বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক বিশেষ দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রয়েছে দ্রুত প্রবৃদ্ধি, বড় মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং রফতানি সম্প্রসারণের মতো ইতিবাচক সূচক। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠছে।
এই দ্বৈত বাস্তবতা এক ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে। মূল প্রশ্ন হলো, সামষ্টিক অর্থনীতি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সুগম করার ক্ষেত্রে কি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে?
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল প্রবৃদ্ধির হারে নির্ধারিত হয় না। এর মূল ভিত্তি হলো নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা। বাংলাদেশ ব্যাংক এ তিনটি বিষয় সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ভিত শক্ত করে। তবে এর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীনতা অপরিহার্য।
যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে না থাকে, তাহলে মুদ্রানীতি এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম প্রভাবিত হয়। এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা দেখা দেয় এবং বিনিয়োগ পরিবেশে বাধা সৃষ্টি হয়। তাই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ প্রলুব্ধতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অপরিহার্য।
কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা দিলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে সহজ হয়। মূল্যস্ফীতি দেশের সব শ্রেণীর মানুষকে প্রভাবিত করে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তব আয় কমিয়ে দেয়। ব্যবসা খাতেও খরচ বাড়ায়। তাই সুদহার নির্ধারণে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় রাখতে হয়।
কিন্তু যদি সুদহার নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাব থাকে, তাহলে বাজারে বিভ্রান্তিকর বার্তা পৌঁছায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ব্যবসায় এবং সম্ভাবনাময় শিল্পে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিনিয়োগ থেমে যায়, সঞ্চয় নিরুৎসাহিত হয় এবং খরচ বেড়ে যায়।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো ব্যাংকিং খাতে ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন। ব্যাংক সাধারণত গ্রাহকের জামানত সংগ্রহ করে এবং এটিকেই পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে ঋণ বিতরণ করে। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ঋণখেলাপি বেড়ে গেলে তারল্য সংকট দেখা দেয়। প্রভাবশালী ঋণখেলাপিরা বড় অংকের অর্থ নিলেও ফেরত না দিলে ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়। ফলে গ্রাহকের আস্থা কমে যায় এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বাধীনভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে, তাহলে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়। ব্যাংকিং সংকটে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি; রাজনৈতিক অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা সংকটকে আরও গভীর করে। স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারে, যেখানে নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠান প্রায়ই ব্যর্থ হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দক্ষতার ওপর প্রশ্ন নেই। তবে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। আর্থিক খাতে রাজনৈতিক চাপ, ঋণ বিতরণে অস্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা কমে। ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করে। মধ্যস্থতাকারীর প্রতি আস্থা কমে গেলে বিনিয়োগকারীরাও পিছিয়ে যায়। আস্থাহীন পরিবেশে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়, আর এর ফলে ব্যাংকগুলো দায়িত্বহীন আচরণ বাড়িয়ে দেয়, নৈতিক ঝুঁকি বেড়ে যায়।
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রকৃতপক্ষেই স্বায়ত্তশাসন দিতে হয়। বিশ্বের অনেক দেশই এটি অনুধাবন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্য ১৯৯৭ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কার্যকর স্বাধীনতা দিয়েছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এখন রাজনৈতিক অনুমোদন ছাড়াই সুদের হার নির্ধারণ করে। এর ফলে দেশে দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি, শক্তিশালী বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক আস্থা বজায় রয়েছে। ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় সংকটের পর ইন্দোনেশিয়াও আর্থিক খাতকে ভাগ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি দেখে, আর আলাদা সংস্থা ব্যাংক তদারকি করে। এতে রাজনৈতিক প্রভাব কমে, নিয়ন্ত্রক দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।
এই উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট হয়, শক্তিশালী অর্থনীতি গড়তে প্রয়োজন শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তবে স্বাধীনতা মানে নিয়ন্ত্রণহীন নয়। রাজনৈতিক চাপমুক্ত পেশাদার সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা হলো মূল উদ্দেশ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইন বিভাগের কাছে জবাবদিহি করবে, তবে কার্যক্রম ও নীতিনির্ধারণ হবে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে। এভাবে গণতন্ত্র ক্ষুণ্ণ হয় না; বরং দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কেবল অনুধাবনের বিষয় নয়, উদ্যোগও নিতে হবে। প্রথমে প্রয়োজন আইন সংশোধন। মুদ্রানীতিতে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ সীমিত করতে হবে। সুদহার রাজনৈতিক বিবেচনায় না, বরং অর্থনৈতিক সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্য ব্যাংকগুলোকে তদারকির পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে এবং সমস্যা সমাধানে দ্রুত হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য ব্যাখ্যা ও সংসদীয় তদারকিও নিশ্চিত করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাস্তবিকভাবে স্বাধীন হবে।
এ সবকিছু দ্রুত করতে হবে। দেরি করলে অর্থনীতিতে বিপদ দেখা দেয়। যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পুরোপুরি স্বায়ত্তশাসন না দেওয়া হয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে না। কারণ ব্যাংক খাতের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে শৃঙ্খলা ভেঙে যায়। দায়িত্বহীন ব্যাংক আচরণ মুদ্রাবাজারে চাপ বাড়ায়। অভ্যন্তরীণ আর্থিক খাতে সংকট তীব্র হলে বিদেশী বিনিয়োগকারীর আগ্রহ কমে যায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা অবশ্যই জরুরি। তবে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা আরও বেশি প্রয়োজন। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপ নিতে চায়, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। এটি কেবল প্রয়োজন হিসেবে আলোচনায় রাখলেই হবে না; আইনি পর্যায়ে শক্তিশালীভাবে ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
- মোহাম্মদ কবির হাসান: অধ্যাপক, ফিনান্স বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিয়েন্স, যুক্তরাষ্ট্র

