যে মতামত দিতে হবে। আগের দিন মঙ্গলবার সম্প্রচার কমিশন গঠনের জন্য সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশের খসড়াও প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ আলাদা দুটি কমিশন করতে চায় তথ্য মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে গণমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা। সরকার শেষবেলায় কেন এমন মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে চলছে নানান আলোচনা।
এ সরকার ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে গঠিত। জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নই এ সরকারের মূল কাজ। গত ১৭ মাসে প্রতিটি রাজনৈতিক দল এ সরকারকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে। সরকারকে সহযোগিতা করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত সমর্থন এবং সহযোগিতা অতীতে কোনো সরকার পায়নি। এখন রাজনৈতিক দল ও জনগণের আস্থার প্রতিদান দেওয়া এ সরকারের দায়িত্ব। সরকারের বিদায়বেলায় এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা নতুন সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত এ কটা দিন শুধু রুটিন দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা। শেষবেলায় এ সরকারকে নিয়ে প্রশ্ন উঠুক তা আমরা চাই না।
- অদিতি করিম: নাট্যকার ও কলাম লেখক। সূত্র: কালের কন্ঠ

