ইদানীং যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় করপোরেট এক্সিকিউটিভদের ‘ভূরাজনীতি’ নিয়ে বিশেষ কোর্স করানো হচ্ছে, আমার ‘ভূরাজনীতি’ পাঠ একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবে সামরিক বিজ্ঞান পাঠ আর এশিয়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ম্যাক্রো অডিটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে গেল ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনে ও দেখে আমার সেই সীমিত জ্ঞান কিছুটা বেড়েছে বলে মনে হয়।
বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে আগে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন ব্যবস্থাপনার সীমা ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে বলে অনেকেরই মত। নিয়মিত কূটনীতির আড়ালে তারা এমন কিছু বাধ্যতামূলক প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করছে, যা সরকার চলে যাওয়ার বহু পর পর্যন্ত দেশকে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক গোলকে বেঁধে রাখবে। এখানে যা ঘটছে, তা নিছক ক্ষমতার গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং এটি এক ধরনের রাজনৈতিক আগাম দখল বা পলিটিক্যাল প্রি-এম্পশন, যেখানে জনগণ ভোট দেয়ার আগেই একটি অনির্বাচিত প্রশাসন বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠন করে দিচ্ছে বলে মনে হয়।
এ সরকারের মূল ও একমাত্র ম্যান্ডেট ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা। তারা বরং নিজেদের এমন এক ‘বিপ্লবী সরকার’-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ করেছে, যারা দেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামোয় অনেকটা ভূকম্পন সৃষ্টিকারী পরিবর্তন আনছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে, শেষ কয়েক সপ্তাহে দ্রুত ও মৌলিক রূপান্তরমুখী তৎপরতার একটি স্পষ্ট ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপটি আসে ৩ ফেব্রুয়ারি, যখন জাপানের সঙ্গে ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর’ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এটি প্রক্রিয়াগত কাঠামো হিসেবে উপস্থাপিত হলেও বাস্তবে এটি একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক বার্তা। এ চুক্তি বাংলাদেশের জন্য উন্নত জাপানি সামরিক প্রযুক্তি—যেমন রাডার ব্যবস্থা ও টহল জাহাজ—ক্রয়ের পথ খুলে দেয় এবং একই সঙ্গে ঢাকাকে জাপানকেন্দ্রিক এবং পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ, ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করে। এর আগে ১৮ মাস ধরে চীন ও রাশিয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিরক্ষা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে একটি বিশৃঙ্খল কিন্তু সচেতন দূরত্ব তৈরি করা হয়েছে।
তবে এ পুনর্বিন্যাসে কোনো সুসংহত কৌশলগত যুক্তি দেখা যায় না, যা ইঙ্গিত দেয় যে এর পেছনে প্রধানত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই কাজ করছে। চীনের জে-১০ যুদ্ধবিমানে প্রাথমিক আগ্রহ বাতিল করে ব্যয়বহুল পশ্চিমা প্লাটফর্ম—যেমন ইউরোফাইটার টাইফুন—এর দিকে ঝোঁকা হয়েছে। আরো বিস্ময়কর হলো, একই সঙ্গে পাকিস্তান-চীন যৌথ উদ্যোগের জেএফ-১৭ ব্লক-থ্রি যুদ্ধবিমান নিয়েও আলোচনা চলছে, যা প্রযুক্তিগতভাবে তুলনামূলক দুর্বল। এ বিভ্রান্তি কোনো সক্ষমতা বৃদ্ধির সুস্পষ্ট পরিকল্পনার চেয়ে বরং পুরনো সরবরাহ শৃঙ্খল ছিন্ন করার উদগ্র চেষ্টাকেই নির্দেশ করে। বিশেষত জেএফ-১৭ ব্যাপারটি পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষের সঙ্গে একটি গভীরতর আদর্শিক ও ভূরাজনৈতিক সংযোগের সেতু হিসেবে কাজ করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তুরস্কের স্বাভাবিকের বেশি উষ্ণ সম্পর্ক তাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম লক্ষণীয় দিক। এটি শুধু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—যার এরই মধ্যে তুরস্কের বোরান হাউইটজার ও টিআরজি-৩০০ রকেট ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ সম্পর্কের ছায়ায় একটি উচ্চকিত রাজনৈতিক অভিযোগও বিদ্যমান: নির্বাচনের আগে তুরস্ক ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন দিচ্ছে বলে আলোচিত।
তুরস্কের স্বার্থ দ্বিমুখী। প্রথমত, দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য একটি লাভজনক বাজার গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ইসলামের ধারা বিস্তার করা। প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে এ সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ইউনূস প্রশাসন যেন তুরস্ককে বাংলাদেশের সম্ভাব্য নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার একজন বহিঃগ্যারান্টর হিসেবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, যা হবে কম ধর্মনিরপেক্ষ এবং আঙ্কারার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অধিক সাযুজ্যপূর্ণ। এতে একটি মৌলিক স্বার্থসংঘাত তৈরি হয়: যে অন্তর্বর্তী সরকারকে নিরপেক্ষ থেকে নির্বাচন তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তারা কেন এমন একটি বিদেশী শক্তিকে এত আগ্রাসীভাবে কাছে টানছে, যার বিরুদ্ধে সেই নির্বাচনেই হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে?
