বাংলাদেশে সংবিধান কখনও শপথের সময় বুকের কাছে ধরা পবিত্র গ্রন্থ, আবার রাজনৈতিক উত্তাপে আলমারিতে তোলা নথি।
রাষ্ট্রপতি যদি বলেন তাকে সরাতে সংগঠিত মব-ভিত্তিক কৌশল নেওয়া হয়েছিল, আমরা সেটিকে কি ‘গণতন্ত্রের প্রাণচাঞ্চল্য’ বলব, নাকি ‘সংবিধানের ওপর জনতার অগ্রাধিকার’ বলব? বৈধতা কি এখন আদালত নির্ধারণ করে, নাকি মাইক্রোফোন, মিছিল আর ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ? নাকি এখনও আমরা বিশ্বাস করি, প্রজাতন্ত্রের শক্তি প্রক্রিয়ায়, প্রমাণে ও প্রতিষ্ঠানে?
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অভিযোগের রাজনৈতিক অভিঘাত যতটা, সাংবিধানিক অভিঘাত তার চেয়ে কম নয়। কারণ অভিযোগকারী ব্যক্তি কোনো দলীয় পদে নন; তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ তাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়; আর ৭(১) অনুচ্ছেদ স্পষ্ট করে যে, জনগণের ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল সংবিধানের অধীনেই বৈধ।
অর্থাৎ ‘জনতার নামে’ সংগঠিত কোনো চাপ যদি সংবিধানের কাঠামোর বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে চায়, তা প্রমাণিত হলে সেটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; সাংবিধানিক সীমালঙ্ঘন। একইসঙ্গে ৩১ ও ৩৫ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করে; অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচার হবে আদালতে, প্রমাণের ভিত্তিতে; জনমতের উত্তাপে নয়।
এখানেই তত্ত্ব আমাদের সহায়। আন্তোনিও গ্রামসি দেখিয়েছিলেন, রাষ্ট্র কেবল বলপ্রয়োগে টিকে থাকে না; সম্মতি উৎপাদনে টিকে থাকে। হেজিমনি মানে শাসন কাঠামোকে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। যদি ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতীকগুলোর বৈধতা ক্ষয় করার চেষ্টা হয়, আস্থা নড়বড়ে করা হয়, তবে সেটি সরাসরি ক্ষমতা দখল নয়; এটি মূলত ‘অবস্থানগত সংগ্রাম’ (war of position)।
এখানে লক্ষ্য প্রতীকী কেন্দ্রগুলো: রাষ্ট্রপতি, আদালত, নির্বাচন কমিশন। প্রতীক দুর্বল হলে কাঠামো দুর্বল হয়। মব তখন কেবল জনসমাবেশ নয়; হেজিমনিক সংগ্রামের হাতিয়ার এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপের আধুনিক রূপ।
অন্যদিকে মিশেল ফুকো আমাদের শেখান, ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বয়ান, জ্ঞান ও ভাষায় ছড়িয়ে থাকে। ক্ষমতা ‘সত্যের বয়ান’ তৈরি করে; অন্য কথায় এটিকে বলে, সত্য-নিয়ন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাস (regime of truth)।
যদি একটানা বলা হয়, প্রতিষ্ঠান অকার্যকর, প্রতীক নৈতিকভাবে অযোগ্য, কাঠামো ভেঙে পড়েছে, তবে সেই বয়ানই জনমত নির্মাণের শক্তি হয়ে ওঠে। মব তখন ডিসকোর্সের দৃশ্যমান রূপ; ভাষা যখন রাস্তায় নামে, তা রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়। রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, সঠিক বা ভুল, যাই হোক, এটি ইঙ্গিত করছে একটি সম্ভাব্য ডিসকোর্সিভ কৌশলের দিকে, যেখানে প্রথমে ভাষায় বৈধতা ক্ষয় হয়, পরে সংগঠিত চাপে কাঠামো প্রভাবিত হয়।
গেম থিওরির ফ্রেমে ঘটনাপ্রবাহ আরও পরিষ্কার। গেম থিওরি (Game Theory) হলো এমন একটি গণিতভিত্তিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণ পদ্ধতি, যেখানে একাধিক ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের পারস্পরিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। ‘প্রিজনার্স ডিলেমা’ দেখায়, দু’পক্ষ জানে দীর্ঘমেয়াদে সহযোগিতা সবার জন্য ভালো; কিন্তু একজন যদি স্বল্পমেয়াদি লাভে নিয়ম ভাঙে, অন্যজনও সন্দেহ করে প্রতিরক্ষামূলক কৌশল নেয়; ফল হয় উভয়ের ক্ষতি।
গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে চিলিতে পারস্পরিক অবিশ্বাস রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য ভেঙে দেয়; তুরস্কে প্রাতিষ্ঠানিক সন্দেহ এমন পর্যায়ে যায় যেখানে নিয়মের চেয়ে কৌশল বড় হয়ে ওঠে। প্রথমে ‘অল্প নিয়ম ভাঙা’, পরে সেটিই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অভিযোগকে এই কাঠামোয় বসালে দেখা যায়, যদি কোনো পক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের বাইরে চাপ প্রয়োগ করে থাকে, অন্য পক্ষও প্রতিরক্ষামূলক হবে। এতে অবিশ্বাস বাড়ে। এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান কথার হিসেব মিলিয়ে দেওয়ার দাবি করেছেন।
সোম ও মঙ্গলবার কালের কণ্ঠে দুই কিস্তিতে প্রকাশিত রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে জামায়াত আমির তার ফেইসবুক পোস্টে বলেন, “কোটি-কোটি মানুষ যা শুনল এবং সেদিন তিনি যা বললেন আর এখন যা বলছেন তার হিসেব রাষ্ট্রপতি মিলিয়ে দেবেন কি?”
অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগকে যদি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নাটক বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়, তবুও আস্থা কমে। এটিই ‘সমন্বিত সিদ্ধান্তের কাঠামোগত ব্যর্থতা’ বা Coordination Failure যখন সবাই ধরে নেয় অন্য পক্ষ নিয়ম মানবে না, ফলে নিয়ম মানার প্রণোদনাই কমে যায়। সংবিধান কাগজে থাকে; নৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষয় হয়।
ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে। পাকিস্তানে দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস বহুবার অসাংবিধানিক শক্তিকে সুযোগ দিয়েছে। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকটে সমন্বয়হীনতা রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র করেছে। প্রতিষ্ঠান ঘিরে আস্থা ভাঙলে ক্ষমতার শূন্যস্থান তৈরি হয়—সবসময় সাংবিধানিক পথে নয়। ইউনূস সরকারের দেড় বছর ধরে আমরা দেখেছি রাজনৈতিক ভাষ্য, মিডিয়া-বয়ান ও রাস্তায় শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার প্রবণতা বেড়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর আগেই জনমতের আদালতে রায় ঘোষণার চেষ্টা হয়েছে। এগুলো আনুষ্ঠানিক লঙ্ঘন নাও হতে পারে, কিন্তু প্রক্রিয়াগত আস্থার ক্ষয় ঘটায়।
এবার আসি সংকেত-ভিত্তিক কৌশলগত খেলা বা Signaling Game। এখানে এক পক্ষ সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে বার্তা দেয়। রাষ্ট্রপতির বক্তব্য সেই ধরনের সংকেত হতে পারে—দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলকে জানানো যে প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিতিশীলতার অভিযোগ নজরে এসেছে এবং যাচাই প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রকাশ্য বিবৃতি প্রায়ই সরাসরি হস্তক্ষেপ নয়; বরং কৌশলগত বার্তা।
নিওলিবারেল প্রেক্ষাপটে এই সংকেত আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত আঞ্চলিক সংযোগ ও স্থিতিশীলতায় স্বার্থবান; চীন অবকাঠামো বিনিয়োগের নিরাপত্তা হিসাব করে; পাকিস্তান সুযোগ খোঁজে; যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত ভারসাম্য মাপে। এটি ‘স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারডিপেনডেন্স’ বা পারস্পরিক নির্ভরতা। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কেবল রাজনৈতিক নয়; অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করে। ফলে অভ্যন্তরীণ আস্থা ভাঙলে বাহ্যিক হিসাব-নিকাশ আরও তীক্ষ্ণ হয়।