যেকোনো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পরবর্তী সময় সবচেয়ে সংবেদনশীল হয়। বাংলাদেশও গত দেড় বছর ধরে এমন এক জটিল উত্তরণকাল পার করছে, যেখানে জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তব প্রাপ্তির মধ্যে বড় ফাঁক দেখা যাচ্ছে। কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে বিষয়টি দেখা ঠিক হবে না; বরং এটি আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, এই সময়ে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এক কঠিন পরীক্ষা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণ হলো প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং স্বার্থান্বেষী মহলের সংস্কারবিরোধী মনোভাব। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে এখনো এমন শক্তি সক্রিয় আছে, যারা পুরনো কর্তৃত্ববাদের ছাপ বহন করছে। এই অবশিষ্ট শক্তির কারণে জননিরাপত্তা কমে যাচ্ছে এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বাড়ছে, যা ভোটারদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
নির্বাচনের নিরপেক্ষতা কেবল নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না; এটি উত্তরণকালীন সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমের বৈধতার ওপরও নির্ভরশীল। কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সংস্কারের ধীরগতিই সরাসরি নির্বাচনী পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করছে।
মব সহিংসতা: রাষ্ট্রীয় সংকট ও নির্বাচনের ঝুঁকি:
মব ভায়োলেন্স বা জনরোষের সহিংসতাকে কেবল বিচ্ছিন্ন আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হিসেবে দেখা যায় না। এটি বরং একটি পদ্ধতিগত ও কৌশলগত হুমকি, যা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। যখন রাষ্ট্র নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে বা আইনি শাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন মব সংস্কৃতি তার আধিপত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, সাম্প্রতিক মব সহিংসতার মূল উৎস ছিল প্রশাসনিক কেন্দ্র বা সচিবালয়। প্রশাসনের ভিতরে শুরু হওয়া বিশৃঙ্খলা পরবর্তীতে বাইরের বিভিন্ন উগ্র ও অসংগঠিত শক্তিকে ক্ষমতায় এনেছে। সচিবালয়ের মতো সুরক্ষিত জায়গায় এমন সহিংসতা সংঘটিত হওয়ায় সরকার নিজস্ব নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করেছে। এর ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের একক ক্ষমতার আধিপত্যও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে তাকালে মব সহিংসতার ঝুঁকি আরও প্রকট। সরকার দাবি করলেও, টিআইবি-র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী মূল সমস্যা ক্ষমতার অভাবে নয়—এটি সদিচ্ছার অভাব। নির্বাচনের দিন ও পরবর্তী সময়ে যে ঝুঁকিগুলো দেখা দিতে পারে, সেগুলোকে এখনই চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
-
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণহীনতা: সচিবালয়ে মব সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অপশক্তি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে নির্বাচনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
-
ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার: অসংগঠিত মবকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ভোটারদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি এবং কেন্দ্র দখলের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
-
পোস্ট-ইলেকশন ভায়োলেন্স: সহিংসতা শুধু নির্বাচনের দিনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ফলাফলের পরবর্তী কয়েক দিনও মব সংস্কৃতির প্রভাব বজায় থাকতে পারে, যা রাজনৈতিক সমঝোতাকে দুর্বল করবে।
-
সরকারের নৈতিক সংকট: সহিংসতা দমন বা নিয়ন্ত্রণে সরকারের দ্বিধা বা পক্ষপাতমূলক আচরণ ভবিষ্যতে বৃহত্তর সামাজিক সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মব সহিংসতার ফলে সৃষ্ট এই সামাজিক অস্থিরতা এবং সরকারের নৈতিক দুর্বলতা সরাসরি প্রশাসনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এ পরিস্থিতি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথে এক কঠিন দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মূল শর্ত হলো আমলাতন্ত্রের পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয়। কিন্তু বাস্তবতা দুঃখজনক—রাজনীতিবিদ এবং আমলাতন্ত্র ‘জুলাই আন্দোলন’ থেকে কোনো গুণগত শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পুরনো স্বার্থ রক্ষার প্রবণতা এখনও সংস্কারের পথে প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে ‘ঐকমত্য কমিশন’-এর সংস্কার প্রস্তাবে আমলা ও রাজনীতিবিদদের তীব্র আপত্তি দেখাচ্ছে, যা স্পষ্ট করে যে তারা জনজবাবদিহিতার চেয়ে নিজেদের গোষ্ঠীগত স্বার্থ এবং ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় বেশি আগ্রহী।
