তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান সম্প্রতি সৌদি আরব সফর করেছেন। এমন এক সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইয়েমেন ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে স্বার্থসংঘাত নিয়ে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে টানাপোড়েন চলছে, এবং তুরস্কের সম্ভাব্যভাবে পাকিস্তান–সৌদি সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
এসবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইস্যু। তবে ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে সৌদি আরবের পুনরায় সক্রিয় আঞ্চলিক ভূমিকায় ফেরার প্রেক্ষাপটে এখন মূল প্রশ্ন হলো—ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের “নতুন সৌদিত্ব”-এর কাঠামোয় তুরস্কের অবস্থান কোথায়?
২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর মোহাম্মদ বিন সালমান আঞ্চলিক পরিসরে তুলনামূলকভাবে নিম্নপ্রোফাইল বজায় রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ ভিশনের ওপর বেশি মনোযোগ দিয়েছেন।
এটি ছিল একটি সচেতন কৌশলগত সিদ্ধান্ত। ক্রাউন প্রিন্সের “নতুন সৌদিত্ব” ধারণা এমন এক সৌদি পরিচয়ের কথা বলে, যা আরব বিশ্বের সামষ্টিক বোঝা আর বহন করে না—ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ব্যর্থ হস্তক্ষেপ এবং ফিলিস্তিনে দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাতের অভিজ্ঞতার পর।
তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সিরিয়ায় আসাদ শাসনের পতনের পর সৌদি পররাষ্ট্রনীতি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যার লক্ষ্য রিয়াদের আঞ্চলিক নীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা।
নতুন সৌদিত্বের স্পষ্টতই অভ্যন্তরমুখী চরিত্রের শিকড় রয়েছে ভিশন ২০৩০-এ, যেখানে নতুন জীবনধারা, পর্যটন এবং ইতিহাসের পুনর্নির্মিত বোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই ঝকঝকে রূপান্তর একই সঙ্গে কারা অন্তর্ভুক্ত হবে এবং কোন শর্তে—তা সীমিত করে দেয়।
ক্রাউন প্রিন্সের এই প্রকল্পের পেছনে একাধিক উপাদান কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের জনমিতিক রূপান্তর—বর্তমানে জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে; তেলের বাইরে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজন; মোহাম্মদ বিন সালমানের কর্তৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, যার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ ২০২২ সালে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ; এবং সৌদিত্বের নতুন সংজ্ঞা, যেখানে রাজতন্ত্র ও জাতীয় গৌরবকে উচ্চস্থানে তুলে ধরা হচ্ছে এবং ওহাবি প্রভাবকে পিছনে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই সব শর্ত একত্রে একটি নতুন জাতীয় কল্পনার নির্মাণকে সম্ভব করে তোলে।
সন্ধিক্ষণে সৌদি আরব:
সৌদি আরব বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নতুন পরিচয়ের লক্ষ্য হলো নাগরিকদের কাছে এবং বিশ্বের কাছে স্থিতিশীলতা ও আধুনিকতার বার্তা তুলে ধরা। তবে রাজ্যের পরিচয় পুরোপুরি ওপর থেকে লিখে দেওয়া সম্ভব নয়। এই প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে সৌদি নাগরিকরা কীভাবে সাড়া দেন—তাঁরা কি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনধারার নতুন বয়ানকে গ্রহণ করবেন, নাকি অন্তর্ভুক্তির বিকল্প ধারণা গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন।
এই প্রেক্ষাপটে ক্রাউন প্রিন্সের অভ্যন্তরীণ মনোযোগ কাকতালীয় নয়—এটাই তাঁর কৌশলের মূল ভিত্তি। তবে আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে কূটনৈতিক অবস্থান জোরদার করতে তাঁর প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য অংশীদার।
ইয়েমেনে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামগ্রিক লক্ষ্য ছাড়িয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কাছাকাছি গেলেও, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনো তাদের ঘোষিত অগ্রাধিকার।
নতুন “সৌদিত্ব”কে রাজ্যের আগের পররাষ্ট্রনীতির ধারা থেকে আলাদা করে যে বিষয়টি, তা হলো—রিয়াদ এখন আর পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বোঝা এককভাবে বহন করতে রাজি নয়। তবে পরিবর্তন শুধু সৌদি আরবেই আসেনি; ইয়েমেনের উদাহরণ যেমন দেখায়, তার মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীরাও বদলে গেছে। এখন মোহাম্মদ বিন সালমানকে তাঁর কৌশল পুনর্গঠন করতে হবে—কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রমবর্ধমান নেতৃত্বকে বিবেচনায় নিয়ে, এবং আঞ্চলিক প্রভাব একচেটিয়া না করে ভাগাভাগি করার মানসিকতা নিয়ে।
