বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন ও শ্রম ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি একটি তদন্ত শুরু করেছে। এটি শুধুমাত্র আমাদের দেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত তাদের একতরফা ও বৈশ্বিক নজরদারির অংশ।
প্রথমত, ‘অতি উৎপাদন’ শব্দের সংজ্ঞা অস্পষ্ট। কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, কোন দেশ অতি উৎপাদন করছে কি না, তা পরিষ্কার নয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব প্রাক্কলনের ভিত্তিতে চাহিদা ও সরবরাহ ঠিক করে। ফলে অতি উৎপাদন নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব।
অন্য পুঁজিবাদী অর্থনীতির মতোই বাংলাদেশও উৎপাদন করে। কখনও উৎপাদন বেশি হয়, কখনও কম। উৎপাদন বাড়লে দাম কমে, কম হলে দাম বাড়ে। তাই বাজার অর্থনীতিতে অতি বা নিম্ন উৎপাদনের চক্র স্বাভাবিক। একমাত্র কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতেই সরকারের পরিকল্পনার মাধ্যমে উৎপাদন ঠিক করা সম্ভব, যা একসময় সমাজতান্ত্রিক দেশে দেখা যেত। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য মূলত তৈরি পোশাক। দেশের অনেক উৎপাদক ভবিষ্যতের চাহিদা মাথায় রেখে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায়, যাতে চাহিদা এলে তা মেটানো যায়। এটি বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের শ্রমিক মজুরির মধ্যে পার্থক্য বিশাল। নিউইয়র্কে ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১৫ ডলার, দিনে আট ঘণ্টায় ১২০ ডলার। বাংলাদেশের মাসিক সর্বোচ্চ মজুরি ওভারটাইমসহ প্রায় ১২০–১৩০ ডলার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য বাংলাদেশের উৎপাদন ক্ষতিকর—এ দাবি যুক্তি সংগত নয়।
তৃতীয়ত, জনকল্যাণে বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভর্তুকি দেওয়া হয়। এটি মূলত দেশীয় বাজারের জন্য, রপ্তানির জন্য নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে এতে কোনো ক্ষতি হয় কি না, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
চতুর্থত, ১৯৯০-এর দশক থেকে দেশে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। কখনো জোরপূর্বক শ্রম করার অভিযোগ উঠেনি। সবচেয়ে বড় বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর তাদের কৃষকদের ১০–১৫ বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি দেয়। এটি নিয়ে কখনও প্রশ্ন তোলা হয় না। কিন্তু অন্য দেশের ভর্তুকি নিয়ে তারা প্রশ্ন তোলে।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং তদন্তের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে নিজের নীতিমালা চাপিয়ে দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তিসঙ্গত ও শক্তিশালী ব্যাখ্যা রয়েছে। তদন্ত শুরু হওয়ার আগে এই বিষয়ে পূর্ণ প্রস্তুতি থাকা জরুরি।

