বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের বিকাশ গত ৫৪ বছরে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। পরিকল্পিত নীতি, উদ্যোক্তাদের সাহসী উদ্যোগ এবং শ্রমিকদের পরিশ্রম মিলেই এই খাত আজ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের নীতিগত সহায়তা ও আর্থিক প্রণোদনাও ছিল এই অগ্রযাত্রার বড় চালিকা শক্তি।
বিশেষ করে অতীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকারের সময় ব্যক্তি খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট মহলে মূল্যায়ন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-র অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য হ্রাস—এই তিন লক্ষ্যকে সামনে রেখে তাঁরা নীতিগত অবস্থান নিয়েছিলেন।
গত দুই দশকে ব্যক্তি খাতের পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। স্থানীয় বাজারে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান যেমন বেড়েছে, তেমনি ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যক্তি খাত এখন দৃঢ় অবস্থানে। কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আহরণে দেশি-বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অবদানই সবচেয়ে বেশি।
তবে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ব্যক্তি খাতকে আরও এগিয়ে নিতে হলে প্রথমেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসাসংশ্লিষ্ট আইন সংস্কার অপরিহার্য। শ্রম আইন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় আইন, বিদেশে বিনিয়োগ এবং আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য সংক্রান্ত বিধানসমূহ সময়োপযোগী করে সাজাতে হবে।
বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকটি পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া প্রয়োজন। ব্যাংকঋণের সুদের হার কমিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো দরকার। ডলারের বিনিময় হার কিছুটা কমিয়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। কার্যকর কর প্রশাসন ও দক্ষ সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাও ব্যবসা পরিবেশের উন্নতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না—এমন মত রয়েছে ব্যবসায়ী মহলে। বরং বাজার ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পদ্ধতি প্রবর্তন প্রয়োজন। বড় বাজার অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। উপযুক্ত প্রণোদনা দিয়ে দায়িত্বশীল সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বাজারে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব।
এ ছাড়া ঘুষ ও দুর্নীতি কমানো ব্যক্তি খাতের টেকসই বিকাশের অন্যতম শর্ত। উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা নিয়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে। উদীয়মান প্রযুক্তির এই সময়ে তরুণ উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপদের জন্য সহায়ক ইকো-সিস্টেম গড়ে তোলাও এখন সময়ের দাবি।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও চেয়ারম্যান, ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেড।

