অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি হলো। আমরা প্রায় ১৫ মাস ধরে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার কথা শুনে আসছিলাম। নির্বাচন কি আসলেই হবে, এই প্রশ্ন অনেকে করেছেন। শেষ মুহূর্তে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা অথবা গুজব ছড়ানো হয়েছিল।
রাস্তাঘাটে ‘মব সহিংসতা’ দেখে অনেকে মনে করেছিলেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে না। সরকার বলছিল, নির্বাচন হবে এবং শান্তিপূর্ণ হবে; কিন্তু অনেকেই তাতে আস্থা রাখতে পারছিলেন না।
কিন্তু নির্বাচন হলো। তাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো ছিল। যাঁরাই ভোট দিতে চেয়েছেন, তাঁরা ভোট দিতে পেরেছেন। এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকার, সশস্ত্র বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসহ নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত সবাই অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। সবার চেষ্টায় ভালো নির্বাচন হয়েছে। আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।
নির্বাচনের আগে ফল নিয়ে নানা রকম আলোচনা ও পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছিল। অনেকেই বলছিলেন বিএনপি জিতবে। প্রশ্ন ছিল ব্যবধান কত হবে। ধারণা অনুযায়ী বিএনপি জিতেছে। কিন্তু বিএনপি একাই ২০৯টি আসন পাওয়ার (আরো দুটি আসনে বিএনপি বেসরকারিভাবে জিতেছে, তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞায় নির্বাচন কমিশন ফল প্রকাশ করেনি) বিষয়টি অনেকের কাছে অবাক করার মতো। কারণ, ভোটের আগে জামায়াতের উত্থান অনেক বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছিল। অন্যদিকে বিএনপিতে অনেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন।
ভোটে দেখা গেল, বিএনপির বিদ্রোহীরা অনেক বেশি জিতে আসতে পারেননি। দেশে দলীয় প্রতীক যে এখনো গুরুত্বপূর্ণ, সেটা প্রমাণিত হলো এর মাধ্যমে।
জামায়াত সরকার গঠন করার মতো অবস্থানে যেতে না পারলেও তাদের ফল ভালো হয়েছে। কারণ, তারা এর আগে কখনোই ১৮টির বেশি আসন পায়নি। এবার পেয়েছে ৬৮টি। অতীতে তারা দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ভালো করত। এবার নতুন কিছু অঞ্চলে জামায়াত শক্তিশালী অবস্থান জানান দিয়েছে। তার মধ্যে একটি রাজধানী ঢাকা। সব মিলিয়ে বলা যায়, জামায়াত একটি বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নতুন দল। তারাও ভালো করেছে। দলটি ছয়টি আসন পেয়েছে। অনেক আসনে ভালো ভোট পেয়েছে। আশা করি, এই দল থেকে জয়ী তরুণেরা জাতীয় সংসদে তরুণদের আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরবেন।
নির্বাচনে দুজন নারী প্রার্থীর দিকে আমার নজর ছিল। একজন রুমিন ফারহানা। তিনি বিএনপি-জোটের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করে জিতে এসেছেন। এটা বড় ব্যাপার। দ্বিতীয় প্রার্থী হলেন তাসনিম জারা। তিনি একা লড়াই করে বেশ ভালো ভোট পেয়েছেন। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের মনোনয়ন দিতে চায় না। দলীয় প্রার্থিতার বাইরেও নারীরা যে ভালো করতে পারেন, তার প্রমাণ এই দুজন।
মানুষ নির্বাচনে ভোট দিতে চেয়েছিলেন। কারণ, বিগত তিনটি নির্বাচনে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণেরা পছন্দের প্রার্থী বেছে নিতে পারেননি, ভোট দিতে পারেননি। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনকে হয়তো পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক বলা যাবে না, কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ এ বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন। মানুষ নির্বাচন চাইছিলেন; কারণ, তাঁরা অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি চাইছিলেন। ১৮ মাস ধরে অনেক ‘মব সহিংসতার’ মধ্যে মানুষ ধরে নিয়েছিলেন, স্থিতিশীলতার স্বার্থে নির্বাচিত সরকার দরকার।