এই প্রেক্ষাপটে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। টিআইবি বলছে, সংস্কার প্রক্রিয়ায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক, তবে বৈশ্বিক রীতির মতো ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত’ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমলাতন্ত্রের অনীহা সংস্কারকে কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রাখছে। এর প্রভাব পড়ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনি জবাবদিহিতে, যা দেশের ন্যায়বিচার প্রক্রিয়াকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করছে।
জুলাই আন্দোলনের পর আইনি পদক্ষেপগুলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য ছিল। তবে বাস্তবে কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করার চেয়ে ঢালাও মামলা দাখিলের প্রবণতা পুরো প্রক্রিয়াকে ‘ন্যায়বিচার বনাম প্রতিশোধ’-এর দ্বন্দ্বে পরিণত করেছে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও হত্যা মামলা এবং তাদের দীর্ঘ সময় ধরে আটক রাখার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে।
টিআইবি মনে করে, প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে শুধুমাত্র হত্যা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে নয়। কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় সংঘটিত দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং কর ফাঁকির মতো আর্থিক অপরাধের সঙ্গে জড়িতদেরও ন্যায়সংগত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার করতে হবে। অন্যদিকে সরকারের প্রস্তাবিত ‘সম্প্রচার কমিশন’ এবং ‘গণমাধ্যম কমিশন’ অধ্যাদেশকে টিআইবি ‘লোকদেখানো পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর ফলে মিডিয়া নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং বাইরের প্রভাবক শক্তি নিয়ন্ত্রণে সরকার নিজেই অতিক্ষমতা দেখাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতায়, যা এখন চরম সংকটের সম্মুখীন।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে সরকারকে কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা প্রদর্শন করলেই হবে না। টিআইবি-র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সহিংসতা দমন করার যথেষ্ট ক্ষমতা থাকলেও সদিচ্ছার অভাবে তা অপব্যবহৃত বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
গণতান্ত্রিক সংস্কার একক নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ হয় না; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা মূলত পরবর্তী সরকারের অঙ্গীকার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচনকে সত্যিকারের গ্রহণযোগ্য এবং জনআস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে এই সদিচ্ছার প্রমাণ অপরিহার্য।
কৌশলগত সুপারিশ: ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সফল ও গ্রহণযোগ্য করতে সরকারের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হলো:
-
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আমূল সংস্কার: নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনকে দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ পেশাদার এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আইনি কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
-
পেশাজীবী সংগঠনের অরাজনৈতিকীকরণ: আইনজীবী, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক দলের ছায়া থেকে বের করে এনে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা এবং নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
-
সুনির্দিষ্ট জবাবদিহি: হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি অর্থ পাচার, বড় আকারের দুর্নীতি এবং কর ফাঁকির মতো আর্থিক অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
-
গণমাধ্যম কমিশন পুনর্গঠন: মিডিয়া কমিশনগুলোকে ‘লোকদেখানো’ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও কার্যকর সংস্থায় রূপান্তর করতে হবে।
-
পরবর্তী সরকারের অঙ্গীকার: গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর রায় আসলে পরবর্তী সরকারের সদিচ্ছাই হবে সংস্কার বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি। সরকারকে জনমতকে সম্মান জানিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।
পরিশেষে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক নির্ণায়ক মুহূর্ত। উত্তরণকে সফল করতে হলে সরকারকে মব সহিংসতা দমন করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং ন্যায়বিচারের নামে প্রতিশোধমূলক আচরণের পথ পরিহার করতে হবে। সূত্র: জাগো নিউজ

