আজ আমরা আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের বিশেষ সুবিধা নিয়ে আলোচনা করব। সম্প্রতি কথা বলেছেন আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাফাত উল্লা খান। তিনি বলেন, এই কার্ডগুলো গ্রাহকদের দৈনন্দিন লেনদেন, ভ্রমণ ও কেনাকাটাকে আরও সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ করে তোলে।
প্রশ্ন: অন্য ব্যাংকের কার্ডের তুলনায় আপনাদের ব্যাংকের কার্ডের গ্রাহকরা কী ধরনের এক্সক্লুসিভ রিওয়ার্ড বা ক্যাশব্যাক সুবিধা পাচ্ছেন?
মো. রাফাত উল্লা খান: আল-আরাফাহ্ইসলামী ব্যাংকের কার্ডের গ্রাহকরা অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় কিছু এক্সক্লুসিভ সুবিধা উপভোগ করছেন, যা তাদের দৈনন্দিন লেনদেন, ভ্রমণ ও কেনাকাটাকে আরও সহজ, সাশ্রয়ী ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
গ্রাহকরা লাউঞ্জকি সুবিধার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর লাউঞ্জে প্রবেশের সুযোগ পান। পাশাপাশি নির্বাচিত দোকান ও অনলাইন মার্চেন্টে বিশেষ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট, নির্দিষ্ট লেনদেনে ক্যাশব্যাক সুবিধা, বড় অঙ্কের কেনাকাটায় সহজ ইএমআই সুবিধা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট সুবিধা উপভোগ করতে পারেন। এর পাশাপাশি উৎসব বা বিশেষ সময়ে বিশেষ ছাড় ও প্রমোশনাল অফার, দ্রুত কাস্টমার সাপোর্টসহ প্রাইম সার্ভিস এবং হোটেল বুকিং, এয়ারলাইন্স টিকিট ও ভ্রমণ সংক্রান্ত বিশেষ অফার গ্রাহকদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে প্রদান করা হয়।
অন্যান্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে ট্রানজাকশন ফি ছাড়াই ফ্রি ক্যাশ উইথড্র সুবিধা। এ ছাড়া পুরো আউটস্ট্যান্ডিং পরিশোধ করা হলে কোনো অতিরিক্ত চার্জ প্রযোজ্য হয় না; তুলনামূলকভাবে অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় সার্ভিস চার্জ ১২-১৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা গ্রাহকদের জন্য আরও প্রতিযোগিতামূলক ও সাশ্রয়ী।
প্রশ্ন: ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি মওকুফ করার জন্য গ্রাহককে কী শর্ত পূরণ করতে হয়?
মো. রাফাত উল্লা খান: আমরা সব সময় চাই গ্রাহক যেন কার্ড ব্যবহার করেন, শুধু সংগ্রহ করে রেখে না দেন। তাই বার্ষিক ফি মওকুফের শর্ত খুবই সহজ রেখেছি। কার্ড ইস্যুর তারিখ থেকে এক বছরের মধ্যে অন্তত ১৮টি লেনদেন করলেই বার্ষিক ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মওকুফ হয়ে যায়। এখানে লেনদেনের অঙ্ক বড় হওয়া জরুরি নয়—যে কোনো পরিমাণের লেনদেনই গণ্য হবে।
আমাদের লক্ষ্য গ্রাহকদের কার্ড ব্যবহারকে উৎসাহিত করা, চাপ তৈরি করা নয়। পরিবারের একজন সদস্য যেন সহজেই সাপ্লিমেন্টারি কার্ডের সুবিধা নিতে পারেন, এজন্য প্রথম সাপ্লিমেন্টারি কার্ডের বার্ষিক ফি সম্পূর্ণ ফ্রি রাখা হয়েছে।
প্রশ্ন: ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটায় ইএমআই বা কিস্তি সুবিধাগুলোর মেয়াদ কতদিন পর্যন্ত পাওয়া যায়?