এবার নির্বাচনী প্রচারের সময় কম ছিল। পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, দুই দলের মধ্যে খুব বেশি উত্তেজনা তৈরি হয়নি, যেটা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে হতো; বরং কিছুটা শোভন আচরণ করতে দেখা গেছে। চাঁদাবাজি, দখল ইত্যাদি নিয়ে বিএনপির প্রতি আক্রমণ করা হয়েছে। আবার জামায়াতকে শরিয়াহ, নারী ইত্যাদি বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করতে হয়েছে। কোনো দলই ভারতবিরোধিতার কার্ড খুব একটা খেলেনি।
নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত বড় কোনো অভিযোগ এখন পর্যন্ত শুনিনি। আশা করব, এমন সুযোগ থাকবেও না। বিচ্ছিন্ন যেসব অভিযোগ উঠেছে অথবা উঠবে, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নেবে এবং তাতে মানুষের আস্থার সংকট কাটবে।
সব মিলিয়ে প্রমাণ হলো, সরকার চাইলে ভালো নির্বাচন সম্ভব।
সামনে কী
জুলাই পরবর্তী মানুষের অনেক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। নতুন সরকারেও সেই প্রত্যাশার চাপে পড়তে হবে। নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে, অতীতের মতো চর্চা করতে থাকলে অসন্তোষ তৈরি হবে।
আমি এখন বলতে চাই নতুন সরকারের কাছে মানুষ কী কী চায় না।
এক. মানুষ রাজনৈতিক দলের মধ্যে এবং রাজনৈতিক দলের নিজেদের মধ্যে কোন্দল–সহিংসতা চায় না।
দুই. বিজয়ীরা সবকিছু নিয়ে নেবে—এই চর্চা যেন না থাকে। বারবার আমাদের গণতন্ত্রে উত্তরণ হয়, কিন্তু টিকে থাকতে পারি না; কারণ, বিজয়ীরা সবকিছু নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা হয়। এটা পরিহার করতে হবে।
তিন. মানুষের মধ্যে ধারণা আছে যে রাজনীতিকে টাকা কামানো ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য ব্যবহার করা হয়। এটা বন্ধ করতে হবে। মানুষ এটা আর চায় না। সংসদ সদস্য এবং সরকারে যাওয়া ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থের সংঘাত কোথায় কোথায় আছেন, সেই ঘোষণা দিতে পারেন।
চার. দলীয়করণ বন্ধ করা দরকার। অতীতে যখন যে দল আসে তখন প্রশাসন, পুলিশ, সব রাষ্ট্রীয় ও সরকারি সংস্থাসহ সব জায়গায় নিজেদের লোক বসিয়ে দিত। মানুষ এটা আর দেখতে চায় না।
পাঁচ. কিছু কিছু কাজ সহজে করা যায়। যেমন সম্পদের হিসাব দেওয়া। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা যাওয়ার আগে সম্পদের হিসাব দিয়েছেন। নতুন সরকার এই চর্চা বজায় রাখতে পারে। সংসদ সদস্যদের বিনা শুল্কে গাড়ি কেনার সুবিধা, স্থানীয় সব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে থাকা ও প্রটোকল নেওয়া ইত্যাদি বাতিল করা উচিত।
জামায়াতের প্রতি প্রত্যাশা হলো, তারা সংসদে এবং সংসদীয় কমিটিগুলোতে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে। কথায় কথায় রাজপথে নেমে সরকার ফেলে দেওয়ার হুমকির বদলে তারা গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে এবং সংসদকে কার্যকর করবে।
রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কিংবা রিকনসিলিয়েশন কমিশন করবে। তারা যেন এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়। প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করা এবং সবাইকে নিয়ে চলার জন্য এই কমিশন দরকার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অনেকের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা করা হয়েছে। মাসের পর মাস জামিন না দিয়ে আটকে রাখার ঘটনা ঘটছে।
এ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এতে উন্নতি হবে না এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী যে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেখানে সবার মানবাধিকার নিশ্চিত করা দরকার।
নতুন সরকারকে সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে জোর দিতে হবে। কারণ, এটা গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। সংগঠন করার স্বাধীনতা, সমালোচনার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সহনশীলতা (টলারেন্স) ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না, টেকানো যায় না।
- রওনক জাহান: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সূত্র: প্রথম আলো

