জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি ইশতেহারে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ইশতেহারে শুধুই স্লোগান এবং সাধারণ বাণী রয়েছে; টাইমলাইনসহ বাস্তবায়নযোগ্য কোনো পদক্ষেপের উল্লেখ নেই।
ড. ফাহমিদা বলেন, “ইশতেহারের ভাষা ও উপস্থাপন বিভ্রান্তিকর। এতে ‘ইসলাম’ শব্দটিরও উল্লেখ নেই। আধুনিক তরুণ-তরুণীদের ছবি ব্যবহার করে তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।”
তিনি জামায়াতের ইশতেহারের দুটি প্রধান ঘাটতি তুলে ধরেছেন। প্রথমত, অধিকাংশ প্রতিশ্রুতির জন্য কোনো সময়সীমা (টাইমলাইন) দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলা হলেও তার অর্থায়নের উৎস স্পষ্ট নয়। “এগুলো কার্যকর প্রতিশ্রুতি নয়, কেবল স্লোগান,” মন্তব্য করেছেন তিনি।
জামায়াত দেশকে ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বের ২০তম অর্থনীতি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তবে ড. ফাহমিদা মনে করেন, বিদ্যমান রূপরেখা দিয়ে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।
মাথাপিছু আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১০ হাজার ডলার নির্ধারণ করা হলেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, “সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২০ শতাংশ এবং এফডিআই ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা বলা হলেও প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই।”
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও সময়সীমা ছাড়া উল্লেখ করা হয়েছে। “২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে হলে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনই যথেষ্ট নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল রাখতে হবে,” তিনি যোগ করেন। ৭ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিনিয়োগের উৎস এবং সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। এছাড়া ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১৪ শতাংশে উন্নীত করার জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেই।
বেকারত্ব হ্রাসের বিষয়ে জামায়াতের দাবি ড. ফাহমিদা অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করেন। জামায়াত জানিয়েছে তারা বেকারত্ব ডাবল ডিজিট থেকে সিঙ্গেল ডিজিটে নামাবে, অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে বর্তমান বেকারত্বের হার ৪ শতাংশের নিচে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও জামায়াতের পরিকল্পনা অস্পষ্ট। আগামী ৫ বছরে রপ্তানি দ্বিগুণ করার জন্য তাদের উল্লেখিত পণ্যের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। বিশ্ব বাণিজ্যে ট্যারিফ যুদ্ধ ও জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ প্রক্রিয়া চলছে, তাতে তাদের কোনো পদক্ষেপ নেই। ৩০ শতাংশ আমদানি প্রতিস্থাপন পরিকল্পনাকেও বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে করেন না ড. ফাহমিদা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনাও নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়া। জামায়াত শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ৩ গুণ বরাদ্দের কথা বলেছে, তবে কখন তা কার্যকর হবে, তা ইশতেহারে উল্লেখ নেই।
ড. ফাহমিদা খাতুনের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট, জামায়াতের ইশতেহার আকর্ষণীয় শিরোনামে হলেও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা ও অর্থায়নের দিক থেকে তা দুর্বল। সূত্র: টিবিএস

