বিল গেটসের সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসকে কৃতিত্ব দিতেই হয়। এমন এক সময়ে তিনি একটি পডকাস্টে হাজির হয়েছেন, যখন এপস্টিন–সংক্রান্ত সাম্প্রতিক নথিতে নাম উঠে আসা বহু প্রভাবশালী পুরুষ কার্যত লজ্জায় গর্তে মুখ লুকাতে ব্যস্ত।
স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে জেফ্রি এপস্টিনকে নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। মেলিন্ডা খুব শান্ত, মার্জিত কিন্তু স্পষ্ট ভঙ্গিতে দায়টা নিজের কাঁধ থেকে নামিয়ে দেন। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তাঁর জানার কথা নয়, জানার কথাও তিনি কল্পনা করতে পারেন না। এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে সংশ্লিষ্ট মানুষদের—এমনকি তাঁর সাবেক স্বামীকেও। তিনি শুধু এটুকু বলেন, ওই সব নোংরামি থেকে দূরে থাকতে পারছেন—এটাই তাঁর স্বস্তি।
মেলিন্ডা উচ্চ স্বরে কিছু বলেননি। নাটক করেননি; কিন্তু তাঁর কথার আঘাত ছিল গভীর। তিনি একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেন—আমরা কি সত্যিই সমাজ হিসেবে এখন নিজেদের দিকে তাকাচ্ছি? নিজেদের ভুলের মুখোমুখি হচ্ছি?
খোলাখুলি বললে, আমার তা মনে হয় না।
সংবাদ শিরোনাম দেখলেই বোঝা যায়—যেসব বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জবাবদিহি দরকার, সেগুলোই আলোচনার বাইরে। যুক্তরাজ্যে এখন দিনের পর দিন আলোচনা হচ্ছে পিটার ম্যান্ডেলসনকে ঘিরে। অথচ এই পুরো কাহিনিতে তিনি সেই ব্যক্তি নন, যিনি এপস্টিনের পাচার করা নারী ও কিশোরীদের ওপর সরাসরি যৌন নির্যাতন চালিয়েছিলেন।
হ্যাঁ, যদি তিনি এপস্টিনকে ভাবমূর্তি ঠিক করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি নৈতিকভাবে গুরুতর ভুল; কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ভয়াবহ ঘটনার আসল কেন্দ্র কি সেটিই?
এখানেই অস্বস্তি। কে কাকে চিনতেন, কে কার সঙ্গে কোথায় দেখা করেছিলেন—এসব রাজনৈতিক হিসাব নিয়ে যেন একধরনের উন্মাদনা চলছে। অথচ পুরো ঘটনার কেন্দ্রে যে বিষয়টি, অর্থাৎ ক্ষমতাবান পুরুষদের হাতে নারী ও কিশোরীদের নির্দয় শোষণ ও নির্যাতন, সেটিই যেন আমরা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি। এটা কি অদ্ভুত নয়?
এই সপ্তাহে নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকার প্রচ্ছদে ম্যান্ডেলসন–সংক্রান্ত ঘটনাকে বলা হয়েছে ‘শতাব্দীর কেলেঙ্কারি’। কথাটা পড়ে হাসি পেয়েছিল; কিন্তু সেটি হাসিখুশির ব্যাপার নয়। কারণ, এত বড় ও ভয়ংকর কাহিনির ভেতরে এটিকে শতাব্দীর কেলেঙ্কারি বলা সত্যিই হাস্যকর। এটা তো কেলেঙ্কারির মধ্যেও সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি নয়।
এখন আমরা যেসব বিষয় নিয়ে ব্যস্ত, সেগুলো আসলে মূল সত্য থেকে চোখ সরানোর একধরনের কৌশল। ইচ্ছা করে হোক বা অজান্তে—এই দৃষ্টি ঘোরানোর কাজটা অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষরাই করছেন। কারণ, এতে করে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় না।
এপস্টিন অপরাধ নিয়ে ক্ষমতাবানদের এই মায়াকান্না আমার দরকার নেই; বরং প্রশ্নটা হওয়া উচিত—বাস্তবে কী করা হয়েছে? ক্ষমতায় থাকা কেউ কি সেই কাঠামো আর মানসিকতার বিরুদ্ধে সত্যিকারের আঘাত হেনেছে, যা এসব অপরাধ সম্ভব করেছে?
