অনেক বছর ধরে ব্যবসা শুরু করা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করা, দেউলিয়াত্ব প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন সূচকে উন্নয়ন আনার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করার ক্ষেত্রে প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, দেশের প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না হওয়ায় কেবল অবকাঠামো বা বাজারের সীমাবদ্ধতা দায়ী নয়। নীতিমালার অস্পষ্টতা, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগে অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন সময়ে বিধিবিধানের সুবিধাজনক ব্যাখ্যাও বড় ভূমিকা রাখে।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে নিয়ন্ত্রণজনিত অনিশ্চয়তা। এর প্রভাব বহুমাত্রিক। এটি ব্যবসার কার্যকারিতা কমিয়ে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে এবং ব্যয় বৃদ্ধি করে। বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি বিবেচনায় অন্য বাজারে ঝুঁকতে আগ্রহী হন। নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বিভ্রান্তি অনেক সময় প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন ও পরবর্তী পর্যায়ে পর্যন্ত দেখা যায়। নতুন আইন বা বিধি জারি করার ক্ষেত্রে প্রায়ই ব্যক্তি খাতের মতামত নেওয়া হয় না। ফলে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন নীতিমালা তৈরি হয়, যা দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়।
সরকার একা এই প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে পারবে না। ব্যক্তি খাতকে কার্যকর রাখতে হলে পূর্বানুমানযোগ্য ও সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এর অর্থ স্পষ্ট এখতিয়ার নির্ধারণ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি। নতুন বিধি সৎ উদ্দেশ্যের হলেও আকস্মিকভাবে জারি হলে চলমান ব্যবসায় তা বড় বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মত দিয়েছেন, আগের আলোচনা ও পরামর্শ ছাড়া আইন প্রণয়ন ব্যবসায় বড় বাধা সৃষ্টি করে। ৬৭ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের মতামত গ্রহণ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরকার স্পষ্ট নয়। এটি আস্থাহীনতা বাড়ায় এবং নীতিগত স্থিতিশীলতায় প্রশ্ন তোলে।
সমন্বয়ের অভাব ও তথ্য ঘাটতি:
সরকারি ও ব্যক্তি খাতের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি ছাড়াও আন্তসরকারি সমন্বয়ও কম। এক সংস্থার সিদ্ধান্ত অন্য সংস্থার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে ধারাবাহিকতা হারায়। ফলস্বরূপ, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে দীর্ঘসূত্রতা ও ভুল ব্যাখ্যার ঝুঁকি বাড়ে।
দালিলিক তথ্যের অনির্ভরযোগ্যতা আরও এক অন্তরায়। বহু পুরোনো আইন ও স্ট্যাটিউটরি অর্ডার হালনাগাদ করা হয় না। উদাহরণ হিসেবে ১৯৪৭ সালের ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট এখনও বলবৎ। বন্ড সংক্রান্ত অনেক এসআরও আংশিকভাবে কার্যকর। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই পুরনো বা অপ্রাসঙ্গিক বিধির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন, যা আধুনিক বিনিয়োগ সংস্কৃতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
করসংক্রান্ত আইনের ক্ষেত্রেও সমন্বিত তথ্যভান্ডারের অভাব লক্ষ্য করা গেছে। ভ্যাট, শুল্ক ও আয়কর সম্পর্কিত বিধি একত্রে সহজলভ্য নয়। এতে তথ্য যাচাই ও প্রয়োগে জটিলতা তৈরি হয়। জরিপে অংশ নেওয়া শতভাগ উত্তরদাতা স্বীকার করেছেন, শুল্কবিধির অসামঞ্জস্য ব্যবসায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
নির্দেশনাহীন বা সীমিত নির্দেশনাসম্পন্ন নতুন নিয়ন্ত্রণ আদেশ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রয়োগ বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে। বিনিয়োগকারী বোঝে না কোন ব্যাখ্যা চূড়ান্ত। নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগে স্থিতিশীল বিধিবদ্ধ কাঠামোর অভাব পরিস্থিতি জটিল করে। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা অনেক উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগে আটকে রেখেছে।
দুর্বল প্রতিকার ব্যবস্থা আরও এক বড় সমস্যা। কোনো বিধি প্রয়োগে অসঙ্গতি বা অন্যায় হলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রতিকার পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অনেক উদ্যোক্তা অস্বচ্ছ নির্দেশনার ভিত্তিতে ব্যবসা চালাতে বাধ্য হন। রাজনৈতিক বা নীতিগত পরিবর্তনের ফলে চলমান প্রকল্প ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিততা অনিশ্চিত।
বিনিয়োগ টানতে কাঠামোগত পদক্ষেপ জরুরি: বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে ৭.৫–৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ অপরিহার্য। এজন্য কয়েকটি কাঠামোগত পদক্ষেপ জরুরি:
- নিয়ন্ত্রণ প্রভাব মূল্যায়ন নীতি: নতুন আইন প্রণয়নের আগে তার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিশ্লেষণ।
- নির্ভরযোগ্য নোটিশ ও মন্তব্য ব্যবস্থা: খসড়া বিধি প্রকাশ ও অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা।
- পদ্ধতিগত বিনিয়োগকারী সাড়া প্রক্রিয়া: বিনিয়োগকারীর অভিযোগ ও পরামর্শ দ্রুত সমাধান।
এ পদক্ষেপগুলো কার্যকর হলে ব্যবসায়িক পরিবেশে আস্থা ফিরে আসবে, ব্যক্তিখাতের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সুষ্ঠুভাবে সম্ভব হবে।
- মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক

