ধর্মীয় উৎসব শুধু আধ্যাত্মিক চর্চা বা পারিবারিক মিলনের সময় নয়, এটি বাজার ও অর্থনীতির জন্যও বিশেষ সময়। পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে, আর বড়দিন খ্রিস্টান প্রধান দেশে—এই সময়ে খুচরা বাজারে দেখা যায় অফার, ছাড়, বিশেষ প্যাকেজিং ও প্রচারণার ঢেউ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—যেখানে বিশ্ববাজারে উৎসব মানে মূল্যছাড়, সেখানে বাংলাদেশে কেন প্রায়শই দাম বাড়ার দৃশ্য লক্ষ্য করা যায়?
মধ্যপ্রাচ্যে রমজানের সময় বড় বড় খুচরা চেইন যেমন কেয়ারফোর, লুলু হাইপার মার্কেট—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বিশেষ ছাড় দেয়। চাল, ডাল, তেল, খেজুর, মুরগি বা দুগ্ধজাত পণ্য সবকিছুতেই লক্ষ্য করা যায় কম দামের প্রণোদনা। সরকারও সরবরাহ ও মূল্য তালিকা পর্যবেক্ষণ করে, অতিরিক্ত মুনাফা রোধে সক্রিয় থাকে।
সৌদি আরবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রমজানের আগে বাজার তদারকি জোরদার করে। প্রয়োজনে আমদানি শুল্ক সাময়িক কমানো হয়, অতিরিক্ত মজুতদারির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয় এবং ভোক্তা অভিযোগ ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখা হয়। ফলে ব্যবসায়ীরা জানেন—রমজান মানে শুধু বিক্রি বাড়ানো নয়, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রেও বড়দিনের সময় একই ছবি। ওয়ালমার্ট, টার্গেট, আমাজন—সবকেই ‘হলিডে সেল’ ঘোষণা করতে দেখা যায়। খাদ্যপণ্য থেকে ইলেকট্রনিক্স সবকিছুর ওপর বড় ছাড় দেওয়া হয়। কারণ একটাই—উৎসবে চাহিদা বাড়ে, ব্যবসায়ীরা কম দামে বেশি বিক্রি করতে চান। অর্থনীতির ভাষায়—কম মার্জিনে বেশি ভলিউম।
বাংলাদেশে কেন উল্টো ঘটে?
বাংলাদেশে রমজান শুরু হবার আগেই বাজারে অদৃশ্য উত্তাপ সৃষ্টি হয়। চাঁদ দেখা না যাওয়াতেই চাল, ডাল, তেল, চিনি, খেজুর, ছোলা, গরু-ছাগলের মাংস—সবকিছুর দাম বাড়তে থাকে। ঈদের আগে পোশাক ও জুতার দাম বাড়ে, কোরবানির সময় পশুর বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়।
মূল কারণগুলো হলো:
-
সরবরাহ ও আমদানি চ্যালেঞ্জ – চিনি, তেল, ডাল, গম প্রভৃতি পণ্য আমদানির ওপর নির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য দোলাচল, ডলার সংকট বা এলসি জটিলতা সরাসরি ভোক্তাকে প্রভাবিত করে। তবুও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশীয় বাজারে তা তাড়াতাড়ি প্রতিফলিত হয় না।
-
সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগী প্রভাব – পাইকারি ও আমদানি পর্যায়ে প্রভাবশালী কয়েকটি গোষ্ঠী দামের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখে। প্রতিযোগিতা দুর্বল হলে উৎসবে মূল্যছাড়ের সুযোগও কমে।
-
নিয়ন্ত্রণহীন মৌসুমি নজরদারি – ভোক্তা অধিকার সংস্থা ও প্রশাসনের অভিযান থাকলেও তা প্রায়ই উৎসবকালীন। সারা বছর কঠোর নজরদারি ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ না থাকলে, কেউ কেউ সুযোগ নিতে পারে।
-
ভোক্তা চরম অনাগ্রহ – বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ বেশি দাম দিলেও লিখিত অভিযোগ করে না। ফলে বাজারে জবাবদিহিতা তৈরি হয় না।
অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নৈতিকতার গুরুত্ব:
উৎসবের সময় মূল্যছাড় শুধু অর্থনীতি নয়, সামাজিক চুক্তিরও অংশ। মুসলিম বিশ্বে রমজান সংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির মাস। খ্রিস্টান দেশে বড়দিন দান ও উদারতার প্রতীক। বাংলাদেশে প্রায়শই দেখা যায়—রমজান মানেই কেউ কেউ বাড়তি মুনাফার সুযোগ খোঁজেন। এটি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যাই নয়, নৈতিক সংকটও বটে। বিশ্ববাজারের বড় চেইনগুলো জানে—উৎসবে কম দামে বিক্রি করলে ব্র্যান্ডে আস্থা বাড়ে, দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহক ধরে রাখা যায়।
বাংলাদেশে স্বল্পমেয়াদি লাভের মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদি সুনামকে ছাপিয়ে যায়। সরকারি পদক্ষেপ যেমন—ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি, শুল্ক কমানো—তবে প্রায়শই প্রতিক্রিয়াশীল। মধ্যপ্রাচ্যে রমজানের কয়েক মাস আগে থেকেই সরবরাহ পরিকল্পনা, মজুত ব্যবস্থাপনা ও মূল্য পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। বাংলাদেশেও উৎসবের বাজারকে স্থিতিশীল ও ন্যায্য করতে পূর্বপ্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা জরুরি। উৎসবের সময় মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক বাজার বজায় রাখতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। বিশেষভাবে:
-
দৈনিক দাম পর্যবেক্ষণ: পাইকারি ও খুচরা পণ্যের দাম ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করলে অস্বাভাবিক ওঠানামা দ্রুত শনাক্ত করা যাবে।
-
কার্টেল ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ: সমন্বিত মূল্যবৃদ্ধির প্রমাণ পেলে দ্রুত তদন্ত ও জরিমানা নিশ্চিত করতে হবে।
-
সরবরাহ প্রক্রিয়া দ্রুত করা: পণ্যের এলসি ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করলে কৃত্রিম সংকট কমে।
-
জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও অভিযোগ ব্যবস্থা: ভোক্তাদের জন্য সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থার অভাব হলে বাজারে জবাবদিহিতা গড়ে ওঠে না।
-
ব্যবসায়ীর স্বেচ্ছা উদ্যোগ: রমজান ও ঈদ উপলক্ষে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো যদি স্বেচ্ছায় মূল্যছাড় কর্মসূচি চালায়, তা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।
বিশ্বায়নের যুগে তথ্য গোপন থাকে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ দেখে—দুবাই, রিয়াদ, নিউইয়র্ক বা লন্ডনে উৎসব মানেই সেল। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—ঢাকায় কেন নয়? বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতি। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, অবকাঠামো উন্নত হয়েছে। কিন্তু বাজার শৃঙ্খলা ও ভোক্তা অধিকার আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছালে সাধারণ মানুষই উন্নয়নের সুফল পাবে।
ঈদ, রমজান বা বড়দিন—এই উৎসবগুলো আনন্দ, সংহতি ও উদারতার বার্তা বহন করে। বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ীরা এই সময়টাকে গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ হিসেবে দেখেন। বাংলাদেশেও এটি সম্ভব—যদি আমরা স্বল্পমেয়াদি মুনাফার বদলে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা বেছে নিই।
সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—তিন পক্ষ মিলিয়ে ন্যায্য বাজার সংস্কৃতি গড়ে তুললে উৎসবের আনন্দ পূর্ণতা পাবে। বাজারে মানুষ স্বস্তিতে কেনাকাটা করতে পারলে মুখে ফুটবে এক চিলতে হাসি। সুতরাং পবিত্র রমজান ও ঈদ ঘিরে খুলে যাক ব্যবসায়িক মহলের বন্ধ হৃদয়ের জানালা।