মোহাম্মদ বিন সালমানের নীতিমালা তাঁর শাসনামলকে হয়তো আঞ্চলিক সক্রিয়তার নতুন এক অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইবে। কিন্তু তার আগে তাঁর প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য অংশীদার। তবেই হয়তো আমরা আরও বহির্মুখী এক সৌদি আরব দেখতে পাব।
এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের আঞ্চলিক ভূমিকা—যার মধ্যে গাজা বিষয়ে সমঝোতায় সহায়তা করা এবং আফ্রিকা ও ইয়েমেনে অ-রাষ্ট্রীয় মিলিশিয়ার বদলে বিদ্যমান রাষ্ট্রক্ষমতাকে সমর্থন করা অন্তর্ভুক্ত—রিয়াদ ও আঙ্কারাকে কাছাকাছি এনেছে। এটি মোহাম্মদ বিন সালমানকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আগ্রাসী হস্তক্ষেপমূলক নীতির বিপরীত অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য কৌশলগত অবকাশ দেয়।
ক্ষমতার অক্ষ:
সৌদি–পাকিস্তান সামরিক চুক্তিতে তুরস্কের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি—যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি—এই উদীয়মান ক্ষমতার অক্ষকে স্পষ্ট করে। আঙ্কারার জন্য আমিরাত ও সৌদি আঞ্চলিক নীতির অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা একটি উচ্চমাত্রার কৌশলগত সমন্বয়ের দাবি রাখে।
গত সপ্তাহে রিয়াদে এরদোয়ানের সফর শেষে সৌদি ও তুর্কি নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সোমালিল্যান্ড স্বীকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সোমালিয়ার ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন জানান। আশারক আল-আওসাতকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ইসরায়েলের পদক্ষেপকে অবৈধ ও “বাতিল ও অকার্যকর” বলে আখ্যা দেন।
ইয়েমেন ইস্যুতে আঙ্কারা একটি ঐক্যবদ্ধ দেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা দীর্ঘদিনের সংঘাতে দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে নির্মূল করার প্রশ্নে রিয়াদের সঙ্গে তাদের অবস্থানকে এক কাতারে এনেছে। সৌদি আরব ও তুরস্ক সুদানের ঐক্য রক্ষা, গাজায় শান্তি অর্জন এবং সিরিয়া থেকে ইসরায়েলের অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবিতেও যৌথ অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছে। সিরিয়া প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, তুরস্কের মানদণ্ড হলো “এমন একটি সিরিয়া, যা প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি নয়, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর জন্য নিরাপদ আশ্রয় দেয় না, এবং সমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে সমাজের সব অংশকে অন্তর্ভুক্ত করে।”
সৌদি আরব সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার অধীনে ক্ষমতা সংহতকরণের একজন গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে ভবিষ্যৎ উত্তেজনা এড়াতে এতে কুর্দি, আলাওয়ি, দ্রুজ ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের মতো বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলোর পুনঃঅন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। রিয়াদ ও আঙ্কারা ভালোভাবেই জানে, ভবিষ্যৎ উত্তেজনা ও চরমপন্থা ঠেকাতে একটি ঐক্যবদ্ধ সিরিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বর্তমান সমন্বয়কাহিনির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সৌদি ও তুর্কি কোম্পানিগুলো আগে প্রযুক্তি হস্তান্তরকেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে, যেখানে ড্রোন উৎপাদনসহ সামরিক স্বনির্ভরতার লক্ষ্য অনুসরণ করছে রিয়াদ। সর্বশেষ যৌথ বিবৃতিতে উভয় দেশ অপরাধ, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিগুলো সক্রিয় করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
স্পষ্ট যে, সৌদি আরব আর অভ্যন্তরীণ কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। তবে নতুন ভাবমূর্তি ও অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার এই উদ্যোগ কতটা সফল বা টেকসই হবে, তা এখনো দেখা বাকি।
ইয়েমেন থেকে শুরু করে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন পর্যন্ত—বহু সংকটে আঙ্কারা ও রিয়াদ নিজেদের অসংখ্য বার একই পক্ষেই দেখতে পেয়েছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই, লেখা: বেতুল দোগান আক্কাস