মো. রাফাত উল্লা খান: আজকাল অনেকেই বড় কেনাকাটা কিস্তিতে করতে চান—এটি বাস্তবতা। তাই আমরা ৩ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৩৬ মাস পর্যন্ত ইএমআই সুবিধা দিচ্ছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি শরিয়াহসম্মত কাঠামোর মধ্যে এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে অতিরিক্ত সুদ বা সারচার্জ ছাড়াই প্রদান করা হয়। আমরা গ্রাহকদের আর্থিকভাবে স্বস্তিতে রাখতে চাই, যাতে তারা অপ্রত্যাশিত চাপের মধ্যে না পড়েন।
প্রশ্ন: আপনাদের ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার কত এবং গ্রেস পিরিয়ড কতদিন?
মো. রাফাত উল্লা খান: আমাদের ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক। তাই প্রচলিত অর্থে কোনো সুদ আরোপ করা হয় না। গ্রাহক যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করেন, তাহলে অতিরিক্ত কোনো অর্থ দিতে হয় না। সাধারণত সর্বোচ্চ ৪৫ দিন পর্যন্ত ফি ও চার্জ ছাড়া রিপেমেন্ট সুবিধা থাকে এবং বিলের নির্ধারিত তারিখের পর অতিরিক্ত ২ দিন গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে মেইনটেন্যান্স ও কালেকশন ফি প্রযোজ্য হয়, যা আউটস্ট্যান্ডিং অ্যামাউন্টের ওপর নয়—কার্ড লিমিটের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে।
প্রশ্ন: ডলারে কেনাকাটা বা ডুয়াল কারেন্সি কার্ডের ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী কী কী সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা আছে?
মো. রাফাত উল্লা খান: আমাদের কার্ডগুলো ডায়নামিক কারেন্সি সুবিধাসম্পন্ন। অর্থাৎ বিশ্বের যে কোনো দেশে বৈধ লেনদেন করা যায় এবং দেশভেদে স্থানীয় মুদ্রায় পেমেন্ট করা সম্ভব। প্লাটিনাম কার্ডধারীরা বছরে ৬টি ফ্রি লাউঞ্জ ব্যবহার করতে পারেন। সাপ্লিমেন্টারি কার্ডের ক্ষেত্রেও একই সুবিধা রয়েছে। তবে, আন্তর্জাতিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসারে প্রতি পাসপোর্টে বছরে ইউএস ডলার ১২ হাজার পর্যন্ত ব্যয় সীমা রয়েছে। আরএফসিডি/ইআরকিউ-ভিত্তিক কার্ডে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: নতুন কার্ডের জন্য ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের অ্যাক্টিভেশন প্রক্রিয়া কীভাবে আরও সহজ ও নিরাপদ করা যায়?
মো. রাফাত উল্লা খান: আমরা ব্যাংকের কার্ড অ্যাক্টিভেশনে নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করি। গ্রাহক ভেরিফিকেশন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাক্টিভেশনও সম্পন্ন হয়। মোবাইল অ্যাপ এবং ওটিপির মাধ্যমে ডিজিটাল অ্যাক্টিভেশন, আইভিআর-ভিত্তিক মাল্টি-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন এবং শাখার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অ্যাক্টিভেশন চালু রয়েছে।
অ্যাক্টিভেশনের জন্য প্রথম লেনদেনের আগে কার্ডের পিন সেট বাধ্যতামূলক এবং অ্যাক্টিভেশন হলে তাৎক্ষণিক এসএমএস বা অ্যাপ নোটিফিকেশনের মাধ্যমে গ্রাহককে জানিয়ে দেওয়া হয়। প্রযুক্তির কলেবর যত বাড়ছে, প্রতারণার কৌশলও তত বাড়ছে। তাই সচেতনতার অংশ হিসেবে আমরা গ্রাহকদের ইমেইল, এসএমএস ও ডিজিটাল মিডিয়ায় প্রচারণার মাধ্যমে ফিশিং ও ভুয়া কল সম্পর্কে নিয়মিতভাবে সচেতন করে থাকি।
প্রশ্ন: কার্ড হ্যাক বা জালিয়াতির শিকার হলে ব্যাংকের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ বা দ্রুত সমাধানের জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে?
