সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। দায়িত্ব পালন করছেন মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার পদে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ পদে রয়েছেন তিনি। আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে প্রায় ৩৫ বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তার। সম্প্রতি তিনি মাস্টারকার্ডের যাত্রা, ক্রমবিকাশ, বৈচিত্র্য, উদ্ভাবনসহ বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকাসহ নানা কর্মতৎপরতার উপর ধারনা দিয়েছেন।
মাস্টারকার্ড কীভাবে একটি কো-অপারেটিভ কোম্পানি থেকে বৈশ্বিক জায়ান্ট হয়ে উঠল?
মাস্টারকার্ডের যাত্রা প্রায় ৬০ বছর আগে। তখন এটি একটি চার্জ কার্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিটি বর্তমানে প্রায় ২২০টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মাস্টারকার্ডের বিশেষ দিক হলো যে আমরা উদ্ভাবন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতিতে বিশ্বাসী। সারা পৃথিবীতে আমরা ভার্চুয়াল অর্থনীতি সম্পর্কিত অনেক নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এনেছি। আসল কথা হচ্ছে, পেমেন্ট প্রক্রিয়ায় আপনি কীভাবে সমস্যা সমাধান করছেন?
রেমিট্যান্স বাজারে মাস্টারকার্ডের কাজ করার চিন্তাটি কবেকার?
আমরা ২০১৪-১৫ সালের দিকে একটি হাব মডেল দিয়ে শুরু করেছিলাম। তখন অনেক রেমিট্যান্স কোম্পানি ছোট ছোট দেশে একা কাজ করতে পারত না। আমরা এ হাবের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের বিভিন্ন দেশে নিয়ে যেতাম। ২০১৮ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ট্রান্সফাস্ট নামের একটি রেমিট্যান্স কোম্পানিকে অধিগ্রহণ করা হয়।
পরে আমরা চিন্তা করলাম পেমেন্ট সমাধানের সঙ্গে রেমিট্যান্সের শক্তিকে একত্র করে কীভাবে একটি সঠিক সমাধান বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ করা যায়। সেখান থেকেই আসলে শক্তভাবে যাত্রা। আমরা মানি মুভমেন্টটা রিয়েল টাইমে করে থাকি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভোক্তা থেকে ভোক্তা এবং একই সঙ্গে ব্যবসায়িক পর্যায়েও অর্থ সঞ্চালনের কাজটি আমরা পরিচালনা করি।
বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই আড়াই বিলিয়নের বেশি হচ্ছে না। আপনার কি মনে হয়েছে নীতিগত ও কমপ্লায়েন্সের জায়গা থেকে ভবিষ্যতে বা পরবর্তী সরকারের একটি আশুকরণীয় জায়গা আছে?
বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বিদেশে থাকে। কিন্তু প্রতি মাসে যে রেমিট্যান্স আসে, সেটি বেশ কম। তার মানে অর্থের একটি বড় অংশের কোনো হিসাব নেই। এ কারণে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনার জন্য আমাদের মতো টেকনোলজিগুলো কাজ করছে। পাশাপাশি সরকারের যে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা আছে, সেটিও বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনতে সহযোগিতা করছে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় জিনিস হলো বিনিময় হার।
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার যখন বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করে তখন ডলারের বিনিময় হারে বড় কোনো উত্থান বা পতন হয়নি। এতে করে প্রবাসীদের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে যে টাকার পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হবে না। এখানে বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ছিল। সেজন্য প্রতি মাসে রেমিট্যান্স আড়াই থেকে ৩ বিলিয়নে ছিল।
বিপরীতে এফডিআইয়ের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অবস্থার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অবস্থাও ভূমিকা রাখে। নিরাপত্তা ও সুরক্ষা একটি বড় বিষয়। একটি বিদেশী কোম্পানি যদি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে, তারা ম্যানুফ্যাকচারিংসহ যেকোনো কার্যক্রমে টাকার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা কেমন হবে, টাকা কী দেশে থাকবে, থাকলে নষ্ট হবে কিনা এবং দিনশেষে মুনাফা ফেরত পাঠাতে কোনো বাধা থাকবে কিনা—এসব বিষয় দেখে। গত ১৭-১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবে আমার মনে হয় আগামীতে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক, তার জন্য বাংলাদেশে এফডিআই আকর্ষণ বাড়ানো একটি বড় লক্ষ্য হবে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং এখানকার নিরাপত্তা অবকাঠামো ও সুরক্ষা সম্পর্কে আস্থার জায়গাগুলোয় কাজ না করে কি আসলে এফডিআই আনা সম্ভব?
