মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান সংঘাত দিন দিন তীব্র হচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বছরের পর বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার ও খাদ্য সরবরাহকে অস্থির করে রেখেছে।
এই সংঘাতগুলো শুধু আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এর প্রভাব বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও খাদ্যনিরাপত্তাতেও স্পষ্টভাবে পড়ছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে যাওয়াই সবচেয়ে আগে প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ বড় অংশে তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ডিজেল, পেট্রল এবং সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
কৃষি ক্ষেত্রে প্রভাব সবচেয়ে জোরালো। আধুনিক কৃষির মেরুদণ্ড হলো রাসায়নিক সার, বিশেষ করে ইউরিয়া। বিশ্বের ইউরিয়া সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশ এবং অ্যামোনিয়ার এক-চতুর্থাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। হরমুজ প্রণালির ওপর যেকোনো সংঘাত মানেই সারের দাম আকাশচুম্বী।
লন্ডনভিত্তিক চ্যাথাম হাউস সতর্ক করছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য মারাত্মক খাদ্য ঘাটতির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি ডিজেলচালিত সেচপাম্প ও ট্রাক্টরের ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের দাম বেড়ে গেলে সেচ খরচ বাড়ে, এবং সারসহ অন্যান্য উপাদানের দাম বেড়ে গেলে কৃষকের উৎপাদন খরচ আকাশছোঁয়া হয়। ফসল বাজারে এলে খরচ পুষাতে দাম বৃদ্ধি করতে হয়।
শহরের নিম্নআয়ের মানুষ বা দিনমজুরদের জন্য এ সব খরচ বৃদ্ধি সরাসরি খাদ্য মূল্যে প্রতিফলিত হয়। চাল, ডাল, তেল, সবজি সবই দামের ঊর্ধ্বগতি পায়। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে।
এই সংকট থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বাড়ির আঙিনা, ছাদ বা পতিত জমিতে সবজি চাষের মাধ্যমে পারিবারিক খাদ্য চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব। পাড়া-মহল্লায় সম্মিলিত উদ্যোগে পতিত জমি চাষও কার্যকর।
শহরে ছাদকৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদন নয়, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক। বুয়েটসহ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ছাদ বাগান ভবনের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা প্রায় ১.৭৩ ডিগ্রি কমাতে পারে। এটি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে, নাগরিক ক্লান্তি কমায় এবং শিশুদের মানসিক বিকাশে সহায়ক।
ছাদকৃষি ও পতিত জমির ব্যবহার কেবল কৃষকের দায়িত্ব নয়, নাগরিক সবার কর্তব্য। নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করে অল্প জায়গায়ও অধিক উৎপাদন সম্ভব। ভাসমান বেডে ফসল চাষ করে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি কমানো যায়।
দূর যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি গ্রাম-গঞ্জের মাঠ, শহরের বস্তি এবং দিনের আয়ের মানুষের খাবারের টেবিলে পড়ছে। খাবারের দাম বেড়ে যাওয়া, পুষ্টিহীনতা এবং খরচের চাপ—সবই এই সংকটের ফল।
পরিবেশ রক্ষা, পারিবারিক পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য ছাদকৃষি ও পতিত জমির যথাযথ ব্যবহারই হবে আগামীর রক্ষাকবচ। সচেতন হওয়ার এবং প্রস্তুত হওয়ার সময় এখনই।
- মো. বশিরুল ইসলাম ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

