কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা একবার বলেছিলেন, “কারাগার বা বন্দিজীবন ধৈর্য এবং অধ্যবসায়ের এক অমূল্য শিক্ষা, যা একজন ব্যক্তির প্রতিশ্রুতির পরীক্ষা নেয়।” সরলভাবে বলতে গেলে, একজন কারাবন্দিকে বন্দি জীবনে তার প্রতিশ্রুতিগুলি মানতে হয়। নিয়মকানুন মেনে চলা, আত্মসংযম বজায় রাখা এবং ধৈর্য ধারণ করা—এই তিনটি গুণই কারাবন্দির জন্য অপরিহার্য।
রাষ্ট্রও এই কঠিন পরিস্থিতিতে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। অর্থাৎ, যেমন কারাবন্দি রাষ্ট্রের আইন মেনে চলবেন, তেমনি রাষ্ট্রও তাকে সম্মানসূচক সুযোগ ও মানবিক সুবিধা দেওয়ার দায়বদ্ধ।
তবে বাস্তবে এই ‘দুই পক্ষের প্রতিশ্রুতি’ অনেক সময় সঠিকভাবে পালন হয় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে রাজনৈতিক বন্দিদের প্যারোল বা জামিন মঞ্জুর সংক্রান্ত জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজবন্দিরা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী প্যারোল পাননি। ফলস্বরূপ, ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
আইন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলি এ বিষয়ে বারবার আপত্তি জানিয়েছে। তারা বলছে, বন্দিদের পরিবারের আবেদন সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি প্রত্যাখ্যান করা নাগরিক অধিকার ও মানবিক নীতির সরাসরি লঙ্ঘন। এমনকি কখনও কখনও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই নিজের প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধতা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এই বাস্তবতা প্রশ্ন তোলে—আইনগত ও মানবিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে রাষ্ট্রের ভারসাম্য কতটুকু রক্ষিত হচ্ছে? কারাবন্দির অধিকার সুরক্ষিত করা এবং মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।
সম্প্রতি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক এক ছাত্রনেতা তার মৃত স্ত্রী ও নয় মাস বয়সী শিশুসন্তানের জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়ার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছিলেন। তবুও তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। ফলে শেষমেশ তাকে কারাফটকে মরদেহে উপস্থিত হতে হয়েছে।
এ ঘটনার ঠিক পরবর্তী সময়ে কিশোরগঞ্জে অনুরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। প্যারোলে মুক্তি না মেলায় এক বন্দিকে বাবার মরদেহ দেখার সুযোগও দেওয়া হয়নি। এই ধরনের ঘটনায় মানুষ শুধু দুঃখিত হয় না, বরং উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা জাগে।
প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত বিধান বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১ জুন নির্ধারণ করেছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, ভিআইপি বা সাধারণ কয়েদি-হাজতি নির্বিশেষে, নিকটাত্মীয়ের—যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান ও ভাইবোন—মৃত্যুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যায়। নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, এটি প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয় হলেও, আবেদন প্রত্যাখ্যান করা যাবে না এবং তা নির্বিচারভাবে করা উচিত নয়।
পরিবারের আবেদন সত্ত্বেও এই বিধান প্রয়োগ না করা আইন ও ন্যায্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থি। কারাগারে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য হলেও মৃত স্বজনের মুখ দেখার সুযোগ না দেওয়া এক বন্দিকে জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা নিঃসন্দেহে অমানবিক।
এই ধরনের ঘটনার পেছনে কারা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতা, স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত ও বৈষম্যমূলক আচরণ গুরুতর প্রশ্ন তোলে। এসব নেতিবাচক ঘটনা একটি সংবিধানসম্মত, গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নিউ ইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) তাদের সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে হাজারো মানুষকে নির্বিচারভাবে আটক রাখছে।
কেবল এটাই নয়, বিচারহীন অবস্থায় থাকা এই বন্দিদের জামিন নিয়মিতভাবে নাকচ করা হচ্ছে। তালিকায় রয়েছেন শুধু রাজনৈতিক কর্মীই নয়; অভিনেতা, আইনজীবী ও গায়কও রয়েছে। অর্থাৎ, অতীতে যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটক হিসেবে দেখা গিয়েছিল, বর্তমান সরকারের আমলেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে ‘পরিবর্তন’ কতটা অর্থবহ হবে তা প্রশ্নের মুখে পড়বে। পাশাপাশি রাষ্ট্র কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের তালিকাও দীর্ঘতর হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