নির্বাচনের মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি, ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় শুল্ক চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের রফতানির ওপর শুল্ক হ্রাস অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও এর বিনিময়ে আসছে কিছু বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার। বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট মার্কিন পণ্য, বিশেষ করে বোয়িং উড়োজাহাজ—ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, যা বহু বিলিয়ন ডলারের এবং কয়েক দশকব্যাপী বাস্তবায়নমুখী একটি ব্যয় সিদ্ধান্ত।
নির্বাচনের ঠিক আগে একটি অনির্বাচিত কিংবা অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক এমন বৃহৎ ও কৌশলগত মূলধনি আমদানিতে দেশকে আবদ্ধ করা নজিরবিহীন। উদ্দেশ্য অনেকটাই যেন স্পষ্ট: পরবর্তী সরকারকে একটি পশ্চিমাঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বে এমনভাবে বেঁধে দেয়া, যাতে পুরনো সরবরাহকারীদের দিকে ফিরে যাওয়া চুক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
আগেই বলেছি, জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে ৩ ফেব্রুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি নির্ধারিত ৯ ফেব্রুয়ারি, যার গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলি জনসম্মুখে প্রকাশ করা হচ্ছে না নন-ডিসক্লোজার চুক্তির দোহাই দিয়ে। অনেকেই বলেছেন এ সময়সূচি কাকতালীয় নয়, বরং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে প্রশ্ন থেকে যায় উদ্দেশ্য নিয়ে। কেন এই শেষ মুহূর্তের রাষ্ট্রচালনার উন্মত্ততা? তাও আবার একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ সরকারের হাতে। ছাত্র আন্দোলন ও আত্মত্যাগের ফলে ক্ষমতায় এসে গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়া এক অর্থে বোধগম্য। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তা তার অনেক ঊর্ধ্বে।
উদীয়মান ধারা ইঙ্গিত দেয় তরুণদের প্রভাবিত সরকারের লক্ষ্য শুধু একটি রূপান্তরকাল পরিচালনা করা নয়, বরং এমন একটি স্থায়ী নীতিগত পরিবেশ নির্মাণ করা, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও অটুট থাকবে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা জোট, তুরস্কের দিকে ঝোঁক—সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যেন আগামভাবেই আগামী নির্বাচিত সরকারের ভূরাজনৈতিক দিকনির্দেশনা গণ্ডিবদ্ধ করে দিতে চাইছে।
ওয়াশিংটন, টোকিও কিংবা আঙ্কারা—প্রতিটি শেষ মুহূর্তের চুক্তিই ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশীরা যে সরকার নির্বাচন করবে, তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর সংকুচিত করছে। এটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধান নয়; এটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত প্রকৌশল। আসল পরীক্ষা হবে নির্বাচনের পর, যখন নতুন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—জনগণের ম্যান্ডেট কি ভোটের আগেই রচিত একটি নকশাকে মোকাবেলা বা অতিক্রম করতে পারবে?
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
সূত্র: বণিক বার্তা