একেবারেই না। আমার মনে হয় এখানে দুটি বিষয় রয়েছে। অবকাঠামোগত নিরাপত্তা অবশ্যই থাকতে হবে। নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কনসালটেশন সভা করা প্রয়োজন। এখানে প্রকৃত স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসতে হবে। গত ১৮ মাসে হয়তো বা আমরা দেশের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ওভাবে তুলে ধরতে পারিনি। কিন্তু অবকাঠামো থেকে শ্রমের প্রাপ্যতা, মূল্য, উৎপাদন খরচ এবং অন্য সবকিছু যৌক্তিক পর্যায়ে আছে। এ জিনিসগুলোর কথা আমরা সবসময় বলে আসছি।
আমার মনে হয় সঠিক স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা খুবই জরুরি। যারাই সরকারে আসুক—এটি বিনিয়োগকারী এবং দেশের পক্ষ দুটো দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিবেচনা করতে হবে। যারা বিনিয়োগ করবেন, তারা চাইবেন টাকার সুরক্ষা। অর্থাৎ যে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা নিরাপদ থাকবে। এছাড়া খরচ, বিনিয়োগের রিটার্ন এবং নীতি নিশ্চিত করা হলে যারাই সরকারে আসুক; এফডিআই না আসার কোনো কারণ থাকবে না। আমাদের দক্ষতা আছে।
আরো দক্ষ হওয়ার সুযোগ আছে। গার্মেন্ট খাতে দেখিয়েছি, আমরা কী পারি। এখন অন্য যেসব খাত আসছে সেখানেও আমরা ভালো করব। প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বসতে হবে। বিদেশে যে হাইকমিশন আছে, তাদের মাধ্যমে হতে পারে অথবা ওই দেশের ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের সঙ্গে হতে পারে। তারা কেমন বিনিয়োগ পরিবেশ চাচ্ছেন, কোন কোন জায়গায় তাদের অগ্রাধিকার, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ বাড়ছে, অন্যদিকে দেশটিতে বাংলাদেশীদের যাতায়াত বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে শুল্ক বাধা আসছে। বাংলাদেশে আমেরিকান চেম্বারের হয়ে কাজ করতে গিয়ে আপনার কী মনে হয়েছে সরকারের এসব জায়গায় নজর দেয়া উচিত?
আমি ব্যবসার অংশটি বলি। একটি দিক হলো মাইগ্রেশন বা ভিসা ইস্যু। শুল্ক অংশে আসলে একটা ‘উইন উইন প্রপোজিশন’ হয়। দুটো দেশ যখন কথা বলে তখন প্রত্যেকে নিজের সুবিধাটাই দেখবে। তারপর যা হয়েছে, সেটি আলোচনার টেবিল থেকেই এসেছে। প্রথম দিকে যখন দরকষাকষি হচ্ছিল তখন সেই অর্থে ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা ছিল না, পরে বেড়েছে। এখন ভিসা নিয়ে নতুন যেসব নিয়মকানুন আসছে সেখানেও উন্নতি হবে বলে আশা করি। শুল্ক ইস্যুতে আমরা ভালো অবস্থানে আছি বলে মনে করি। এটির ধারাবাহিকতা থাকলে বাণিজ্য ঘাটতিসহ অন্য যেসব বাধা আছে দূর হয়ে যাবে।
বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন খুবই কম, মাসে ৪ হাজার কোটি টাকার মতো। যেখানে অর্থনীতির আকার বলা হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ কোটি টাকার বেশি। আপনার কি মনে হয় না এটা অনেক কম? এক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের বাইরে থাকা মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গ্লোবাল পেমেন্ট সিস্টেম হিসেবে আপনারা কীভাবে কাজ করেন?
