প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিনটি কেবল নারীর অর্জন উদযাপনের সুযোগ নয়, বরং লিঙ্গসমতার সংগ্রামের কথাও নতুনভাবে মনে করিয়ে দেয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শ্রমজীবী নারীদের অধিকার আন্দোলন থেকেই এই দিবসের সূচনা হয়।
১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে স্বীকৃতি দেয়। তারপর থেকে এটি নারী অধিকার, ক্ষমতায়ন এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। এক শতাব্দীর বেশি সময়ের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল প্রতীকী নয়; এটি নীতি, আন্দোলন ও সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিশালী আহ্বানও বয়ে আনে।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো—‘Rights. Justice. Action. For ALL Women and Girls.’ অর্থাৎ সব নারী ও কন্যার জন্য অধিকার, ন্যায়বিচার এবং কার্যকর পদক্ষেপ। এটি মনে করিয়ে দেয় যে শুধু প্রতিশ্রুতি বা ঘোষণা যথেষ্ট নয়; বাস্তব পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশ্বের অনেক দেশে এখনো বৈষম্যমূলক আইন, দুর্বল আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক কুসংস্কার নারীর অধিকারকে সীমিত রাখছে। তাই সময় এসেছে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার, যা নারীর অধিকারকে শুধু আইনে নয়, বাস্তব জীবনেও নিশ্চিত করবে।
এই প্রতিপাদ্যের তিনটি মূল স্তম্ভ—অধিকার, ন্যায়বিচার ও কার্যকর পদক্ষেপ। প্রথমত, নারীর অধিকার মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তা অখণ্ডভাবে রক্ষা করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। তৃতীয়ত, সরকার, প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব নীতিমালা ও কর্মসূচিতে রূপান্তর করতে হবে। এ তিন স্তম্ভ একসঙ্গে বিশ্বব্যাপী লিঙ্গসমতা অর্জনের শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন নানা রূপে দেখা যায়। সরকারগুলো নীতি সংলাপ ও কর্মসূচির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি মূল্যায়ন করে, বিশেষ করে লিঙ্গসমতা সম্পর্কিত লক্ষ্যগুলো। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবদান নিয়ে আলোচনা করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে উদ্যোগ নেয়। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো নারীর প্রতি সহিংসতা, কন্যাশিশুর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মতো বিষয়গুলো সামনে আনে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের কণ্ঠ আরও জোরালোভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবারের প্রতিপাদ্য বিশেষ প্রাসঙ্গিক। গত তিন দশকে নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। মেয়েদের শিক্ষায় উন্নতি, মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস এবং শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছে। তৈরি পোশাক শিল্পে লাখ লাখ নারী কর্মী দেশের রফতানি অর্থনীতির একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও দীর্ঘ সময় ধরে নারী নেতৃত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করেছে।
তবুও সীমাবদ্ধতাগুলো বিদ্যমান। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ এখনো পুরুষদের তুলনায় কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ প্রায় ৪০ শতাংশ, যেখানে পুরুষের হার ৮০ শতাংশেরও বেশি। নারীর বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে, যেখানে মজুরি কম, সামাজিক সুরক্ষা সীমিত এবং কর্মপরিবেশ অনিশ্চিত। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং সম্পদে নারীর সীমিত প্রবেশাধিকার এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতি দেখায় যে কেবল উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন, যা নারীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। জাতীয় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণও তাই আজ এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসেছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে নারী প্রধানমন্ত্রী বা শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি থাকলেও নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনো সীমিত। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নারীর সংখ্যা আগের তুলনায় কম ছিল। সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে সংসদে নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হলেও সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা খুবই কম।
এই সীমিত প্রতিনিধিত্বের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রচুর আর্থিক সম্পদের প্রয়োজন হয়, যা অনেক নারী প্রার্থীর জন্য বড় বাধা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামো এখনও পুরুষনির্ভর। ফলে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন পাওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ বাধা। অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতি এখনও পুরুষের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। পরিবার ও সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব নারীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে। কখনও কখনও ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাখ্যা নারীর নেতৃত্ব সীমিত করার জন্য ব্যবহার হয়।
নারীর কম প্রতিনিধিত্বের প্রভাব গভীর। যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর উপস্থিতি কম থাকে, তখন সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন নীতিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। মাতৃস্বাস্থ্য, শিশু পরিচর্যা, কর্মক্ষেত্রে সমতা ও নারীর প্রতি সহিংসতার মতো বিষয়গুলো নীতিনির্ধারণে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না।
গবেষণা দেখায়, যেখানে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেশি, সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং সম্প্রদায়ের কল্যাণসংক্রান্ত নীতি প্রাধান্য পায়। নারী নেতৃত্ব নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা যোগ করে এবং গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে। সুতরাং নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রদানে সক্রিয় হতে হবে। নির্বাচনী অর্থায়ন ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে আর্থিক বাধা কমানো যায়। নেতৃত্ব বিকাশ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নারীদের জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণে প্রস্তুত করতে সাহায্য করতে পারে।
স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কিছুটা আশাব্যঞ্জক। ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে অনেক নারী স্থানীয় শাসন কাঠামোয় যুক্ত হয়েছেন। যদিও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তবুও এই অভিজ্ঞতা নারীদের নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় সরকারে নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি হতে পারে।
নারীর ক্ষমতায়ন কেবল রাজনৈতিক অংশগ্রহণেই সীমাবদ্ধ নয়। ‘অধিকার, ন্যায়বিচার ও কার্যকর পদক্ষেপ’—এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সমাজের সব স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারকে আইনি সুরক্ষা শক্তিশালী করতে হবে এবং নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি খাতে নারীর কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বের সুযোগ বাড়াতে হবে। নাগরিক সমাজকে সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে হবে। গণমাধ্যমকে নারীর অর্জন তুলে ধরতে হবে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে নারীরাই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি। শিক্ষা, উদ্যোক্তা উদ্যোগ, সামাজিক নেতৃত্ব এবং সমষ্টিগত আন্দোলনের মাধ্যমে নারীরা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তুলছেন। দেশের যে অগ্রগতি আমরা দেখছি, তার পেছনে লাখ লাখ নারীর অবদান রয়েছে—যারা পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ তাই কেবল উদযাপনের দিন নয়; এটি স্মরণবার্তা। ‘Rights. Justice. Action. For ALL Women and Girls.’—এই আহ্বান মনে করিয়ে দেয় যে লিঙ্গসমতা অর্জনের পথ এখনো শেষ হয়নি। নারীর অধিকারকে আইনে এবং বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে, ন্যায়বিচার সবার জন্য সহজলভ্য করতে হবে এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিবর্তনকে স্থায়ী করতে হবে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে যে নারীর ক্ষমতায়ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের শক্তিশালী চালিকা শক্তি হতে পারে। এখন প্রয়োজন সেই অগ্রগতিকে আরও গভীর করা, যাতে প্রতিটি নারী ও কন্যাশিশু সমান অধিকার ভোগ করতে পারে, ন্যায়বিচার পেতে পারে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে পূর্ণভাবে অংশ নিতে পারে। তবেই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রকৃত অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ নেবে।
- ড. ফাহমিদা খাতুন: নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

