বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির শক্তিশালী মেরুদণ্ড এখন নির্মাণ খাত। এই খাত শুধু নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে না, বরং দেশের অবকাঠামোগত আধুনিকায়ন ও উন্নতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ত্বরান্বিত করছে। শহর, মফস্বল, এমনকি গ্রামীণ এলাকায়ও বিভিন্ন মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। ভবিষ্যতেও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়ালসড়ক, মহাসড়ক—এগুলোর মতো বড় মেগাপ্রকল্প নির্মাণ চলমান। পাশাপাশি আকাশচুম্বী ভবন ও নান্দনিক বাণিজ্যিক চত্বর নির্মাণের মাধ্যমে বাণিজ্যিক অবকাঠামোও আধুনিক হচ্ছে।
নির্মাণ খাতের ব্যস্ততার কারণে বাংলাদেশ আজ বিশাল কর্মযজ্ঞের দেশ। অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে বাণিজ্য প্রসার পেয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি বিপ্লব আমাদের বিভিন্ন সুযোগ দিচ্ছে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আমরা এ সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছি না।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিই। প্রাক-নির্মাণ (প্রিকনস্ট্রাকশন) প্রকল্পে কাজের শুরুতে মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। কিন্তু দ্রুত বোঝা গেল, সেখানে এআই ও অটোমেশন কাজের সাধারণ মানদণ্ড। প্রকৌশলী আর রাতভর দরজা, জানালা বা দেয়ালের মাপজোখ করতে হয় না। এআই নিয়ন্ত্রিত টুল স্বয়ংক্রিয়ভাবে ড্রয়িং স্ক্যান করে ভুল শনাক্ত করে এবং নথি তৈরি করে। ফলে প্রকৌশলী যান্ত্রিক কাজের পরিবর্তে গাণিতিক বিশ্লেষণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। এটি কোনো দূরের ভবিষ্যতের গল্প নয়; এখনকার বাস্তবতা।
বাংলাদেশে এআই ব্যবহারে এখনও পিছিয়ে। আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োজন, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরনো সরঞ্জাম দিয়েই কাজ চলে। বিশ্বের দেশগুলো এআই সুবিধা নেওয়ার জন্য অটোমেশন, কানেক্টেড ডেটা ও আধুনিক অবকাঠামো ব্যবহার করছে। আমাদের দেশে এখনও সনাতন পদ্ধতি—হাতে-কলমে মাপজোখ, রসদ হিসাব, ব্যয় অনুমান—চলমান। অনুমানভিত্তিক এই পদ্ধতির কারণে প্রকল্পে অসংগতি, অপচয় ও ত্রুটি দেখা দেয়, যা পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রতি বছর শুধু অর্থই নয়, বহু মূল্যবান কর্মঘণ্টাও নষ্ট হয়।
কেন এআই অপরিহার্য? নির্মাণের আগে অনুমান ও হিসাবের প্রামাণিকতা যাচাই করতে অনেক সময় অপচয় হয়। অনুমানভিত্তিক পরিকল্পনায় কাঁচামাল, যন্ত্রের সময় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তব নির্মাণে অনুমানভিত্তিক পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। এআই ব্যবহার করে সহজেই কাঁচামালের সংকট, যন্ত্রের কর্মক্ষমতা, নির্মাণের নিখুঁত সময় ইত্যাদি নির্ধারণ করা সম্ভব।
আজকাল নির্মাণ খাতের জন্য বিশেষায়িত এআই টুল রয়েছে, যা ডিজিটাল টুইন বা ভার্চুয়াল নকশা তৈরি করে। কম্পিউটার বা আইওটি ডিভাইসে সিমুলেশন করার মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা জানা যায়। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল ও খরচ কমানো যায়। এআই নিয়ন্ত্রিত রোবট ও ড্রোন ব্যবহার করেও বড় অবকাঠামোর মাপজোখ দ্রুত করা যায়। ড্রোন বিস্তৃত এলাকায় নিয়ন্ত্রিতভাবে উড়তে পারে, ফলে প্রকল্পের সময়সীমা ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এছাড়া বাজেট বা বিওকিউর অসংগতিও আগে শনাক্ত করা যায়।
এআই কর্মসংস্থান হ্রাস করে না, বরং কাজের ধরন পরিবর্তন করে। কিছু নির্দিষ্ট কাজের কর্মী কম লাগতে পারে, তবে নতুন প্রযুক্তি যেমন ড্রোন ও ডিজিটাল টুইন ব্যবহারে সার্ভে টেকনিশিয়ান, বিআইএম কো-অর্ডিনেটর, এআই অ্যানালিস্টদের প্রয়োজন হবে। এ ক্ষেত্রে দেশের তরুণ প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দিতে হবে।
শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই এআই দক্ষতা তৈরি করতে হবে। প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের কেবল অটোক্যাড শেখানোই যথেষ্ট নয়। তাদের ডিজিটাল টুইন ও কনস্ট্রাকশন অ্যানালিটিকসে দক্ষ হতে হবে। সরকারি সংস্থা যেমন পিডব্লিউডি ও এলজিইডি, এআই ব্যবহার করে প্রকিউরমেন্টে স্বচ্ছতা আনতে পারে। স্থানীয় প্রযুক্তি স্টার্টআপ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও উৎসাহিত করতে হবে।
অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এআই মেধা প্রতিস্থাপন করে না, বরং বহুগুণ বৃদ্ধি করে। দেশি প্রকৌশলী শুধু অবকাঠামো তৈরি করবেন না, বরং সেটিকে বুদ্ধিবৃত্তিক বিন্যাসে সাজাবেন, যা জীবনকে সহজ, আরামদায়ক ও নিরাপদ করবে। দেশের মেধা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে। প্রয়োজন সঠিক রূপকল্প ও তার বাস্তবায়নের সদিচ্ছা। বিশ্ব দ্রুত এগোচ্ছে, আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে না। এটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা।
মো. শাহাদাত হোসেন: যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে কর্মরত নির্মাণ প্রকৌশলী

