কয়েক দশক ধরে ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন (ইসরো) ভারতের বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের গর্ব হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্ব মহাকাশ অঙ্গনে ইসরো যেন সেই ‘ডেভিড’, যে নিয়মিতভাবে শক্তিধর ‘গোলিয়াথ’-দের ছাড়িয়ে যায়।
মঙ্গল কক্ষপথে ভারতের প্রথম অভিযান মার্স অরবিটার মিশন (যা ‘মঙ্গলযান’ নামে পরিচিত) প্রথম চেষ্টাতেই সফল হয়েছিল। এমন সাফল্য অন্য কোনো দেশ পায়নি। আবার চন্দ্রযান-৩ অভিযানের মাধ্যমে ভারত চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে প্রথমবারের মতো রোভার নামাতে সক্ষম হয়। আর এই সবই করা হয়েছে এমন বাজেটে, যা হলিউডের মহাকাশভিত্তিক একটি সিনেমার প্রচারণা খরচের সমানও নয়।
গত এক বছরে ইসরোর দীর্ঘদিনের সাফল্য তিনটি বড় মিশন ব্যর্থতার কারণে চাপে পড়েছে। এর মধ্যে টানা দুবার পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল (পিএসএলভি) রকেট উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়েছে। ইসরো সব সময় কম খরচে নতুন প্রযুক্তি আর নির্ভরযোগ্যতার জন্য পরিচিত ছিল। তাই এই ব্যর্থতা শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, ইসরোর সুনামেও আঘাত। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক মহাকাশ বাজারে ভারতের অবস্থান দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
পিএসএলভি প্রায় ৩০ বছর ধরে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির প্রধান ভরসা। এই রকেটই ভারতকে চাঁদ ও মঙ্গলে পৌঁছে দিয়েছে। প্রায় ৪০০ বিদেশি উপগ্রহ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করে এটি আন্তর্জাতিক উৎক্ষেপণ বাজারে ভারতের জন্য উল্লেখযোগ্য আয় এনেছে। কিন্তু ২০২৫ সালের মে মাসে পিএসএলভি-সি ৬১ এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পিএসএলভি-সি ৬২ মিশনে তৃতীয় ধাপে ত্রুটির কারণে গুরুত্বপূর্ণ পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ও কৌশলগত উপগ্রহ হারিয়ে যায়।
এই ব্যর্থতাগুলো আংশিকভাবে ইসরোর মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিতও দিতে পারে। শুরুতে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল দেশের মানুষের প্রয়োজন মেটানো। স্যাটেলাইট প্রযুক্তিকে উন্নয়নের কাজে লাগিয়ে মানুষের জীবন বদলানো, অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং বিশ্বে ভারতের অবস্থান মজবুত করা—এটাই ছিল লক্ষ্য।
ইসরো এই লক্ষ্য পূরণ করেছে। ভারতের জাতীয় স্যাটেলাইট ব্যবস্থা এবং পরবর্তীকালের জিওসিঙ্ক্রোনাস স্যাটেলাইট সিরিজ দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে যোগাযোগসুবিধা পৌঁছে দিয়েছে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকার মানুষ চিকিৎসাসেবা পেয়েছে। দূরশিক্ষার মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষালাভের সুযোগ পেয়েছে।
পাঞ্জাব ও তামিলনাড়ুর কৃষকেরা ‘রিসোর্সস্যাট’-এর মতো পৃথিবী পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে ফসলের স্বাস্থ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা নজরদারি করেন। ঘূর্ণিঝড়ের সময় ইসরোর আগাম সতর্কবার্তা বহু মানুষের জীবন রক্ষা করে। অর্থাৎ মহাকাশ প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই খাত সরাসরি হাজার হাজার বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদকে কাজ দেয় এবং পরোক্ষভাবে উৎপাদন, সফটওয়্যারসহ বহু শিল্পকে সহায়তা করে।
গবেষণা বলছে, এই খাত ভারতের অর্থনীতিতে বছরে বিলিয়ন ডলার যোগ করে। নিজস্ব রকেট প্রযুক্তি তৈরি করে ভারত বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। এর ফলে স্টার্টআপ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের একটি শক্তিশালী পরিবেশ গড়ে উঠেছে।
ইসরোর বাণিজ্যিক শাখা নিউস্পেস ইন্ডিয়া লিমিটেড বিদেশি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব অর্জন করেছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, কম খরচে উৎকর্ষ অর্জন সম্ভব। ভারত আন্তর্জাতিক মহাকাশ বাজারে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী অংশীদার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
মঙ্গলযান ও চন্দ্রযান-৩ ভারতের কূটনৈতিক মর্যাদা বাড়িয়েছে। মহাশক্তিগুলোর সঙ্গে সমান অংশীদার হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আগ্রহী হতে অনুপ্রাণিত করেছে। তবে সাম্প্রতিক ব্যর্থতা দেখায়, ইসরোর বাড়তি উচ্চাকাঙ্ক্ষা (দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণ, মর্যাদাপূর্ণ প্রকল্প, মহাকাশে ভারতীয় নভোচারী পাঠানো) মান নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি করছে।
এখানে বড় সমস্যা হলো অর্থায়ন। বর্তমানে ভারত বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার মহাকাশ খাতে ব্যয় করে। তুলনায় চীন ব্যয় করে ১৬ বিলিয়ন ডলার, আর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ বিলিয়ন ডলার। ভারতের বর্তমানে সক্রিয় পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ প্রায় ২১টি। চীনের রয়েছে ১,০০০-এর বেশি, যার মধ্যে ২৫০টি সামরিক কাজে ব্যবহৃত।
চীন গত বছর পাকিস্তানের জন্য চারটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণে সহায়তা করেছে এবং সেপ্টেম্বরে ৪০৬ মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে আরও ২০টি উৎক্ষেপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এদিকে পাঁচ বছরে ৬০টি উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ভারতের লক্ষ্য সাম্প্রতিক ব্যর্থতার কারণে প্রশ্নের মুখে।
কম উৎক্ষেপণ হার এবং দীর্ঘ সময় ব্যবধানও ভারতের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কমিয়েছে। ২০১৭ সালে ছোট উপগ্রহ উৎক্ষেপণ বাজারে ভারতের অংশ ছিল ৩৫ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে প্রায় শূন্যে নেমে আসে। এ সময় আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা দ্রুত বাজার দখল করে।
এই পরিস্থিতিতে একটি কৌশলগত পুনর্বিন্যাস জরুরি। পিএসএলভি উৎপাদন ও পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষামূলক সামরিক মহাকাশ সক্ষমতা নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
- শশী থারুর: জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল। সূত্র: ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেট’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

