রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইতিমধ্যেই ঈদযাত্রার ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই লুকানো আছে এক নির্মম বাস্তবতা—সড়ক দুর্ঘটনা।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের কমপক্ষে ৩১৪টি এলাকা সড়ক দুর্ঘটনার বিভিন্ন মাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩৭ হাজার দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব অঞ্চল চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ১৩৯টি এলাকা ‘অতি দুর্ঘটনাপ্রবণ’ এবং ১৭৫টি এলাকা ‘দুর্ঘটনাপ্রবণ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ২১টি এলাকা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে অর্থাৎ দেশের সড়কে এমন কিছু স্থান আছে, যেখানে দুর্ঘটনা যেন নিয়মিত ঘটার মতো হয়ে গেছে।
গবেষণায় আরও প্রকাশ করা হয়েছে, প্রায় ৮৫ শতাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ অতিরিক্ত গতি। আধুনিক সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণে গাড়ির গতি বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক, তবে তা নিয়ন্ত্রণের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে উন্নত সড়কই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেশে নতুন মহাসড়ক নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ হলেও গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত নজরদারির উন্নয়ন সমান তালে হচ্ছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। কোথাও সড়কের নকশাগত ত্রুটি, কোথাও সড়ক বিভাজক বা সতর্কতামূলক চিহ্নের অভাব, আবার কোথাও সড়কের পাশে অনিয়ন্ত্রিত জনবসতি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে মহাসড়কের পাশে যত্রতত্র বাস কাউন্টার, যাত্রী ওঠানামা এবং শ্রমিকদের রাস্তা পারাপার, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি করছে।
দূরপাল্লার চালকদের বিশ্রামের অভাবও একটি বড় সমস্যা। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালালে মনোযোগ কমে যায়, প্রতিক্রিয়া ধীর হয়। এই সমস্যা বিবেচনায় রেখে ২২৭ কোটি টাকার চারটি আধুনিক বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হয়েছিল কুমিল্লার নিমসার, সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়া, মাগুরার লক্ষ্মীকান্দর ও হবিগঞ্জের জগদীশপুরে। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হলেও এগুলো এখনও চালু হয়নি। অর্থাৎ দুর্ঘটনা হ্রাসে সহায়ক এই অবকাঠামো কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, সড়ক উন্নয়ন কেবল ইট, বালু বা বিটুমিনের সমষ্টি নয়। উন্নত সড়কের সঙ্গে প্রয়োজন গতিনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, কার্যকর ট্রাফিক নজরদারি, প্রশিক্ষিত চালক এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামব্যবস্থা। এগুলো না থাকলে উন্নয়ন অনেক সময় নতুন ঝুঁকির জন্ম দেয়। ঈদে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এবং অনেক চালক দ্রুত পৌঁছানোর তাড়নায় গতিসীমা অমান্য করার কারণে এই ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়।
পরিশেষে, সমস্যার সমাধান কেবল অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয় এটি আচরণ ও ব্যবস্থাপনারও বিষয়। ঈদ মানে আনন্দের যাত্রা, প্রিয়জনের কাছে ফিরা। তাই সড়কে দ্রুত পৌঁছানো নয়, নিরাপদে পৌঁছানোই প্রকৃত সাফল্য।