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে আমরা দেখেছি, আন্দোলন-প্রদর্শন, মিডিয়া-নির্ভর বয়ান এবং আন্তর্জাতিক বিবৃতির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে চাপ তৈরি হয়েছে। নিওলিবারেল অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ জড়িয়ে থাকে সেখানে রাজনৈতিক সংকেতগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই বহুপাক্ষিক হিসাব-নিকাশের ভেতরে যদি অভ্যন্তরীণ আস্থা ভেঙে পড়ে, তাহলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দুর্বল হয়। এটিও অনেকের মতামত যে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নিজেও এসব পক্ষের মধ্যে বিশেষ দুয়েকটির সংকেত মোতাবেক মুখ খুলেছেন যখন সময় তার অনুকূলে।
আইনের কথায় ফিরি। দণ্ডবিধির ষড়যন্ত্র-সংক্রান্ত ধারা বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত বিধান—এসবের প্রয়োগ আদালতের বিষয়। অভিযোগ উঠলেই ধারা বসে না; প্রমাণ প্রয়োজন। তদন্ত মানে দোষী ঘোষণা নয়; অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক যাচাইয়ে আনা। তদন্ত না করা যেমন দায়িত্বহীনতা, তেমনি আদালতের বাইরে রায় ঘোষণা করাও আইনের শাসনের ব্যত্যয়। প্রয়োজন স্বাধীন অনুসন্ধান, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা।
সবচেয়ে বড় বিপদ, নিয়ম ভাঙা যখন ব্যতিক্রম থাকে না, তখন তা অভ্যেসে পরিণত হয়। প্রথমে বলা হয় ‘এটি বিশেষ পরিস্থিতি’; পরে সেটিই মানদণ্ড। সংবিধান বাতিল হয় না, কিন্তু কার্যকর নৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষয় হয়। ইতিহাস বলে, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে ব্যক্তি শক্তিশালী হয়; প্রক্রিয়া দুর্বল হলে কৌশল প্রাধান্য পায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন ব্যক্তি নয়, প্রক্রিয়া। আমরা কি মবকে ‘নৈতিক চাপ’ বলে রোমান্টিক করে তুলব, নাকি সংবিধানকে ন্যূনতম সম্মিলিত ভিত্তি হিসেবে মানব? যদি মাইক্রোফোনই আদালত হয়, বিচারপতির প্রয়োজন কী? যদি মিছিলই রায় দেয়, সংবিধান কেন? গণতন্ত্রে জয়ী হয় না ব্যক্তি; জয়ী হয় প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রপতির অভিযোগ সত্য হলে আইন তার পথ নিক; অসত্য হলে সেটিও স্বচ্ছভাবে প্রমাণিত হোক। কারণ রাষ্ট্র টিকে থাকে নিয়মে, নিয়মের অভিনয়ে নয়।
সংবিধানকে আলমারিতে তুলে রেখে কেউ দীর্ঘদিন রাজনীতি করতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রকে আলমারিতে রাখা যায় না। মব সাময়িক উত্তাপ দেয়; প্রতিষ্ঠান স্থায়ী শীতলতা আনে। আমরা কোনটা চাই, উত্তাপ, না স্থায়িত্ব? ইতিহাস সাধারণত উত্তাপকে শিরোনাম দেয় আর স্থায়িত্বকে ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের সামনে পছন্দটি খুব স্পষ্ট, মবের শর্টকাট, না সংবিধানের দীর্ঘপথ। যদি সংবিধানের স্থায়িত্ব চাই আমরা, তবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক উত্থাপিত অভিযোগটি সংবিধান মোতাবেকই দেখা দরকার; বোঝা দরকার যে, এটি প্রজাতন্ত্রের প্রথম ব্যাক্তি কর্তৃক উত্থাপিত; কাজেই এর মাত্রা এবং ওজন সংবিধান মোতাবেক নির্ধারিত হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়; সে হিসেবে এটি অন্তর্বর্তী সরকার এবং তার অন্যসব মিত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে যদি রাষ্ট্র সঠিক তদন্ত করে।
- শ্যামল দাস—অধ্যাপক, এলিজাবেথ সিটি স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ক্যারোলাইনা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সূত্র: বিডিনিউজ২৪