এ মুহূর্তে আমরা একেবারে তলানিতে আছি। আমরা যারা ভার্চুয়াল অর্থনীতি নিয়ে কাজ করি, তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী হলো নগদ অর্থ। বাংলাদেশে যখন একটা কাঁচাবাজারে যাই, তখন নগদ টাকা ছাড়া অন্য কিছুই চলে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন বলছে ৭০ শতাংশ লেনদেন হয় নগদ টাকায়। বাকি ৩০ শতাংশ ডিজিটাল। ব্যাংক ট্রান্সফার থেকে শুরু করে সবকিছু এর মধ্যে পড়ে। এ জায়গায় কাজ করার বড় সুযোগ আছে। পেমেন্ট সাইটে মানুষের মধ্যে একটা ভীতি কাজ করে। তারা ডিজিটাল পেমেন্ট কতটুকু নিরাপদ সেটি দেখে।
কিন্তু নগদ টাকা নিয়ে যদি আমরা কোথাও যাই; হারিয়ে যাওয়া, ছিনতাইয়ের মতো অনেক কিছু ঘটতে পারে। ডিজিটালের ক্ষেত্রে এর ঝুঁকি অনেক কম। চিপভিত্তিক কার্ড বা ডিজিটাল যন্ত্রাংশের কারণে লেনদেন অত্যন্ত সুরক্ষিত। সেজন্য এখানে সচেতনতা বৃদ্ধির সময় এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিন বছর ধরে কাজ করছে। এখানে আইডিয়া তৈরি থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সব জায়গায় মাস্টারকার্ড সম্পৃক্ত ছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে মিলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে একটি করে ডেবিট কার্ড বা প্রিপেইড কার্ড তুলে দিচ্ছি। এর মাধ্যমে তাদের মানি মুভমেন্টটা ডিজিটাল হবে বলে মনে করছি।
চার্জ বেশি হওয়ার অভিযোগে মানুষ ক্রেডিট কার্ড এড়িয়ে যেতে চায়। যেহেতু এখানে কার্ডের ব্যবহার অনেক কম, সেহেতু এ জায়গায় কিছুটা ছাড় দিয়ে দেশের ব্যাংকগুলো কি এটিকে মানুষের জন্য সুলভ করতে পারে?
আমি যদি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও দেখি, প্রতিটি দেশে কিন্তু ক্রেডিট কার্ডের সুদের বাইরেও বড় একটি অতিরিক্ত চার্জ (মার্কআপ চার্জ) আরোপ হয়, যেটি খুবই উচ্চ—৩-৫ শতাংশ। বাংলাদেশে এটি খুবই কম। সুদের অংশটি পুরোপুরি ব্যাংকের আইনগত ক্ষেত্র। একজন ভোক্তা হিসেবে, যদি আমি কোনো ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ধারক হই, তবে শুধু বার্ষিক ফি ছাড়া কোনো অতিরিক্ত খরচ বহন করি না। বেশির ভাগ ব্যাংক এ ফি মওকুফ করে দেয়।
তবে যদি আমি সময়মতো পরিশোধ না করি, তখন সুদের চার্জ প্রযোজ্য হয়। যারা সময়মতো পরিশোধ করতে পারেন না, তখন ইন্টারেস্টের বিষয়টি আসে। এর বাইরে দুই-একটি খাত বিশেষ করে মোবাইল ফোন কিনতে গেলে বা স্বর্ণের দোকানে হয়তো কিছু অতিরিক্ত চার্জ করে। সারা পৃথিবীতেই ক্রেডিট কার্ডের সুদহার সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুধু সুদহার না আরো অনেক ধরনের চার্জ আরোপ করা হয়, যেটি বাংলাদেশে নেই। পৃথিবীর অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি বাংলাদেশ, যেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ রেট দেয়া হচ্ছে।
মাস্টারকার্ডেরও এসএমই এবং এমএসএমইর প্রোগ্রাম আছে। ওয়ালেট ট্রান্সফারের সুযোগ আছে। এখন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের কার্ড থেকে টাকা নিতে পারি। এটিও মাস্টারকার্ডের উদ্যোগ ছিল। সেজন্য এখনো পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে চার্জ ও সুদহারের দিক থেকে অনেক সহনীয় পরিস্থিতি আছে। আমাদের দরকার সচেতনতা। কার্ড ব্যবহার করলে খরচ বেশি, এ ভয় কাটাতে কাজ করতে হবে।
কার্ডগুলোয় লিমিট দেয়ার কারণে অনেকে চাইলেও একটু বেশি খরচ করতে পারেন না। বিশেষ করে যারা চিকিৎসার জন্য বাইরে যান…
