পাঠকমাত্রই জানেন বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস হলেন প্রাক্–চৈতন্য যুগের দুজন বিখ্যাত বৈষ্ণব-পদকর্তা। জ্ঞানদাসকে চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য বলা হয়। তবে দুজনের মধ্যে কে কোন শিরোনামের পঙ্ক্তি রচনা করেছেন, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তর্ক রয়েছে।
‘সুখের লাগিয়া…’ গীতি কবিতার মূল ভাবার্থ নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। এই কবিতায় সুখের আশায় করা প্রচেষ্টা বা অমৃতসাগরে স্নান করার পর উল্টো বিষ বা দুঃখ পাওয়ার হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে। এটি মূলত ভাগ্য ও চরম বিপর্যয়ের নিষ্ঠুরতাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে সদ্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা চাঁদাবাজির নতুন সংজ্ঞা দিয়ে পাঠক ও সাধারণ মানুষকে চমক দিয়েছেন। দুর্নীতি বিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টিআইবি সরাসরি সংজ্ঞা হারায়নি, তবে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। ২০ ফেব্রুয়ারি, বাদ জুমা প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চাঁদাবাজির মতো অপরাধকে ভিন্ন ব্যাখ্যায় বৈধতার আড়ালে উপস্থাপন করা দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের পরিপন্থী। এতে শুধু পরিবহন খাত নয়, রাষ্ট্রীয় সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রমেও দুর্নীতিকে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রবণতা জোরদার হতে পারে।
টিআইবি আরও উল্লেখ করেছে, নবগঠিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবহন খাতে আলোচিত চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার পদক্ষেপ সরকারি অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
অবৈধ কাজে বৈধতার আড়াল দেওয়ার প্রমাণ:
একদা দেশের সবচেয়ে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ মন্ত্রী, যিনি তার ‘রাবিশ’ ও ‘বোগাস’ কুল–শব্দের জন্য সুপরিচিত, আদর করেই ঘুষকে নাম দিয়েছিলেন ‘স্পিড মানি’। তিনি মজার এবং কথা বলতে পছন্দ করতেন। এমনকি মাঝে মাঝে বেশি বলার বা মশকরা করার প্রবণতাতেই তিনি বলেছিলেন, ঘুষ তেমন খারাপ কিছু নয়।
নভেম্বর ২০১৪ সালে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের ইমারত নির্মাণ ঋণ সমঝোতার অনুষ্ঠানে মন্ত্রীর এই মন্তব্য সামনে আসে। অনুষ্ঠানেই উপস্থিতরা বাকবাকুম হয়ে যান। মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে কিছু কাজ করতে হলে এজেন্টের মাধ্যমে করতে হয় এবং এজেন্টরা এ কাজের বিনিময়ে অর্থ নেয়। সেখানে এটি ‘স্পিড মানি’ নামে পরিচিত, তবে অবৈধ নয়। সেবার পরিবর্তে অর্থ প্রদান করা হয়।
ঘটনার রাতে একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘ঘুষ অবৈধ নয়’ শিরোনামের প্রতিবেদন। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রবীণ মন্ত্রী মেজাজ হারান এবং পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ধরে সব সভায় অতিথি ভাষণে বিষয়টি ‘ক্লিয়ার’ করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “ঘুষ অবৈধ নয়, এ কথা আমি বলিনি। আমার মূল বক্তব্য থেকে সরে গিয়ে মনগড়া ও অবান্তর কথাবার্তা অত্যন্ত অশালীনভাবে মিডিয়ায় উপস্থাপন করা হয়েছে। আমি সব সময় সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম এবং থাকব। আমার মুখ দিয়ে এ ধরনের কথা আসতেই পারে না।”
এ সময় কতিপয় আমলাও তাঁকে উদ্ধারের জন্য গামছা গলায় নেমে পড়েন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তখনকার চেয়ারম্যান মন্তব্য করেন, “সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে ঘুষ নিলে অপরাধের মধ্যে পড়বে না; এটা পেনাল কোড ও সিআরপিসিতে স্পষ্ট।”
