বাংলাদেশ এখন একটি বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। ভোটের পর নতুন সরকার গঠন হবে, এটাই প্রত্যাশা। সবার মধ্যে একটি নীরব কৌতূহল কাজ করছে—কারা সরকার গঠন করবেন এবং তারা কোন ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আনবেন। ব্যাংক খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষরাও একই প্রশ্নে চিন্তিত: নতুন সরকার ব্যাংক খাতকে কোন দিকে নেবেন?
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত রাজনৈতিক প্রভাবের তলায় চলে গিয়েছিল। নতুন ব্যাংক খোলা, পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং ঋণ অনুমোদন প্রায়ই রাজনৈতিক ও দলীয় আনুগত্যের ওপর নির্ভর করত। এর ফলে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ জমে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে। এখন নির্বাচনের আগে ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা ভাবছেন, নতুন সরকার কি স্থিতিশীল, জবাবদিহিমূলক এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে?
পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময় ব্যাংকগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক প্রভাবের চাপে পড়ত। ঋণ অনুমোদন, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হতো। এর ফলশ্রুতিতে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পেতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এই সব সমস্যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে রাজনৈতিক জটিলতাগুলো ভাঙা সহজ নয়। ব্যাংকগুলোকে সুশাসনের আওতায় আনতে হলে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। অন্যথায় পুনরায় ব্যাংক খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, বিষয়টি সহজভাবে সমাধান হবে না। রাজনৈতিক প্রভাব দূর করা ও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
নবদৃষ্টিতে শুরু: রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা আবশ্যক:
নতুন সরকারের আগমনে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর্থিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণের ক্ষেত্রে এটি একটি সুবর্ণ মুহূর্ত। নতুন প্রশাসন চাইলে একটি স্থিতিশীল, দক্ষ ও জনসাধারণের আস্থায় প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে। একটি নীতিবহুল ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবল তখনই সফল হবে, যখন তা দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাদারদের হাতে পরিচালিত হবে। তখনই রাজনৈতিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। তবে এই স্বচ্ছতা কেবল আইন বা আদেশের মাধ্যমে আসবে না। এর জন্য প্রয়োজন মনোভাবের পরিবর্তন, সুশাসনের কার্যকর কাঠামো এবং সাংগঠনিক সংস্কার।
রাজনীতিবিদদেরও বুঝতে হবে, একটি স্বাধীন ও পেশাদার ব্যাংক খাত দেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের তাদের দায়িত্বশীলতা ও অর্থনৈতিক সততার রক্ষক হিসেবে ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। স্বচ্ছতা ও পরস্পরের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করার মাধ্যমে ব্যাংক খাতের মান বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত হবে।
আস্থার ভিত্তি তৈরি: নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা:
এই পরিবর্তনের মূল হলো একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো, যা পেশাদারি ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক, বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের অধীনে কাজ করতে পারলে ব্যাংক খাতে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব। নিয়মে স্বচ্ছতা এবং পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন অত্যন্ত জরুরি। ব্যাংকগুলিতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও ফরেনসিক সিস্টেমের মাধ্যমে প্রকৃত পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ অডিট কাঠামো প্রয়োজন। এছাড়াও, বৈশ্বিক মান অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতির মডেল চালু করলে বিশ্বাস ও আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
কিন্তু সংস্কার কেবল নীতিমালা বা বোর্ড রুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা চলবে না। নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী নেতারা এবং বেসরকারি খাতকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে। এতে প্রমাণ হবে যে সংস্কারগুলো প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং টেকসই।
সরাসরি পরিবর্তন সবসময় ফলপ্রসূ হয় না। অতিরিক্ত বা আকস্মিক নীতি পরিবর্তন বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াতে পারে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অর্থনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে স্বতন্ত্র পরিচালকদের মেয়াদ বাড়ানো উচিত। এটি তাদেরকে অভ্যন্তরীণ ও ফরেনসিক অডিটের ফলাফল মূল্যায়ন করতে এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে সাহায্য করবে।
একই সঙ্গে অতীতের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যারা দায়িত্বহীনভাবে ঋণের মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ লোপাট করেছেন। দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করে রাজনীতির দুষ্টচক্র থেকে ব্যাংক খাতকে রক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করে কঠোর ও বাস্তবসম্মত করতে হবে, যাতে আমানতকারীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ রক্ষা করা যায়।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মুখোমুখি। রাজনৈতিক পরিবর্তন কি পুরনো ধারা অব্যাহত রাখবে, নাকি একটি পেশাদার, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকিং সিস্টেমের দিকে এগোবে? ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি মৌলিক নীতির ওপর—সুশাসন।
সুশাসনের ভিত্তি হলো স্পষ্ট নেতৃত্ব এবং ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো। এটি জনসাধারণের আস্থা পুনঃস্থাপন করার জন্য অতীব জরুরি। যদি এসব কাঠামো যথাযথভাবে কার্যকর হয়, ব্যাংক খাত ভবিষ্যতে একটি স্থিতিশীল ভিত্তি গড়ে তুলতে পারবে—যা সমগ্র জাতির জন্য একটি মহাস্বপ্নের বাস্তবায়ন হবে।
দেশের মানুষ এখন ব্যাংক খাতে নতুন ও স্বচ্ছ অধ্যায়ের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এটি স্পষ্ট যে রাজনীতি ও অর্থের সম্পর্ক কেবল ব্যাংকিং শিল্পকেই প্রভাবিত করে না, বরং বাংলাদেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ভাগ্যকেও প্রভাবিত করে। আমরা আশা করি, আগের রাজনৈতিক শাসনের মতো নয়, বরং স্বচ্ছতা, পেশাদারত্ব ও সুশাসনের মাধ্যমে বিলম্ব হলেও সবাইকে সমান সুযোগ দেবে একটি নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এর মধ্য দিয়ে দেশ একটি টেকসই এবং দৃঢ় অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে এগোবে।
ড. মো. তৌহিদুল আলম খান: এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী।