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে অনেকদিন ধরে আমি এ নিয়ে কথা বলেছি। বাংলাদেশে বড় একটা জনগোষ্ঠী চিকিৎসার জন্য বাইরে যায়। বেশির ভাগই নগদ টাকা বা ডলার নিয়ে খরচ করেন। এটা কিন্তু ডিজিটালি হওয়ার সুযোগ ছিল এবং আছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে লিমিট দেয়া সেটি হলো ‘ট্রাভেলস’ কোটা। সেখানে মজার বিষয় হলো বাংলাদেশের একটা মেডিকেল বোর্ডকে বলতে হবে যে এ চিকিৎসাটা বাংলাদেশে হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের মেডিকেল বোর্ডের তো এ কথা বলার কোনো কারণ নেই। কেননা এখন তো দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক উন্নত।
এ জায়গাটায় বাংলাদেশ ব্যাংককে কাজ করতে হবে। ট্রাভেলস কোটায় ১২ হাজার ডলার খরচ করা যাবে। এটি যখন করা হয়েছিল তখন রিজার্ভ ১০ বিলিয়নও ছিল না। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজর দেয়া উচিত। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে কিন্তু ট্রাভেলস কোটা বলে কিছু নেই। আমরা এ লিমিট বাড়ানোর চেষ্টা করছি। না বাড়ালে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে খরচটা বাড়বে। নগদ ডলার খরচ কমাতে হলে লিমিট বাড়াতে হবে। এরপর বাইরে যাওয়ার জন্য ফ্লাইটের টিকিট, হোটেল বা কিছু বুক করলে অনলাইনে মাত্র ৩০০ ডলারের লিমিট দেয়া আছে। এটি যৌক্তিক হতে পারে না। এ লিমিট তুলে দিতে হবে।
আপনি বলেছেন যে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বেড়ে যাওয়ায় ডলারের বিনিময় হার অনেক স্থিতিশীল। কিন্তু এ অভিযোগও তো আছে যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ডলার কিনছে, তাতে বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে মুদ্রাটির বিনিময় হার সমন্বয় হওয়ার যে সুযোগ ছিল, তা হচ্ছে না। মুদ্রার বিনিময় হারে আসলেই কি বাজারের উপাদানগুলো কাজ করছে? নাকি আগের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে?
বাংলাদেশ ব্যাংক যেটা করছে প্রয়োজনে ডলার কিনছে বা বিক্রি করছে, সারা পৃথিবীতেই বিষয়টি আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে। তবে কোন ফ্রিকোয়েন্সিতে ও কতটুকু পর্যন্ত করবে সেটা দেখার বিষয়। বিনিময় হার বাজারে ছেড়ে দেয়ার পর দর কিন্তু ওপরের দিকে যায়নি, বরং নিচের দিকে যাচ্ছিল। বিষয়টি অনেকটা শাঁখের করাতের মতো। বিনিময় হার কমলে আমদানিকারকরা জিতবেন। কিন্তু যারা রেমিট্যান্স পাঠান, তারা আগ্রহ হারাবেন। যখন তারা দেখবেন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে পাঠালে ১২৫ টাকা পাওয়া যাচ্ছে আর বৈধপথে পাঠালে ১১৫ টাকা; তখন তারা অবৈধ পথেই পাঠাবেন। পাশাপাশি যারা রফতানিকারক আছেন, ডলারপ্রতি যদি ১০ টাকা কম আসে, তাহলে তাদের ওপরও বড় প্রভাব পড়বে। এখানে সঠিক ভারসাম্য জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংক সে চেষ্টা করছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে বিনিময় হার সমন্বয়ের মাধ্যমে যদি ভোক্তাদের একটু সুবিধা দেয়ার সুযোগ আসে, সেক্ষেত্রে কি তা-ই করা উচিত না?
ডলারের বিনিময় হার যখন বাজারে ছেড়ে দেয়া হয়, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকসহ ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ভয় পাচ্ছিলেন। অনেকে বিনিময় হার ১৫০ টাকা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। মাস্টারকার্ড ইকোনমিক ইনস্টিটিউশন থেকে তখন পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল, এটি ১৩০-১৩৫ টাকার ওপরে যাবে না। এ সিদ্ধান্তে বরং ডলারের বিনিময় হার কমা শুরু করেছিল। এটা খুবই যৌক্তিক যে পণ্যের বড় অংশ যেহেতু আমরা আমদানি করি, তাই মূল্যস্ফীতি কমাতে ডলারের বিনিময় হার কমালে ভোক্তার কিছুটা সুবিধা হবে।
বিনিময় হার যদি পুরোপুরি বাজারভিত্তিক হয়, তাহলে কি আসলেই রেমিট্যান্স প্রভাবিত হবে?
