দীর্ঘ সময় পর দেশের জনগণ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে একটি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। জুলাইয়ের উত্তাল গণ-অভ্যুত্থানের পর গত দেড় বছর দেশের শাসন কোনো রাজনৈতিক সরকারের অধীনে ছিল না। এর আগে আরও দীর্ঘ সময় ধরে দেশ একধরনের অঘোষিত স্বৈরশাসন এবং জনবিচ্ছিন্ন সংসদ পরিচালনার অভিজ্ঞতা ভোগ করেছে।
সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এবার ব্যালটের মাধ্যমে জনগণ স্পষ্টভাবে তাদের রায় দিয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফলও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিজয়ী জনপ্রতিনিধিরা এখন দেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ একটি উৎসবমুখর রাজনৈতিক পরিবেশের অপেক্ষায় ছিল। তবে নির্বাচনের পর কিছু এলাকায় অস্থিরতা ও সহিংসতার খবর জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
গত দেড় যুগে দেশের শাসনযন্ত্র এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে সংসদ কেবল ক্ষমতার বৈধতা দেওয়ার একটি যান্ত্রিক কাঠামোতে পরিণত হয়েছিল। সেখানে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়ে চাটুকারিতা এবং স্বার্থসিদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন। মানুষের মৌলিক অধিকার, জীবনযাত্রা, কৃষক ও শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিয়ে কোনো শক্তিশালী আলোচনা হয়নি। বরং সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধের ব্যবস্থা সেখানে চূড়ান্ত হতো।
দেশের মানুষের জন্য কাজ করার কথা থাকলেও এক শ্রেণির সংসদ সদস্য ব্যস্ত ছিলেন জনগণের সম্পদ লুটে নেওয়া এবং ক্ষমতার আশেপাশের গোষ্ঠীর তোষণ করতে। আদালতের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার তখন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে একের পর এক পরিবেশ ও প্রকৃতিবিধ্বংসী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এখনো হুমকি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই দীর্ঘ অন্ধকারের পরে এখন বাংলাদেশের সামনে নতুন সূর্যোদয়ের প্রত্যাশা।
সংসদ কার্যকর না থাকলে জনতা বাধ্য হয় রাজপথে নামতে। রাজপথে নামার সঙ্গে আসে সংঘাত ও প্রতিকূলতা। গত ১৮ বছরে আমরা বারবার এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি। জনদাবি আদায়ের কোনো কার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে আস্থা না থাকায় শিক্ষার্থী, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষকে বাধ্য হয়ে আন্দোলন করতে হয়েছে।
জনপ্রতিনিধি নাগালের বাইরে থাকায় সাধারণ মানুষের সামনে অন্য কোনো বিকল্প রইত না। ফলে প্রতিটি দাবির জন্য সাধারণ মানুষকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। পুলিশি লাঠিপেটা ও জলকামানের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে বানোয়াট মামলার যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। রাজপথে নামা মানেই ছিল ব্যক্তিগত জীবনে অসংখ্য দুর্ভোগ। যদি রাজপথই সব সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে থাকে, তাহলে জনগণের কষ্টার্জিত ভোট এবং বিপুল ব্যয়ের মাধ্যমে আয়োজন করা নির্বাচনের তাৎপর্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নির্বাচনের পর দেশে শান্তি ও স্বস্তির পরিবেশ থাকা অপরিহার্য।
দীর্ঘ সময় সড়ক অবরোধের কারণে শহরজুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে, অজস্র কর্মঘণ্টা অপচয় হয়েছে। রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকার দৃশ্যও বহুবার দেখা গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব শিক্ষা ও অর্থনীতিতে গভীর ক্ষতি করেছে, যা আমরা এখনও বহন করছি। বারবার জনগণ এই সংকট থেকে মুক্তি চেয়েছে, কিন্তু কার্যকর গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবে রাজপথই একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে।
এবার নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে। একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে, একই সঙ্গে বিরোধী দলও তাদের দায়িত্ব পালন করবে। আমরা আশা করি, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আর কখনোই অসহনীয় রাজনৈতিক অস্থিরতায় ফিরে যাবে না।
ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো, রাজনীতির দ্বন্দ্ব সংসদের বাইরে সমাধান করার চেষ্টা করলে যুক্তিতর্কের বদলে বাহুবল প্রাধান্য পায়। গণতন্ত্রে সংসদই বিতর্কের কেন্দ্রস্থল। সেখানে আলোচনার মাধ্যমে জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসা উচিত। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের দাবিগুলো নিয়মিত সংসদে উত্থাপন করা। জনদূর্দশার কথা সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া বিরোধী দলের দায়িত্ব, আর তা যৌক্তিকভাবে সমাধান করা সরকারের কর্তব্য। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাংলাদেশে অনেক দিন ধরে বিস্মৃত ছিল। এবার জনগণের আশা, সংসদে সরকারি ও বিরোধী দল সমানভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।
