শিল্পায়ন, কৃষি এবং যানবাহনের চাপে বাংলাদেশে জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। প্রতি বছর এই চাহিদা বাড়ছে প্রায় ১২ শতাংশ। যদিও ডিজেল ও কেরোসিনের ব্যবহার কিছুটা কমেছে, তবুও ফার্নেস অয়েল, লুব্রিক্যান্ট, এভিয়েশন ফুয়েল, পেট্রোল-অক্টেনের পাশাপাশি এলপিজি ও এলএনজির চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার, যা মোট আমদানি খরচের ১৭ শতাংশের সমান। এর মধ্যে তরল জ্বালানিতেই ব্যয় হয় প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার। মোট চাহিদার ৬২ শতাংশই আমদানি করা হয়। ইস্টার্ন রিফাইনারির সীমিত পরিশোধন ক্ষমতার কারণে অধিকাংশ তরল জ্বালানি পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত—আমাদের তেলের প্রধান সরবরাহকারী। এলএনজি ও এলপিজি আসে ওমান ও কাতার থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ভারত এবং চীন থেকেও আমরা ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল সংগ্রহ করেছি। পরিচিত সরবরাহকারীর মধ্যে আছেন সৌদি আরামকো, এডনক আবুধাবি, কুয়েত পেট্রোলিয়াম, পেট্রোনাস মালয়েশিয়া এবং এক্সন-মবিল সিঙ্গাপুর।
ইদানীং কাতারের গ্যাস ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আনা হচ্ছে, এবং আরও আমদানি পরিকল্পনা রয়েছে। অতীতেও আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ভারত, মাইডর ইজিপ্ট ও ফিলিপাইনের ন্যাশনাল অয়েল থেকে জরুরি ডিজেল আমদানি করা হয়েছিল।
তবে বাংলাদেশের তেল আমদানিতে অন্য দেশের মতো ফিউচার মার্কেটে অপারেট করার অনুমতি নেই। ফলে বাজারে তেলের নিম্নমূল্যের সুবিধা আমরা নিতে পারি না। বেশির ভাগ আমদানির অর্থায়ন হয় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, কিছু আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও সরকারি কোষাগার থেকে। এর ফলে আমরা কখনও ৩০-৪০ ডলারে ব্যারেল তেল কিনতে পেরেছি, আবার কখনও ১৪০ ডলারের ওপরও খরচ করতে হয়েছে। এলএনজি ও এলপিজির বাজার আরও বেশি অস্থির।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাব
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর দাম ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সোমবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৮ ডলার, আর ব্রেন্ট ১১০ ডলারের ওপরে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস উচ্চমূল্যের মুখোমুখি হতে পারে। ইতিমধ্যে ইরান, কাতার ও সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের তেলক্ষেত্র ও রিফাইনারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা, লজিস্টিকস ব্যাঘাত এবং জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও শিপিং রুটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায়, অনেক বিশ্লেষক বলছেন এটি ‘বিশ্ব অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে’। সংঘাত কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হলে তেলের দাম ১৫০ ডলারের ওপরে যেতে পারে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে জ্বালানির দাম বাড়বে, পণ্যের ঘাটতি তৈরি হবে, এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ ব্যাহত হলে নেতিবাচক চেইন রিয়্যাকশন সৃষ্টি হবে।
জেপি মরগ্যান চেজ ব্যাংকের বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বাজার শুধুমাত্র ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিতে নেই; রিফাইনারি বন্ধ ও রপ্তানি সীমাবদ্ধতা সরবরাহ চেইনকে প্রভাবিত করছে। এরই মধ্যে বিশ্বে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ স্থগিত হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালির ওপর হামলা ও জাহাজের ঝুঁকির কারণে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও কুয়েত তেল পরিবহন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এতে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়েছে, যা বৈশ্বিক চাহিদার ১.৪ দিনের সমান।
বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও বিকল্প পথ
বাংলাদেশ তার জ্বালানি আমদানি প্রায় ৭০ ভাগই মধ্যপ্রাচ্য থেকে করে। যদিও ইদানীং মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন ও ভারত থেকেও আমদানি শুরু হয়েছে। বর্তমান রিজার্ভ ও পাইপলাইন বিবেচনায়, সরকারকে ভারত, চীন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে। এলএনজি আমদানি যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনামের ওপরও নির্ভর করতে হবে। ইতিমধ্যেই সরকার ভারতের সঙ্গে ডিজেল আমদানিতে আলোচনা শুরু করেছে।
জ্বালানি, পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে তেল ও জ্বালানি আমদানি মসৃণ করা জরুরি। দেশের তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, দুটি বিদেশি ব্যাংক এবং দুটি স্থানীয় ব্যাংক বিপিসি ও পেট্রোবাংলার মাধ্যমে এলসি খোলে আমদানি সমর্থন করছে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশি মুদ্রায় সরবরাহ নিশ্চিত করবে। কিছু ক্ষেত্রে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রকে শক্তি সরবরাহে ব্যবহার করতে হবে। মধ্যমেয়াদি বিকল্প জ্বালানি সঞ্চালনের পদক্ষেপ ছাড়া নিরাপদ ও স্বল্পমূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা কঠিন।