অবশ্যই হবে। গত এক বছরে আমদানিতে কিছু সীমা আরোপিত ছিল। কিন্তু এখন ডলারের যে তারল্য আছে তাতে এটি সীমিত করে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। মূলধনি যন্ত্রপাতির মতো পণ্য আমদানির জন্য মানুষ এখন নির্বাচনের অপেক্ষা করছে। তারা দেখতে চাচ্ছে স্থিতিশীলতা আসে কিনা, নির্বাচনে কী হয় তা দেখার জন্য। আমদানি শুরু হলে কিন্তু ডলার লাগবে। মানুষ দেড় বছর অপেক্ষা করেছে। আরো দুই বছর নিশ্চয়ই অপেক্ষা করবে না। আর ডলারের জোগানদাতা কিন্তু রেমিট্যান্স ও রফতানি। এখানে বিনিময় হার খুব কমিয়ে দিলে দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তখন হুন্ডি বেড়ে যাবে।
যারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসবে আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা তৈরির ক্ষেত্রে প্রথম ১০০ বা ২০০ দিনে তাদের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত? বড় একটি রাজনৈতিক দল বলছে যে তারা ফ্যামিলি কার্ড ও ফারমার্স কার্ড নিয়ে আসবে। এখানে যারা ডিজিটাল পেমেন্ট নিয়ে কাজ করেন, তাদের অন্তর্ভুক্তি বা সংশ্লিষ্টতার সুযোগ আছে কি?
অর্থের বণ্টন যত ডিজিটাল হবে, দেশের তত মঙ্গল। বৈশ্বিকভাবে এ ধরনের অনেক পণ্য আমাদের আছে। অনেক দেশে ফারমার্স কার্ড আছে। আমরা বাংলাদেশেও অনেক আগে ফারমার্স কার্ড করেছি। ফ্যামিলি কার্ড থেকে শুরু করে এ ধরনের নানা প্রডাক্ট বৈশ্বিকভাবে আমাদের আছে। এটিও একটি প্লাগ অ্যান্ড প্লে মডেল হবে, যখন কোনো একটা সরকার চিন্তা করবে যে আমরা এ দুই-তিনটা কার্ড দেব বা অর্থের বণ্টন ডিজিটালি করব। তখন আমরা আমাদের বৈশ্বিক প্রযুক্তি এনে সহায়তা দেব। ডিজিটাল ডিজবার্সমেন্টের যে চিন্তা করা হচ্ছে এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। অর্থ সঞ্চালন যত ডিজিটালি হবে, আমরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দিকে আরেকটু ভালোভাবে এগিয়ে যাব।
যেখানে এসএমই খাতে নগদ লেনদেন অনেক বেশি, সেখানে আপনারা কীভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমকে পরিচিত করবেন?
আমাদের কিন্তু এ বিষয়ে পলিসি আছে। আগেই বলেছি, এসএমই খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একটা বিশেষ রেট আছে। কিন্তু প্রয়োগ নেই। এখানে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। এখানে যদি প্রণোদনা দেয়া যায়, তাহলে অনেক ভালো হবে। ধরা যাক, ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করলে আগামী তিন বছর ২ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হবে। তখন দেখা যাবে সেখানে অতিরিক্ত খরচ নেই, নগদ টাকার ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনাগত কোনো চিন্তা নেই। আবার গ্রাহককে বলা হোক, যদি ‘ডিজিটাল পে’ করা হয় তাহলে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হবে। আর যদি ডিজিটাল লেনদেন না করে নগদে করা হয়, তাহলে খরচ বেশি হবে। বিষয়টি নিয়ে কাজ হয়নি। বরং নগদে নিলে যে পণ্যের ১০০ টাকা দাম, সেটির ডিজিটাল পেমেন্টে দেখা গেল ট্যাক্সের কারণে ১০২ টাকা দিতে হয়। দুদিক দিয়ে প্রণোদনা দিলে ডিজিটাল লেনদেন বাড়বে।
মাস্টারকার্ড বাংলাদেশকে কীভাবে বৈশ্বিক পর্যায়ে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে বা অন্যান্য দেশের মানুষ ও সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করে?
আমরা দেশের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করি। যখন অন্য দেশে যাই, তখন নিজের দেশকে তুলে ধরার দায়িত্বটা আমাদেরই। মাস্টারকার্ড বাংলাদেশকে একটা ফোকাস কান্ট্রি হিসেবে দেখে। আমরা বাংলাদেশে কার্যক্রম চালাচ্ছি ১৯৯১ সাল থেকে। আর এখানে অফিস নিয়ে ব্যবসা করছি ১৩ বছরের বেশি সময়। আমরা বাংলাদেশে প্রচুর বিনিয়োগ এনেছি। ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছি। আমরা নিরাপত্তা ও সুরক্ষা খাতে এবং ভার্চুয়াল অর্থনীতিকে প্রমোট করার জন্য বিনিয়োগ করেছি। এখানে বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে। একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে আমরা কিন্তু সারা পৃথিবীতে কোথাও কার্ড ইস্যু করি না। কার্ড ইস্যু করে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান। আমরা তাদের সাপোর্ট করি। আমরা সেই জায়গাটাই চালিয়ে যাব। আমাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক পর্যায়ের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে আরো ফোকাস করব।
সূত্র: বণিক বার্তা