ভোটের ফল প্রকাশের পর কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্ন সহিংসতা দেখা গেছে, যা গণতন্ত্রের পথে প্রথম বড় বাধা। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। বিজয়ীদের বিনয় এবং পরাজিতদের ধৈর্য জরুরি। যারা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে, তারা মূলত দেশের আইন ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে অস্বীকার করছে। গত দেড় বছর দেশের সাধারণ মানুষ অনেক আশা নিয়ে রাজনৈতিক সরকারের আগমনের জন্য অপেক্ষা করেছে। নতুন সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষা হবে আইনশৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
যদি রাজপথই সব সমস্যার সমাধানের একমাত্র স্থান হয়ে থাকে, তাহলে জনগণের কষ্টার্জিত ভোট ও বিপুল ব্যয়ের নির্বাচনের তাৎপর্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ও স্বস্তিপূর্ণ পরিবেশ অপরিহার্য। দীর্ঘদিন মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না এবং নানা নাগরিক কষ্টের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছে। তাই নতুন নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন সহজ করা এবং রাজনৈতিক সংঘাত কমানো।
রাজপথকে বিশ্রাম দেওয়া মানে রাজনৈতিক অনুপস্থিতি নয়, বরং এর অর্থ হলো এর যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রতিবাদ বা সংহতির জন্য সব সময় রাস্তা অবরোধ করতে হবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর সমাধান আসতে হবে সংসদ থেকেই। যখন নাগরিক জানবেন যে সংসদে তাঁর হয়ে জনপ্রতিনিধি কথা বলছেন বা গণমাধ্যম যথাযথভাবে সংসদীয় বিতর্ক তুলে ধরছে, তখন মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
তারা আর রাজপথ দখল করে নাগরিক ভোগান্তি তৈরি করতে আগ্রহী হবেন না। বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্ররা—যারা তাঁদের ন্যায্য দাবিতে মাসের পর মাস আন্দোলন করেছেন—এবার সংসদ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন। বিচার বিভাগের সংস্কার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও সংসদে গুরুত্বসহকারে উত্থাপিত হওয়া প্রয়োজন।
বিগত সরকারের সময়ে প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি যে অবহেলা দেখা গেছে, নদীনালা ও বন দখলের যে প্রবণতা চলেছে, তার বিরুদ্ধে এবার সংসদকে সোচ্চার হতে হবে। সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করা জরুরি, যাতে জনগণের প্রতিটি টাকার হিসাব যথাযথভাবে তদারক করা যায়। রাজনীতির চর্চা যখন প্রাসাদ বা রাজপথে নয়, বরং সংবিধানসম্মত নির্ধারিত কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে, তখনই গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ফিরে আসবে। এটি দেশের সত্যিকারের উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তন এসেছে, তার সার্থকতা নির্ভর করছে একটি স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ সরকার গঠনের ওপর। এবার জনগণ কেবল নির্বাচন চায়নি; তারা চেয়েছে ক্ষমতায় প্রকৃত অংশীদারিত্ব। সংসদের ভেতরে ও বাইরে জনমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনই হবে নির্বাচিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রকৃত পরীক্ষা।
রাজপথের আন্দোলনে কাঁদানে গ্যাসের শেলের ধোঁয়া মানুষকে দীর্ঘদিন ভুগিয়েছে। বাংলাদেশ এখন পরিপক্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশায়। সাধারণ মানুষ দিন শেষে শুধু শান্তিতে বাঁচতে চায় এবং তাদের ভোট ও মৌলিক অধিকার রক্ষা দেখতে চায়। নতুন সংসদের ওপর মানুষের প্রত্যাশা মোটাদাগে এতটুকুই।
ক্ষমতাসীন দল যেন অহংকার পরিহার করে সর্বস্তরের মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং বিরোধী দল যেন হীন স্বার্থে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতিতে ফিরে না যায়। আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে গেলে রাজনীতির নামে সহিংসতা আবার রাজপথে ফিরে আসবে, যা কারও কাম্য নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মাধ্যমে যে নতুন রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হচ্ছে, তা যেন সত্যিকারের কল্যাণমুখী ও অহিংস পথনির্দেশক হয়। রাজপথ ফিরে পাক তার স্বাভাবিকতায়, আর সব মতপার্থক্যের সমাধান হোক জাতীয় সংসদে।