এখন আমাদের হাতে এমন নথি আছে, যেগুলো পড়লেই দেখা যায়—পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান কিছু মানুষ নারীদের নিয়ে কীভাবে কথা বলেন, কীভাবে ভাবেন। শুধু তা-ই নয়, কিশোরীদের সম্পর্কেও তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি কী রকম। আর ঠিক এই সত্যের দিকেই আমরা তাকাতে চাইছি না।
আসলে এই অন্ধকার বাস্তবতা আমাদের জন্য পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত হওয়ার কথা নয়। যে মানুষটি যথেষ্ট ধূর্ত, যথেষ্ট ক্ষমতাবান, তাঁর পক্ষে এমন কোনো অপরাধ নেই—যেটিকে সে টাকা, দানখয়রাত আর সমাজসেবার মোড়কে ঢেকে ফেলতে পারে না; মানবতার মুখোশ পরিয়ে দিতে পারে না।
২০১৮ সালের শেষ দিকে বা ২০১৯ সালের শুরুতে ধারণ করা এপস্টিনের একটি সাক্ষাৎকারের ভিডিও আছে। সেখানে দেখা যায়, কাঠের প্যানেল দেওয়া একধরনের অভিজাত ক্লাব ঘরে বসে তিনি খুব শান্ত, প্রায় দার্শনিকের মতো কথা বলছেন। বলছেন, পুরোনো চিন্তাধারায় তিনি এত দিন জীবন চালিয়েছেন; কিন্তু ভবিষ্যৎ? তাঁর মতে নারীদের চিন্তার দিকেই যাচ্ছে। কথাগুলো শুনতে সুন্দর, আধুনিক ও প্রগতিশীল; কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই কথাগুলোর ভয়াবহ বৈপরীত্যই আসল সত্য।
ক্যামেরা একটু সরে যেতেই দেখা যায়, সাক্ষাৎকারটি নিচ্ছেন তাঁর বন্ধু স্টিভ ব্যানন। ব্যানন সরাসরি প্রশ্ন করেন—তরুণীদের বিরুদ্ধে এত বিকৃত কাজের পর এই কথাগুলো কি আসলে নিজের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা নয়?
এপস্টিন মুচকি হেসে বলেন, তিনি নাকি ‘টাইমস আপ’ আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থক। মনে প্রশ্ন জাগে—তিনি কি সত্যিই #মি টু যুগের এই দাতব্য সংস্থায় টাকা দিয়েছিলেন? আমার সন্দেহ নেই, দিয়েছিলেন।
রূপ বদলানো মানুষ তো রূপ বদলাবেই। এপস্টিনের মৃত্যুর কয়েক বছর পর ব্যানন এই ফুটেজ ব্যবহার করে ‘দ্য মনস্টার্স’ নামে একটি তথ্যচিত্র বানান। এখন তিনি এপস্টিনকে বলেন ‘একজন বৈশ্বিক শিশু যৌন অপরাধী’। স্বাভাবিক—এখন তিনি সেটিই বলবেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক নথিতে দেখা যায়, একসময় এই ব্যাননই এপস্টিনকে টিকে থাকার কৌশল বাতলে দিচ্ছিলেন। এমনকি মানব পাচার ও কিশোরী পতিতাবৃত্তিকে ‘বৈশ্বিক সমস্যা’ হিসেবে দেখিয়ে একটি বড় কেন্দ্র গড়ে তোলার পরামর্শও দিয়েছিলেন।
শুনতে স্যাটার ডে নাইট লাইভের কোনো বাতিল স্কেচের মতো লাগতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা হলো যৌন নিপীড়কেরা ভুয়া দাতব্য সংস্থা বানিয়ে দুর্বল মানুষের কাছাকাছি পৌঁছায়, এটা নতুন কিছু নয়। চার্চ থেকে শুরু করে নানা সাহায্য সংস্থা—সবখানেই এর উদাহরণ আছে। আর এই নথিগুলো যদি কিছু দেখিয়ে থাকে, তা হলো এ ধরনের উদ্যোগে দাতা হতে চাইতেন অসংখ্য অতি ধনী পুরুষ, এমনকি নিজের কন্যাসন্তান থাকা সত্ত্বেও যাঁরা অন্য বাবার মেয়েদের ওপর হওয়া নির্যাতন উপেক্ষা করতে রাজি।
এপস্টিন ভাবছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে যদি কোনো সিনেট শুনানি হয়, তাহলে কীভাবে সামলাবেন। তাঁর মতে, ব্রেট ক্যাভানারের কৌশল অনুসরণ করাই ভালো—যিনি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করে শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হয়েছিলেন। সেই কৌশল কাজ করেছিল। ক্যাভানার আজীবন আমেরিকান নারীদের জীবনে প্রভাব রাখবেন। আর ‘গ্র্যাব দেম বাই দ্য পুসি’ বলা মানুষটি? তিনি তো দুবার প্রেসিডেন্টই হলেন।
তাই এপস্টিন অপরাধ নিয়ে ক্ষমতাবানদের এই মায়াকান্না আমার দরকার নেই; বরং প্রশ্নটা হওয়া উচিত—বাস্তবে কী করা হয়েছে? ক্ষমতায় থাকা কেউ কি সেই কাঠামো আর মানসিকতার বিরুদ্ধে সত্যিকারের আঘাত হেনেছে, যা এসব অপরাধ সম্ভব করেছে?
আমরা বহুদিন ধরে এপস্টিনের জগৎ সম্পর্কে জানি। মায়ামি হেরাল্ড–এর সাংবাদিক জুলি কে ব্রাউন (যাঁর ২০১৮ সালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এই কেলেঙ্কারির মোড় ঘুরিয়ে দেয়) সোজাসাপটা বলেছিলেন: এপস্টিন তাঁর অপরাধ থেকে পার পেয়েছেন। কারণ, সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তর তাঁকে পার পেতে দিয়েছে।
আর নির্যাতিত নারী ও কিশোরীরা? তারা শুধু গল্প এগিয়ে নেওয়ার উপকরণ। যেমনটা তারা বরাবরই ছিল।
এটা ‘পুসি-গ্র্যাবারদের’ দুনিয়া। আমরা শুধু তাতে বেঁচে আছি। পার্থক্য একটাই—এখন সেটা কালো-সাদা অক্ষরে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, লেখক: মারিনা হাইড