মো. রাফাত উল্লা খান: আমাদের কার্ড চিপ-এনক্রিপ্টেড, তাই জালিয়াতির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। তবুও যদি কোনো ঘটনা ঘটে, আমরা তাৎক্ষণিক কার্ড ব্লক করি এবং নতুন কার্ড ইস্যু করি। এ রকম কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে লেনদেন তদন্ত এবং যাচাই সাপেক্ষে অননুমোদিত লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়। আমাদের কলসেন্টার ও শাখা একযোগে এমনভাবে কাজ করে, যেন গ্রাহকদের নিরাপদ নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান করা সম্ভব হয়।
প্রশ্ন: এটিএম বা পিওএস মেশিনে কার্ড আটকে গেলে বা টাকা না বের হলে কত সময়ের মধ্যে গ্রাহক তার অর্থ ফেরত পাবেন?
মো. রাফাত উল্লা খান: নিজস্ব এটিএমে কার্ড আটকে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অন্য ব্যাংকের এটিএম হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন কার্ড ইস্যুর মাধ্যমে সমাধান নিশ্চিত করা হয়। লেনদেন ডিসপিউট হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী টাকা ফেরত দেওয়া হয়। এখানে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের নিয়মও অনুসরণ করা হয়। এসব সেবার সময়সীমা নির্ভর করে লেনদেনের ধরন ও প্রয়োজনীয়।
- আমাদের ডাইনামিক কারেন্সি কার্ডে
- যে কোনো দেশে লেনদেন করা যায়
- ডকুমেন্টেশনের ওপর।
প্রশ্ন: ফিনটেক বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের সঙ্গে কার্ডের সমন্বয় উন্নত করতে কী পরিকল্পনা আছে?
মো. রাফাত উল্লা খান: আমরা কার্ড ও মোবাইল অ্যাপকে সুনিপুণভাবে যুক্ত করছি। রিয়েল-টাইম ট্রানজাকশন আপডেট, ইন-অ্যাপ কার্ড ব্লক/আনব্লক, লিমিট সেটিং, পুশ নোটিফিকেশন—সবই ধীরে ধীরে শক্তিশালী করা হচ্ছে। গ্রাহক যেন অ্যাপ থেকেই আউটস্ট্যান্ডিং, মিনিমাম ডিউ, ফরেনকারেন্সি সেটিং, এমনকি ট্রানজাকশন ফ্রিকোয়েন্সিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন—এদিকেই এগোচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য কার্ড ব্যবহার যেন স্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত ও গ্রাহকবান্ধব হয়।
প্রশ্ন: নতুন গ্রাহকের জন্য কার্ড পাওয়ার যোগ্যতার শর্তগুলো কীভাবে সহজ করা যায়?
মো. রাফাত উল্লা খান: আমরা ডিজিটাল কেওয়াইসি (e-KYC) প্রক্রিয়া সহজ করছি। অনলাইন আবেদন, প্রাথমিক সীমিত লিমিট দিয়ে কার্ড ইস্যু এবং লেনদেন হিস্টোরি অনুযায়ী লিমিট বৃদ্ধি—এই মডেল অনুসরণ করছি। গ্রাহক যেন খুব সহজেই প্রবেশাধিকার পান, সেটা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছি।
প্রশ্ন: বিশ্বজুড়ে কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে লেনদেনের তুলনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের কার্ডের ব্যবহার কম। কার্ডের গ্রাহক বাড়াতে আপনার ব্যাংকের পরিকল্পনা কী?
মো. রাফাত উল্লা খান: বাংলাদেশে এখনো নগদ লেনদেনের প্রবণতা বেশি। তাই আমরা সচেতনতা ক্যাম্পেইন, ওয়েবিনার, সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারণা চালাচ্ছি। উৎসবকালীন অফার, ক্যাশব্যাক ও রিওয়ার্ড প্রোগ্রাম নতুন গ্রাহক আকর্ষণে সহায়ক হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—গ্রাহক যেন বুঝতে পারেন কার্ড মানে শুধু খরচ নয়, বরং নিরাপদ, সহজ, ট্র্যাকেবল এবং আধুনিক আর্থিক জীবনযাত্রার অংশ।
আমার বিশ্বাস, আগামী কয়েক বছরে ডিজিটাল পেমেন্ট কালচার আরও শক্তিশালী হবে এবং আমরা সেই পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হয়ে থাকব। সুত্র: কালবেলা

