বাংলাদেশ টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেই পথ সহজ নয়। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে, অন্যদিকে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের সংকট উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই দুই চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবেলার কার্যকর কৌশল খুঁজে বের করাই এখন দেশের জন্য একটি মৌলিক পরীক্ষা।
গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে বাস্তব নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেই জ্ঞান পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কার্যকারিতা বৃদ্ধির প্রয়োজন এখনো স্পষ্ট।
বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি প্রশমন ও অভিযোজনমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসের উদ্যোগগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থিক এবং পরিচালনাগত সংযোগ জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে। এই সংযোগ দুর্বল থাকলে ভালো উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও নীতির ফল উল্টো হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও প্রকট। অপর্যাপ্তভাবে পরিকল্পিত বা পরস্পরের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি বাস্তবায়ন অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে আনতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কিছু জলবায়ু-সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর বদলে তা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আবার উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ যদি জলবায়ু অভিযোজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে অভিযোজন প্রচেষ্টার কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো—জলবায়ু অভিযোজন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং বৈষম্য কমানোর নীতিগুলোকে একই সুতোয় গাঁথা। সমন্বিত ও দূরদর্শী পরিকল্পনা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য—এই তিনটি সংকট একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এর সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়ছে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ তাদের জীবিকা ব্যাহত করছে, ঘরবাড়ি ও উৎপাদনমূলক সম্পদ ধ্বংস করছে। ফলে দৈনন্দিন জীবনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং দারিদ্র্যের ফাঁদ আরও গভীর হচ্ছে।
এই জনগোষ্ঠীর বড় সীমাবদ্ধতা হলো দুর্যোগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার অভাব। সীমিত সম্পদ ও দুর্বল সামাজিক সুরক্ষার কারণে তারা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। একের পর এক ধাক্কা তাদের আরও বেশি দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে ভবিষ্যতে জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের সময় তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তন দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যত একটি ‘হুমকির গুণক’ হিসেবে কাজ করছে।
এই জটিল সংকট থেকে উত্তরণের মূল চাবিকাঠি হলো প্রমাণভিত্তিক ও দরিদ্রবান্ধব নীতি, কৌশল ও কর্মসূচি গ্রহণ এবং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন। এমন নীতিই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে এবং টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করার পথ তৈরি করে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা সম্প্রদায়গুলোর সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে, অভিযোজন ক্ষমতা ও মোকাবেলার প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন একটি সমন্বিত জলবায়ু–দারিদ্র্য–বৈষম্য প্রশমন কর্মপন্থা। এই কর্মপন্থা জাতীয় ও স্থানীয় উভয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে একক কোনো দৃষ্টিভঙ্গি এখানে যথেষ্ট নয়। জলবায়ু, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের পাশাপাশি লিঙ্গ, খাদ্যনিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সংকট মোকাবেলার সক্ষমতার মতো বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—জলবায়ুঝুঁকির মধ্যে থাকা সম্প্রদায়গুলোর নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা।
জলবায়ু অভিযোজন, দারিদ্র্য হ্রাস ও জীবিকা সুরক্ষার উদ্যোগগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে এই বহুমাত্রিক অন্তর্দৃষ্টি একীভূত করা অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটেই একটি ‘সবুজ’ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন কাঠামোর মৌলিক উপাদান চিহ্নিত করা সম্ভব। এমন একটি কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সমন্বিত ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই কাঠামো বাংলাদেশের বাস্তবতায় জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবের পথ স্পষ্ট করে তুলে ধরে—সংকট মোকাবেলা করার সক্ষমতা, অভিযোজন এবং রূপান্তর। এই তিনটি পথকে পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত করলে ‘সবুজ’ অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের ধারণাটি আরও বোধগম্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কোন ধরনের আর্থিক পণ্য ও সেবায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার এবং সেগুলোর ব্যবহার কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়ক হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করা সহজ হয়। এই তিনটি পথ সব সময় আলাদা রেখায় চলে না। অনেক ক্ষেত্রে তারা একে অন্যকে শক্তিশালী করে এবং পরস্পরের পরিপূরক হিসেবেও কাজ করে। এর মধ্যে ‘সংকট মোকাবেলা করার সক্ষমতা’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আলোচনায় বহুল ব্যবহৃত হলেও এর তাৎপর্য প্রেক্ষাপটভেদে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
