নতুন নেতৃত্বে বিএনপির সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের একটি হলো দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। এই খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান সংকট দেশের অর্থনীতি ও শিল্পখাতকে প্রভাবিত করছে।
সরকারি ভর্তুকির বোঝা কমানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা—এই সবই এখন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই খাতের ভবিষ্যৎ এবং ভর্তুকি নির্ভরতা কমানোর উপায় নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন।
ড. হোসেন জানান, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের পুনর্গঠন দ্রুত না করলে দেশের শিল্প, কৃষি ও জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, “উৎপাদন খরচ কমানো, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার এবং স্বচ্ছ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে খাতটি ভর্তুকি নির্ভরতা থেকে বের করা সম্ভব।”
বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সরকারের প্রথম দিনে করণীয় হলো বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করা এবং প্রাথমিক সংস্কার শুরু করা। পাশাপাশি, নীতি প্রণয়নের সময় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগ, নীতিমালা সংস্কার এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সমন্বয়ই হবে দেশের জন্য স্থিতিশীল ও সাশ্রয়ী খাত গঠনের মূল চাবিকাঠি।
প্রশ্ন: বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা কোথায় দেখছেন?
ড. ইজাজ হোসেন: বিদ্যুৎ খাতে এই যে বিপুল পরিমাণে ভর্তুকি, এটা আনসাসটেইনেবল। আগের সরকার এটায় বাড়তে দিয়েছে। গত সরকারও কমানোর চেষ্টা করেনি। প্রথমত, আমাদের দেখতে হবে এই যে এত বড় সাবসিডি, এটা কীভাবে কমানো যায়। কিন্তু কমাতে গেলেই কিছু ফ্যাক্টরাল সমস্যা বের হয়ে আসবে। তখন সেগুলো অ্যাড্রেস করতে হবে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। আমরা যদি ইন্ডাস্ট্রি সেক্টরকে প্রাধান্য দিয়ে কয়লা-গ্যাস যতটা সম্ভব ইমপোর্ট করতে পারি, তাহলেও আমাদের প্রতি কিলোওয়াটে ৪-৫ টাকা করে সাশ্রয় হয়।
আমাদের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ১০ বছর হয়ে গেছে, এগুলো সরাবার ব্যাপারে আমরা কথা বলছি। আওয়ামী লীগ সরকার এগুলো তৈরি করেছিল। শেষ দিকে তারাও বলেছিল এগুলো শেষ করে দেবে। করবো করবো করে আর করেনি। তারপরে সরকার এলো, তারা দেখলো কিন্তু কিছু করলো না। এখন এবারও বলছে রমজানে লোডশেডিং না রাখতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাবে।
আমাদের প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট তেলভিত্তিক কেন্দ্র। এত টাকা খরচ করে এগুলো যদি চালিয়ে রাখতে চাই তাহলে তো লোডশেডিংমুক্ত রাখতেই পারি। সারাবছর যদি খরচ করতে হয়, এত বাড়বে আমরা শেষ হয়ে যাবো। রমজানের জন্য ঠিক আছে, এর পরে এগুলো চালু রাখা ঠিক হবে না। তবে সরকার কীভাবে এই কেন্দ্রগুলো সরাবে তার একটা কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।
তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সরানোর আরেকটা উপায় হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো। আগের সরকারগুলো বলেছে বাড়াবে কিন্তু বাড়াতে পারেনি। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। আমরা যদি ইন্ডাস্ট্রি সেক্টরকে প্রাধান্য দিয়ে কয়লা-গ্যাস যতটা সম্ভব ইমপোর্ট করতে পারি, তাহলেও আমাদের প্রতি কিলোওয়াটে ৪-৫ টাকা করে সাশ্রয় হয়।
আরেকটা বিষয় আমি মনে করি, যারা আমাদের এই সেক্টরে এত লুটপাট করলো, তাদের তো পানিশমেন্ট দেওয়া হলো না। সবগুলো প্রাইভেট পাওয়ার প্ল্যান্টের সঙ্গে বসে বলতে হবে ‘তোমরা এক ভাগ নাও’। এই যে ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েই তো তোমরা মুনাফা করেছ। এজন্য তাদের থেকেও কিছু আদায় করতে হবে। আর পাওয়ার সেক্টরে গভর্ন্যান্স (সুশাসন) এবং এফিসিয়েন্সি এনে আরও কিছু কমানোর চেষ্টা করতে হবে।
প্রশ্ন: ক্যাপাসিটি চার্জ ইস্যু নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে—এটি পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন কি?
ড. ইজাজ হোসেন: এটা পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। তাদের সঙ্গে বসতে হবে। একটা নেগোশিয়েট করে যা-ই কমানো যায়, সেটি কমাতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করা সম্ভব না সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু পানিশমেন্ট তো দেওয়া যায়। আমেরিকার মতো দেশেও কোম্পানিগুলো অন্যায় করলে তাদের ফাইন করা হয়। ‘আমরা একটা অপেক্ষায় ছিলাম নতুন সরকার এলে অফশোর (সমুদ্র) এক্সপ্লোরেশন শুরু হবে। এটা করে ফেলতে হবে। আর অনশোর (ভূমি) এক্সপ্লোরেশনটাও বাড়াতে হবে।’
প্রশ্ন: জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও অপচয় কমাতে কী ধরনের জবাবদিহি কাঠামো দরকার?
ড. ইজাজ হোসেন: এর আগে যে দুর্নীতি হয়েছে সেগুলো স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টের মাধ্যমে হয়েছে। সেই অ্যাক্ট এখন যেহেতু নেই কেউ আর আগের মতো দুর্নীতি করতে পারবে না। এখন যেটা দরকার হবে ঠিকভাবে চালানো। এখন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বলছি যে এখনো গ্যাসের বিতরণ বাড়ানো উচিত নয়। এমন যেন না হয় জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমে আবার কোনো এমপি নিজ জেলায় গ্যাসলাইন নিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সূত্র: জাগো নিউজ

