জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের মন জয় করতে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অঙ্গীকার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যয়ের সম্প্রসারণ, পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে স্বস্তি নিশ্চিত করা–এসব মূল প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে।
এ ধরনের অঙ্গীকার ভোটারদের দৃষ্টিতে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যুব ও মধ্যবয়সী ভোটাররা কর্মসংস্থান এবং জীবিকার নিশ্চয়তার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। রাজনীতিবিদরা আশা প্রকাশ করছেন, নির্বাচনের আগে প্রকাশিত এই পরিকল্পনা ভোটারদের আস্থা অর্জনে সাহায্য করবে। তবে নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিশ্রুতি শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর বাস্তবায়নের দিকেও নজর দিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক চাপে থাকা নাগরিকদের কাছে রাজনৈতিক দলের দেওয়া প্রতিশ্রুতি আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব অঙ্গীকারের সঙ্গে বিস্তারিত ব্যয় ও পূর্ণাঙ্গ আর্থিক পরিকল্পনা থাকে না। কীভাবে এসব উদ্যোগ অর্থায়ন করা হবে, বাস্তবায়নের সময়সূচি কী, অতিরিক্ত ব্যয় কত হবে, করছাড় বা অন্যান্য সুবিধা দিলে রাজস্বের ক্ষতি কত হবে, বাজেট–ঘাটতি এবং সরকারি ঋণের ওপর এর প্রভাব কী—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। ফলে সুস্পষ্ট আর্থিক কাঠামোর মধ্যে বিস্তারিত প্রস্তাব না থাকলে প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল সাধারণ অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে।
রাজস্ব ও ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্যের অভাব দেশের অর্থনীতিতে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ইতিমধ্যেই চাপের মধ্যে থাকা অর্থনীতিতে নির্বাচিত সরকারকে নতুন করে পর্যাপ্ত অর্থ জোগাড় করতে হবে। দুর্বল রাজস্ব আহরণ ও উচ্চ সরকারি দায়দেনায় সরকারের আর্থিক পরিসর সংকুচিত।
উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা, ঋণ পরিশোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারসহ নানা ক্ষেত্রে সরকারি তহবিলের চাহিদা অনেক। তাই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনৈতিক গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে পরবর্তী সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে তার ওপর।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কর আহরণের সক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৬.৮ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৭.৩৮ শতাংশ থেকে কম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
এটি রাজস্বব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রমাণ। এক দশকের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় বাজেটের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। আগামী বছরগুলিতে ব্যয়ের চাপ আরও তীব্র হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিল পরিশোধ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য সরকার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন যোগ করবে। এসব আর্থিক বোঝা সরকারের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতাকেও সীমিত করবে।
স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ভবিষ্যৎ দায় ও ঝুঁকি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। নতুন সরকারের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই জটিল আর্থিক চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে পারে এবং প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন। এতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির পর বেতন সমন্বয়ের যৌক্তিকতা থাকলেও এর আর্থিক প্রভাব বড়। যথেষ্ট আর্থিক প্রস্তুতি ছাড়া বাস্তবায়ন হলে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হতে পারে এবং বাজেট–ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপের সঙ্গে বৈদেশিক দুর্বলতাও পরিস্থিতি জটিল করছে। ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২০.৪৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ২৮.৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবু, এটি বাড়তে থাকা আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক নয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে প্রবাসী আয় ১৭.০৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম। রপ্তানি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বর্ধিত বৈদেশিক ঋণের বোঝা দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাজেট ঘাটতি পূরণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী ঋণনির্ভরতার প্রমাণ দিচ্ছে। নভেম্বর ২০২৫-এ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর স্বল্প সুদে ঋণ কমে এসেছে, ফলে ঋণ পরিশোধ অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ ঋণও সমস্যার সৃষ্টি করছে। রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ক্রমেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়তে থাকলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য কমে যাবে এবং বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের খরচ বাড়বে। এতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সরকারি ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ দিক। রাজনৈতিক দলগুলো যখন অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন সরকারি ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করা জরুরি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) জন্য বরাদ্দ সব সময় আদর্শ পর্যায়ে থাকে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে মূল বাজেট বরাদ্দের বিপরীতে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ১১.৫ শতাংশ, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা ও গুণগত মান উন্নয়ন জরুরি। অপচয়মূলক ও অগ্রাধিকারহীন ব্যয় বন্ধ করতে হবে, পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি সম্পদের অপব্যবহার—যেমন বিলাসবহুল গাড়ি, মন্ত্রিসভা সদস্যদের অতিরিক্ত সুবিধা, বড় অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ—জন–আস্থা ক্ষুণ্ণ করছে।
রাজস্ব সংহতি এবং ব্যয় দক্ষতা বাড়াতে নতুন সরকারকে জবাবদিহি জোরদার করতে হবে। সংসদীয় নজরদারি শক্তিশালী করা, বাজেট বাস্তবায়নের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা এবং মধ্যমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে বার্ষিক বাজেট তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ভবিষ্যৎ দায় ও ঝুঁকি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
সার্বিকভাবে, নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করছে কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই জটিল আর্থিক চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে পারে এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়।
- ফাহমিদা খাতুন অর্থনীতিবিদ এবং নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ।