এই মন্তব্য নিয়েও রসিক মিডিয়াকর্মীদের মধ্যে ব্যঙ্গ সৃষ্টি হয়। কেউ প্রস্তাব দেন, সুইস ব্যাংক বা বিদেশে হাজার কোটি টাকা পাচারকে ‘পাচার’ না বলে ‘লেনদেন’ বা ‘টাকা রপ্তানি’ বলা হোক। একজন আমলা তাঁর বেনামি ফেসবুকে কৌটিল্যের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেন, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই বুদ্ধিমান ব্যক্তি লিখেছেন, ঠোঁটের ডগায় যদি মধু ধরা হয়, সেটি একবার চেখে দেখবে না এমন মানুষ পৃথিবীতে নেই।”
কৌটিল্য যা বলতে চেয়েছিলেন, তা স্পষ্ট—দেশের প্রশাসন ও রাজার দায়িত্ব হলো সরকারি কর্মচারী, রাজসভাসদ বা সীমান্ত প্রহরীরা ইচ্ছামতো ক্ষমতা প্রয়োগ না করতে পারা। সেই সময় আরও একটি মন্তব্য করেছিলেন সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তিনি বলেন, “বাঁধ নির্মাণ বা মেরামতের কাজে দুর্নীতি হতে পারে, তবে হরিলুট হবে বলে আমি মনে করি না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজে দুর্নীতি হয় না—এমন কথা আমি বলব না। তবে দুর্নীতির কারণে বাঁধ ভেঙে বন্যা হয়েছে, সেটা আমি মানতে রাজি নই।”
নিয়ন্ত্রিত ঘুষের পরামর্শ:
সাবেক কমিউনিস্ট এবং তখনকার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর কর্মকর্তাদের ‘সহনীয় মাত্রায় ঘুষ’ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছিলেন। ওই দিন শিক্ষা ভবন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ল্যাপটপ বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি দুর্নীতির প্রসঙ্গে বক্তব্য দেন। মন্ত্রী বলেন, “আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা ঘুষ খাবেন, তবে সহনশীল হইয়্যা খাবেন। যদি বলি, আপনারা ঘুষ খাইয়েন না, তাহলে সেটা অর্থহীন কথা হবে।”
প্রসঙ্গত, এর আগে দেশের মান্যবর অর্থমন্ত্রী ‘স্পিড মানি’ মেনে চলার কথা বলেছেন। সে প্রেক্ষাপটে শিক্ষামন্ত্রীর এই পরামর্শও আলোচনার জন্ম দেয়। মন্ত্রী আরও জানান, “স্কুলে খাম তৈরি করা থাকে, আপনার কাজ হলো খামটি হাতে নিয়ে যাচাই করা, খাইয়া-দাইয়া রিপোর্ট তৈরি করে ফেরত আসা। অফিসারদের মধ্যে শুধু চোর নয়, মন্ত্রীরাও চোর, আমিও চোর। সকলকে পরিবর্তন করতে হবে।”
এই মন্তব্য মিডিয়া ও সামাজিকমাধ্যমে বিতর্কের সূত্রপাত করে। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, এটি দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রচেষ্টার বিপরীতে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য বিভ্রান্তিকর বার্তা দিতে পারে।
ছায়া সরকারের কায়া কই?
নির্বাচনের আগে, ২৯ জানুয়ারি ঢাকার একটি তারকা হোটেলে আলোচনায় বসেন বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা। হোটেলের ব্যবসায়ী ও শিল্পী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চলাকালে তিনি বলেন, “ঘুষকে ‘স্পিড মানি’ নামে বৈধ করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটিই শিল্প খাতকে প্রথম ধাক্কা দেয়। আমরা এটা হতে দেব না। এই কালচার চিরতরে বদলাতে হবে।”
তিনি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়ে যোগ করেন, প্রিয় জনগণ, চাঁদার কালো থাবা থেকে বাঁচতে হলে লড়তে হবে। এ লড়াইয়ে আপনাদের সঙ্গে আমরা আছি, ইনশা আল্লাহ।”
চাঁদাবাজির নতুন সংজ্ঞা নিয়ে ফেসবুকে প্রশ্ন রেখেছেন জামায়াতের আমির। তিনি লিখেছেন, “তাহলে কি নবগঠিত সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর মাধ্যমে চাঁদাকে জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়া হলো? কীভাবে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা হবে? সূচনাতেই বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে?”
ঘুষ, ঘুষি, দুর্নীতি, লেনদেন, বিনিময়, হাদিয়া, নজরানা, স্পিড মানি, গিফটের ধামাকা, টুকটাক লুটপাট—এ সব কিছু নতুন সংজ্ঞার আড়ালে আরও বিস্তৃত হতে পারে। অফিস ও আদালতে ঘুষের আলগা কামাই, সরল বিশ্বাসে ঘুষ, অর্ঘ, উপরি, ইনাম ও উপহার ইত্যাদি সোহাগি নামে ভেসে যেতে পারে।
নবাগতদের প্রতিটি পদক্ষেপে যদি পুরনো সরকারের ছায়া থেকে যায়, তা জনগণ হতাশ ও মন খারাপ করবে। এমন পরিস্থিতিতে হয়তো আবার মানুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে—প্রতিবাদ বা পথ অবরোধের মতো প্রেক্ষাপটে।

