পৃথিবী বহু বছর ধরে দুই ভাগে বিভক্ত—শোষক ও শোষিত। এই বিভাজন নতুন নয়, বরং সময়ের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়েছে। বর্তমানের পুঁজিবাদী সমাজে শোষিতের সংখ্যা শোষকদের তুলনায় অনেক বেশি, তবে তাদের মূল দুর্বলতা হলো বিচ্ছিন্নতা। শোষকরা একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও, শোষণের ক্ষেত্রে তারা একত্রিত হতে পারে।
ইলন মাস্ক এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদাহরণ চোখে পড়ার মতো। নির্বাচনের সময় ইলন মাস্ক ট্রাম্পের প্রতি সবসময় সহমত প্রকাশ করলেও পরে নিজেদের স্বার্থে দূরে সরে গেছেন। নির্বাচনের সময় তাদের বন্ধুত্ব মিথ্যা ছিল না এরা একত্রিত হয়েছিল শত্রু, অর্থাৎ জনগণকে নিয়ন্ত্রণ এবং শোষণের জন্য। পরে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগুনে তারা আলাদা পথে চলে যায়।
শোষিতদের শক্তি তাদের ঐক্যে। নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে এটি স্পষ্ট দেখা গেছে। সমাজতন্ত্রীদের জয় প্রমাণ করে যে, জনগণ তখনই আস্থা রাখে যখন তারা স্পষ্টভাবে নিজেদের পরিচয় জানায়। যদি আংশিক তথ্য বা লুকোছাপা দেখানো হয়, ফলাফল হতাশাজনক হয়। মানুষ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা রাখে এবং তারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে চেনে। সেক্ষেত্রে সামাজিক মালিকানা বা সমতা প্রচারের সুযোগ রয়েছে, শুধু ব্যাখ্যা স্পষ্ট হতে হবে এবং সাংস্কৃতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।
বর্তমান সময়ে বিশ্বের ধনী উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যাপক বিনিয়োগ করছেন। তার প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে যে বেতন তিনি গ্রহণ করেছেন, তা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি অবাক করার মতো হলেও এর সঙ্গে জড়িত শঙ্কাগুলোও রয়েছে। প্রথমে প্রশ্ন আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? বাস্তবে, মালিকরা কয়েকজনই থাকবেন, যাদের স্বার্থ ‘উন্নয়ন’ কিন্তু এই উন্নয়ন ইতোমধ্যেই বৈষম্য বাড়াচ্ছে, মানুষের বিচ্ছিন্নতা বাড়াচ্ছে, এবং প্রকৃতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করছে। দ্বিতীয় শঙ্কা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় লাখ লাখ মানুষকে কর্মহীন করে ফেলতে পারে এবং যারা চাকরিতে থাকবে, তাদের সৃজনশীলতা হ্রাস পাবে। দীর্ঘমেয়াদে মানবজাতি হয়তো যন্ত্রের শাসনের অধীনে চলে যেতে পারে। এ থেকে রক্ষা পেতে মূল শত্রু পুঁজিবাদী উন্নয়নকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে।
পুঁজিবাদীরা বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রচার করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতারা জনসাধারণের সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হচ্ছেন। তারা অভিবাসী বিতাড়ন, শুল্কবৃদ্ধি, ভেনেজুয়েলার বামপন্থি সরকারের পতন, ইরানের তেল দখল, এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় তৎপর। তবে পারস্য জাতীয়তাবাদের কারণে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর দুরবস্থা লক্ষ করা যাচ্ছে। পুঁজিবাদী সকল কর্মকাণ্ডের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য এক নিজেকে বড় করা। শোষক বা ধর্ম ব্যবসায়ীরা সকলেই একই লক্ষ্য পূরণে নিয়োজিত। বিপরীতে, জনগণের ঐক্যই হতে পারে পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার।
নিরাশ্রয় মানুষ প্রায়শই ধর্মের কাছে আশ্রয় খোঁজে, আর সেই সুযোগ লুফে নেয় ধর্ম ব্যবসায়ীরা। তবে আর্থসামাজিক নিপীড়নের কারণে মানুষ এখন বিকল্প খুঁজছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকল্প হলো সামাজিক মালিকানা, অর্থাৎ সমাজতন্ত্র। কিন্তু সমাজতন্ত্রকে বিদ্বেষের আড়ালে ফেলা হয়, আন্দোলনের ওপর নিষ্পেষণ চালানো হয়, এবং সমাজবিপ্লবীদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে প্রতিক্রিয়াশীলতার জোয়ার বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশেও এর প্রমাণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ৯ ডিসেম্বরের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। বেগম রোকেয়াকে “মুরতাদ” ও “কাফির” আখ্যা দেওয়া হয়, যা তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী তে ঘটেছে। এ কাজটি করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের এক সহযোগী অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানিয়েছেন, এটি ওই অধ্যাপকের ব্যক্তিগত মতামত। তবে প্রশ্ন থেকে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার জন্য কি এমন বিষাক্ত মতাদর্শ বহন করা উচিত? আর পাবলিক অর্থায়িত প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত মতামত ছড়ানোর অধিকার কীভাবে প্রদান করা হয়?
শিক্ষকদের প্রসঙ্গ এলে স্মরণ রাখতে হবে শিক্ষার মান অনেকাংশেই নির্ভর করে শিক্ষকদের মানের ওপর। শিক্ষকের মান বৃদ্ধি পায় পেশাগত বেতন, ভাতা এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে। মেধাবী মানুষ শিক্ষক হিসেবে যোগ দেবেন যদি বেতন-ভাতা ও সামাজিক মর্যাদা আকর্ষণীয় হয়, এবং যদি পেশাগত তদবির ও উৎকোচের প্রথা বিলুপ্ত থাকে। এছাড়া, শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে যথার্থ ও নিয়মিত শিক্ষক-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