‘সবুজ’ অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন কাঠামোর ক্ষেত্রে সংকট মোকাবেলা করার সক্ষমতা বলতে বোঝানো হয়—দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির জন্য প্রস্তুত করা, প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং দুর্যোগের পর পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার ক্ষেত্রে সুপরিকল্পিত আর্থিক পণ্য ও সেবার ভূমিকা। এই অর্থে সংকট মোকাবেলা করার সক্ষমতা হলো ব্যক্তি ও পরিবারের অভিঘাত সামাল দেওয়া এবং তা অতিক্রম করার ক্ষমতা।
এই ব্যাখ্যা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত সংকট মোকাবেলার প্রক্রিয়া থেকে আর্থিক পণ্য ও সেবার নির্দিষ্ট অবদানকে আলাদা করে দেখার সুযোগ দেয়। কারণ জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের আগে, দুর্যোগ চলাকালীন এবং দুর্যোগের পর—প্রতিটি পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়।
দুর্যোগের আগে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর ঝুঁকি কমাতে এবং দুর্বলতা হ্রাস করতে সামাজিক সুরক্ষা জালের মতো আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। যখন দুর্যোগ আঘাত হানে, তখন ঋণ, সঞ্চয়, মোবাইল আর্থিক সেবা কিংবা কৃষি বীমার মতো সুবিধায় প্রবেশাধিকার পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এসব সেবা ভোগব্যয় স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে, পারিবারিক সম্পদ বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করার ঝুঁকি কমায়, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং শিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
তবে বাস্তবে সব পরিবারের সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা একরকম নয়। কারও পরিবার ঋণের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে, আবার কেউ সঞ্চয়ের মাধ্যমে সংকট সামাল দেয়। এই ভিন্ন ভিন্ন কৌশলের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—জলবায়ু বিপর্যয়ের ঝুঁকি থেকে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখতে বীমা একটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হলে টেকসই জলবায়ু অভিযোজনকে নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। এমন অভিযোজনমূলক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, যা মানুষের সুস্থতা নিশ্চিত করে, পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ায় এবং পরিবারের দুর্বলতার মূল কারণগুলোকে সরাসরি মোকাবেলা করে।
কার্যকর অভিযোজন শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পারিবারিক ও সম্প্রদায়—উভয় পর্যায়েই সামাজিক দুর্বলতা কমানো অপরিহার্য। এর মধ্যে রয়েছে মানব মূলধন শক্তিশালী করা, ভৌত সম্পদ উন্নয়নের উদ্যোগ, প্রাকৃতিক সম্পদে ন্যায্য ও টেকসই প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, আর্থিক মূলধন সম্প্রসারণ এবং সামাজিক মূলধন গড়ে তোলা। এসব উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে দরিদ্র পরিবারের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
এই প্রেক্ষাপটে জীবিকা-মূলধন কাঠামো একটি কার্যকর বিশ্লেষণী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। মানব, সামাজিক, প্রাকৃতিক, আর্থিক ও ভৌত—এই পাঁচ ধরনের মূলধনকে একত্রে বিবেচনা করে এই কাঠামো দেখায় কোথায় এবং কীভাবে দুর্বলতা তৈরি হয়, প্রতিকূল প্রবণতা কীভাবে বিকশিত হয় এবং ঋতু পরিবর্তন দারিদ্র্যের ফলাফলে কীভাবে প্রভাব ফেলে। কারণ মানুষের জীবিকা নির্বাহের কৌশল মূলত এসব মূলধনে তাদের প্রবেশাধিকারের ওপর নির্ভরশীল। শেষ পর্যন্ত এই প্রবেশাধিকারই আয়, খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি এবং সামগ্রিক মানব ও সামাজিক কল্যাণের মাত্রা নির্ধারণ করে। এই বাস্তবতায় নীতিগত এজেন্ডার মূলধারায় জলবায়ু অভিযোজনকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সব প্রাসঙ্গিক কর্মসূচি ও কার্যক্রমকে জলবায়ু-স্মার্ট এবং জলবায়ু-স্থিতিশীলভাবে নকশা করতে হবে। জীবিকা উন্নয়ন, অপুষ্টি দূরীকরণ এবং বহুমাত্রিক দারিদ্র্য হ্রাসের উদ্যোগগুলোতেও জলবায়ু-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়াটি হতে হবে লিঙ্গ-সংবেদনশীল এবং প্রতিবন্ধী-অন্তর্ভুক্ত।
সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে জলবায়ু অভিযোজনকে একক কোনো উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং পরিপূরক বিভিন্ন হস্তক্ষেপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে এগোতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে এন্টারপ্রাইজ উন্নয়ন, পুষ্টি সুরক্ষা, সম্প্রদায়ের সংহতি জোরদার, লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠা, বাজারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং নীতিগত সমর্থন। সামগ্রিকভাবে অভিযোজন বলতে এমন এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যা পরিবার ও সম্প্রদায়কে বিদ্যমান বা সম্ভাব্য জলবায়ু-সম্পর্কিত ঝুঁকির মুখে তাদের জীবিকা নতুনভাবে সামঞ্জস্য করার সক্ষমতা দেয়।
জলবায়ু অভিযোজন যে মূলত স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত—এই সত্যটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সে কারণেই বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ের সংগঠিত উদ্যোগের সঙ্গে সম্প্রদায়ভিত্তিক কৌশলগুলোর সংযোগ জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে। এই সমন্বয় বাড়লে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অভিযোজন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে এবং কর্মপরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন হবে বেশি বাস্তবসম্মত ও ফলপ্রসূ।
স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ বাড়ানো, স্থানীয় কর্মীদের ক্ষমতায়ন এবং অভিযোজন প্রচেষ্টার সঙ্গে ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে একীভূত করা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করলে টেকসই ও কার্যকর অভিযোজন চর্চার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সংকট মোকাবেলার সক্ষমতার তুলনায় অভিযোজন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে ধারাবাহিক আর্থিক বিনিয়োগ জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে চরম পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এর ফলে বাস্তুতন্ত্রের অবনতি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বিদ্যমান জীবিকা নির্বাহের সক্ষমতাকে সীমিত ও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তখন শুধু অভিযোজন যথেষ্ট থাকে না।
এই বাস্তবতায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি কমাতে এবং টিকে থাকার নিশ্চয়তা দিতে প্রয়োজন হয় রূপান্তরমুখী কৌশল। বিশেষ করে সেসব অঞ্চলে এই কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া আর সম্ভব নয়। জলবায়ু হুমকির প্রেক্ষাপটে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তার উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, যা উপকূলীয় জনবসতি ও জীবিকাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। একইভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার ধরণে পরিবর্তন এবং মরুকরণ অনেক এলাকায় ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অটেকসই ও অনুৎপাদনশীল করে তুলছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে নতুন জীবিকায় রূপান্তরের জন্য আর্থিক পণ্য ও সেবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক পরিষেবা দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে কম ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রবেশের সুযোগ দেয় এবং শুরুতে যে মূলধন প্রয়োজন, তা জোগান দিতে সহায়তা করে।
দক্ষিণ বাংলাদেশের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে জৈব-ভৌত বাস্তবতা এবং বন্যার প্রকৃতি ও স্থায়িত্ব কৃষিভিত্তিক অভিযোজনকে সীমিত করে রেখেছে। বন্যাপ্রবণ এলাকার কিছু পরিবার ঐতিহ্যবাহী কৃষিকাজ ছেড়ে জমি মাছ ও চিংড়ি চাষে রূপান্তর করতে বাধ্য হয়েছে। তুলনামূলকভাবে সচ্ছল পরিবারগুলো এই পরিবর্তনের উচ্চ প্রাথমিক ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ঋণ পেতে সক্ষম হলেও দরিদ্র পরিবারগুলো সাধারণত ক্ষুদ্র অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র ঋণের ওপর নির্ভর করে, যা অনেক সময় পর্যাপ্ত হয় না।
যেখানে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা জীবিকা রক্ষার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে অভিবাসন প্রায়ই একটি বিকল্প রূপান্তর কৌশল হিসেবে দেখা দেয়। এই অভিবাসন কখনো চরম জলবায়ু ঝুঁকির প্রতিক্রিয়া, আবার কখনো ভালো বিকল্প জীবিকার সন্ধানে নেওয়া একটি সচেতন সিদ্ধান্ত হতে পারে। এটি মৌসুমি বা স্থায়ী হতে পারে এবং স্বল্প কিংবা দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রাও এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এ ধরনের অভিবাসনের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। যেমন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে স্থানচ্যুতি হয়ে সৃষ্টি হওয়া জলবায়ু-সৃষ্ট শরণার্থী পরিস্থিতি। আবার কখনো এটি পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত হয়—যখন জলবায়ু পরিবর্তন সম্পদের ঘাটতি সৃষ্টি করে এবং সেই ঘাটতি সংঘাত ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতিকে বাস্তব রূপ দেয়।
মোস্তফা কে মুজেরী: নির্বাহী পরিচালক ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)
সূত্র: বণিক বার্তা

