নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে জনগণের প্রত্যাশা থাকে দৃশ্যমান ও দ্রুত পরিবর্তনের। অবকাঠামো উন্নয়ন, বড় প্রকল্প এবং বিদেশনীতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে বাজারের অবস্থা। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামই মানুষের স্বস্তি বা অস্বস্তির মূল নির্ধারক। তাই নতুন সরকারের জন্য জনআস্থা দ্রুত অর্জনের সবচেয়ে বাস্তব সুযোগ হতে পারে বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। আর সেই ব্যবস্থাপনার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো—সিন্ডিকেট।
বাজারে সিন্ডিকেট বলতে বোঝানো হয় এমন এক অদৃশ্য সমন্বয়, যেখানে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা গোষ্ঠী সরবরাহ ও মূল্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে। কখনো কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, কখনো অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হয়, আবার কখনো আমদানি-রপ্তানির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করা হয়। ভোক্তাদের পকেট থেকে যেই অতিরিক্ত অর্থ বের হয়, সেটিই সিন্ডিকেটের লাভ। এই প্রবণতা নতুন নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ বাজার সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।
নতুন সরকারের জন্য বড় প্রশ্ন হলো—এই সংস্কৃতি কি বদলানো সম্ভব? উত্তর হলো, সম্ভব। তবে এর জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তার সমন্বয়। বাজার নিয়ন্ত্রণ মানে দাম নির্ধারণ নয়; বরং প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে একচেটিয়া প্রভাব থাকবে না, তথ্য লুকানো হবে না এবং নীতিনি
প্রথমত, সরবরাহ চেইনকে স্বচ্ছ করা অত্যাবশ্যক। কৃষক যে দামে পণ্য উৎপাদন করেন, শহরের ভোক্তা সেই পণ্য কেনেন কয়েকগুণ বেশি দামে—এই ব্যবধানের বড় অংশ যায় মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে। সরকার যদি উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার করে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা কঠিন হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মজুত ও সরবরাহের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করলে বাজারে গুজবের সুযোগ কমবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতা কমিশন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। আইন থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল—এই অভিযোগ বহুদিনের। নিয়মিত বাজার মনিটরিং, হঠাৎ অভিযান নয়, বরং ধারাবাহিক নজরদারি এবং বড় মুনাফাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বাজারে বার্তা যাবে যে সময় বদলাচ্ছে। শাস্তি কেবল ছোট ব্যবসায়ীর জন্য নয়; বড় গোষ্ঠীর জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।
তৃতীয়ত, আমদানি-নির্ভর পণ্যে নীতিগত স্থিরতা অপরিহার্য। হঠাৎ শুল্ক পরিবর্তন, অনুমতি বিলম্ব বা অস্পষ্ট নীতি অনেক সময় কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়। নীতির ধারাবাহিকতা ও আগাম ঘোষণা বাজারে পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি করে, যা সিন্ডিকেটের সুযোগ কমায়। একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে প্রণোদনা দিলে সরবরাহ বাড়বে এবং একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে।
চতুর্থত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাজার তদারকি জরুরি। বহু সময় অভিযোগ আসে, কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দায়মুক্ত থাকেন। নতুন সরকার যদি বাজার সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। প্রশাসনের বার্তা স্পষ্ট হতে হবে: বাজার কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি জনস্বার্থের ক্ষেত্র।
তবে কেবল দমনমূলক ব্যবস্থা নিয়েও সমাধান আসবে না। ব্যবসায়ী সমাজকে অংশীদার করা সমানভাবে জরুরি। নীতিনির্ধারণে তাঁদের মতামত নেওয়া, বাস্তব সমস্যাগুলো বোঝা এবং যৌক্তিক মুনাফার নিশ্চয়তা দেওয়া—এসব সমন্বয় করলে বাজার স্থিতিশীল থাকে। সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, অযৌক্তিক লাভ রোধ করা এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা।
নতুন সরকারের সাফল্য সবসময় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে মাপা হয় না। বরং সাধারণ মানুষ যখন মাসের শেষে বাজার করতে গিয়ে অনুভব করেন যে আগের মতো চাপ নেই, তখনই সরকারের প্রতি আস্থা জন্মায়। বাজারে স্বস্তি মানে শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তি নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতারও মূল ভিত্তি। মূল্যবৃদ্ধি অসন্তোষ বাড়ায়, আর ন্যায্যমূল্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি নিয়ে আসে।
সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার গড়া সহজ কাজ নয়। এতে স্বার্থের সংঘাত থাকবে, প্রতিরোধ থাকবে, এবং সাময়িক অস্থিরতাও দেখা দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতিকে স্বাস্থ্যবান করবে। প্রতিযোগিতা বাড়লে মান উন্নত হবে, বিনিয়োগ বাড়বে, এবং ভোক্তা সুরক্ষিত থাকবে। নতুন সরকার যদি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এবং ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেয়, তবে এটি হতে পারে তাদের প্রথম দৃশ্যমান ও জনমুখী সাফল্য।
মনে রাখতে হবে, বাজার সংস্কার কোনো একদিনের অভিযান নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা—এই তিনটির সমন্বয় জরুরি। জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিলে তার প্রতিফলন সবচেয়ে আগে দেখা উচিত বাজারে। কারণ বাজারই সাধারণ মানুষের জীবনের আয়না। সেই আয়নায় যদি স্বস্তির প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, তবে নতুন সরকারের সাফল্যের গল্প সেখান থেকেই শুরু হবে।

