নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। গতকাল প্রধানমন্ত্রীসহ নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা শপথ নিয়েছেন। দেশে সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আগের আওয়ামী লীগ সরকার পদত্যাগ করেছে। এরপর দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থনীতি মূলত স্থবির অবস্থায় ছিল। বিনিয়োগে কোনো আশার সঞ্চার হয়নি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানও সংকুচিত অবস্থায় ছিল।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচিত সরকারের প্রতি প্রত্যাশা খুবই বেশি। ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষ সবাই নতুন সরকারের পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে। দেশের ব্যাংকের এক শীর্ষ নির্বাহী বলেন, “অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে বিনিয়োগনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ এবং বাজারে স্থিতিশীলতা আনা অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “নতুন সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের আস্থা। বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা না হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি স্থবির থাকার আশঙ্কা থাকবে।”
নতুন সরকারের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ বেশি, কিন্তু সম্ভাবনাও কম নয়। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা তাদের মূল কাজ হবে। নতুন সরকার এমন এক ব্যাংকিং ব্যবস্থার দায়িত্ব নিয়েছে, যা তিনটি পরস্পর সম্পর্কিত দুর্বলতায় ভুগছে—দুর্বল শাসনব্যবস্থা বা গভর্ন্যান্স, কমজোরি ব্যালান্স শিট, এবং নীতি-নির্ধারণে মানুষের দুর্বল আস্থা। এবার এই বিষয়গুলো একটু ব্যাখ্যা করা যাক।
প্রথমেই আসে সম্পদের গুণমান ও সুশাসনের প্রশ্ন। অত্যাধিক খেলাপি ঋণ, বারবার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা এবং স্বার্থপুষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার প্রবণতা ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থা তলানিতে নামিয়ে দিয়েছে। তাই এই খাতে সংস্কারের মূল স্লোগান হওয়া উচিত ‘গভর্ন্যান্স ফার্স্ট’।
এটি বাস্তবায়ন করতে হলে ব্যাংকের পরিচালক ও সিইওদের জন্য ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ পরীক্ষা চালু করা জরুরি। ঋণের প্রকৃত মালিকানা বা বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। পরিচালকদের মেয়াদ, অন্য ব্যাংকে বিনিয়োগের সীমা এবং স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়ন্ত্রণ পুনর্বিবেচনা করতে হবে। পরিবার, স্বার্থপুষ্ট পক্ষের সংজ্ঞা স্পষ্ট করতে হবে। এভাবে ব্যাংক কোম্পানি আইনকে ব্যাসেল-এর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সম্ভব। পুরোনো শাস্তিমূলক আইনগুলো যা ভালোকেও মন্দ বানিয়ে দেয়, সেগুলো এড়িয়ে যেতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মূলধন ও ব্যাংক রেজোল্যুশন বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের ব্যাংকের মূলধন বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে, ফলে কিছু ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার সংকটে রয়েছে। নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত স্বাধীন সম্পদ মান পর্যালোচনা এবং সময়সীমা নির্ধারণ করে পুনঃমূলধন যোগ করার পরিকল্পনা। তবে এটি সেই ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য, যারা সুশাসনকেন্দ্রিক সংস্কার এবং মন্দ ঋণ আদায়ে রাজি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করবে। যারা রাজি নয়, তাদের জন্য ব্রিজ ব্যাংক, পারচেজ অ্যান্ড অ্যাসাম্পশন এবং ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন টুলকিট প্রয়োগ করা হবে। বর্তমান গভর্নর ইতিমধ্যেই এসব বিষয়ের ওপর স্পষ্ট ধারণা রাখেন।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কার অপরিহার্য। রাজস্ব অপচয় বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ ও শাসনকাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। জবাবদিহি, পেশাদার পর্ষদ গঠন এবং ঋণ আদায়ের কঠোর নির্দেশনা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।
চতুর্থত, মুদ্রানীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মধ্যে সমন্বয় জরুরি। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং নীতিগত এলোমেলো সংকেত মানুষের বিশ্বাস ক্ষুণ্ণ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সুদের করিডর, তরলতার ব্যবস্থা ও নীতিমূলক সিদ্ধান্তে সামঞ্জস্য রাখতে হবে। কোনো প্রভাব বা চাপের কারণে সুদের হার পরিবর্তন হবে না তা নিশ্চিত করতে হবে।
শেষে, আইনের প্রয়োগ ও আস্থা তৈরি অপরিহার্য। মন্দ ঋণ আদায়ের জন্য আদালত-সংক্রান্ত ব্যবস্থা, ক্রেডিট ব্যুরো, অর্থপাচার বিরোধী আইন প্রয়োগ এবং ব্যাংকের স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ জরুরি। লক্ষ্য একটাই—অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ভবিষ্যদ্বাণীযোগ্য, স্থির ও স্বচ্ছ ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বিনিয়োগ আসে স্পষ্টতা থেকে, স্লোগান থেকে নয়।
- মাসরুর আরেফিন: চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশর অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি), ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, সিটি ব্যাংক।

