মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ঘিরে জ্বালানি তেলের বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেশে তেলের মজুত কমে যেতে পারে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোলপাম্পে ভিড় বাড়ছে। অনেকেই সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় আগেভাগেই নিজেদের যানবাহনের জন্য বাড়তি তেল সংগ্রহ করছেন। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাজারে আস্থার ঘাটতিও দেখা দিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে সরকারকে দ্রুত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের মজুত কত আছে এবং পাইপলাইনে কত তেল রয়েছে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি। জ্বালানি মন্ত্রণালয় চাইলে প্রতিদিন অন্তত একবার আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য জানাতে পারে। একই সঙ্গে কোন জাহাজে জ্বালানি তেল আসছে, সেগুলো এখন কোথায় রয়েছে এবং দেশে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে—এসব তথ্যও প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। অন্যথায় সুযোগসন্ধানীরা পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সংকট অর্থনীতি ও ব্যবসা–বাণিজ্যে দুইভাবে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রথমত, বিদ্যমান বিনিয়োগের ওপর চাপ বাড়বে এবং অনেক খাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ধীর হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জ্বালানি পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকলে সেই বিনিয়োগ পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে। সরকারি বিধিনিষেধ অনুযায়ী পেট্রোলপাম্প বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। তবু গত দুই–তিন দিনের পরিস্থিতিতে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় কিছু পাম্প বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে, যা ভোক্তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাব শুধু বাংলাদেশেই নয়, পার্শ্ববর্তী ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ভারত ইতোমধ্যে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকেও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ সম্ভাব্য উৎস হতে পারে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজের জট তৈরি হয়েছে। এর ফলে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়েও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। যদি মধ্যপ্রাচ্য থেকে দীর্ঘ সময় তেল সরবরাহ বন্ধ থাকে, তাহলে সরকার কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে—সেই পরিকল্পনাও জনগণের সামনে নিয়মিতভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি তেলের রেশনিংয়ের সিদ্ধান্তকে অনেকেই বাস্তবসম্মত মনে করছেন। তবে একই সঙ্গে মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা জরুরি। কারণ, অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বেশি তেল কেনার প্রবণতা দেখাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
জ্বালানি তেলের সংকট কেবল পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা–বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
- সেলিম রায়হান: নির্বাহী পরিচালক, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)

