সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের শর্তে শিথিলতা এনেছে। আগের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য ঋণগ্রহীতাকে মোট ঋণের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে প্রথমে পরিশোধ করতে হতো। নতুন সার্কুলারের মাধ্যমে এখন এই ২ শতাংশের অর্ধেক অর্থই প্রথমে দিতে হবে, বাকি অর্ধেক পরবর্তী ছয় মাসে মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ঋণগ্রহীতার মোট ঋণ ১০০ কোটি টাকা হয়, তবে প্রথমে দুই কোটি টাকার মধ্যে এক কোটি টাকা দিতে হবে, বাকি এক কোটি টাকা ছয় মাসের মধ্যে কিস্তিতে পরিশোধ করা যাবে।
এছাড়া, ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও বাতিল করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থাকে, ব্যবসা বন্ধ বা মারাত্মক ক্ষতির কারণে ঋণখেলাপি হয়ে থাকা উদ্যোক্তারা এই ডাউন পেমেন্টের অর্থ কীভাবে সংগ্রহ করবেন? সার্কুলার জারি করার আগে এই বিষয়টি কি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছে? যদি না হয়, তাহলে নতুন নিয়মও কার্যকর হবে না।
দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক আগে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছে। প্রধান কারণ হলো ঋণগ্রহীতাদের নগদ প্রবাহ বা সক্ষমতা বিবেচনা না করে সময়সীমা এবং ডাউন পেমেন্টের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া।
অত্যন্ত গুরুতর বিষয় হলো, অনেক ঋণগ্রহীতার ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের জন্য নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করাও সম্ভব নয়। এমন অবস্থায় ঋণ পুনঃতফসিলের শর্ত পূরণ করা একেবারেই অসম্ভব। আবার কিছু ঋণগ্রহীতা গৃহীত ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছেন বা পাচার হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে, নতুন সার্কুলারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যকর হবে বলে মনে করা যায় না।
সার্বিকভাবে বলা যায়, খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলকে কার্যকর করতে হলে শর্তাবলী আরও বাস্তবসম্মত এবং ঋণগ্রহীতাদের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংকগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার শিরোপা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঋণ থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ নয়; এর জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা ও চরম ক্ষতির বিনিময়ে রূপান্তরমূলক পদক্ষেপ। আগের অনেক লেখায় আমি বিষয়টি বিশদে আলোচনা করেছি এবং ভবিষ্যতেও বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে লেখা চালিয়ে যেতে চাই।
ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা মূলত সেই সব ঋণগ্রহীতার জন্য প্রযোজ্য, যাদের ব্যবসা এখনও সচল, বা বন্ধ হলেও পুনরায় চালু করা সম্ভব, কিংবা অন্য কোনো বিকল্প ব্যবসার সুযোগ আছে। এককথায়, যাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আছে, শুধুমাত্র তাদের জন্য এই সুযোগ কার্যকর। অন্য কোনো ঋণগ্রহীতা যদি এটি পান, তাও তাদের ঋণ সমস্যার সমাধানে কাজে আসবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ প্রায় তিনগুণ বেড়ে দুই লাখ কোটি টাকা থেকে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো দেশের অনেক ব্যবসায়ীর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারানো। তবে তাঁরা এখনও টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই শ্রেণির ঋণগ্রহীতাদের জন্যই ঋণ পুনঃতফসিলের একটি বাস্তবসম্মত সুযোগ থাকা প্রয়োজন, যাতে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়। কিন্তু এটি পূর্বের ধাঁচের পদ্ধতিতে সম্ভব নয়; বিশেষ পদক্ষেপের প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতের ঋণগ্রহীতাদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা উচিত।
সক্ষম ঋণগ্রহীতা – যাদের ব্যবসা বা বিকল্প ব্যবসা এখনও চালু আছে; যাঁরা সহযোগিতা পেলে ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম। এই গ্রুপের ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা থেকে মুনাফার ভিত্তিতে প্রতি মাসে কিস্তি নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে ঋণ পুনঃতফসিলের মেয়াদ ১০ বছরের বদলে ২০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ঋণগ্রহীতার মোট ঋণ ১০০ কোটি টাকা হয় এবং মেয়াদ ১০ বছর ধরা হয়, তবে প্রতি মাসে এক কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে, যা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু যদি মেয়াদ ২০ বছর ধরা হয়, তাহলে মাসিক কিস্তি দাঁড়াবে প্রায় ৪০ লাখ টাকা, যা অধিকাংশ সক্ষম ব্যবসায়ী সহজে দিতে পারবেন।
এই ধরনের বাস্তবমুখী পরিকল্পনা ছাড়া খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। মূল লক্ষ্য হলো, যাদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা আছে, তাঁদেরকে সেই সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া। খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, পুনঃতফসিল করা ঋণের কিস্তি দিয়ে অবশ্যই প্রথমে মূল ঋণ পরিশোধ করতে হবে। কমপক্ষে অর্ধেক মূল ঋণ পরিশোধের আগ পর্যন্ত কিস্তি সুদ পরিশোধে ব্যবহার করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, ঋণগ্রহীতাদের বোঝানো ও অঙ্গীকারবদ্ধ করা জরুরি যে, তাদের সম্মতিতে নির্ধারিত মাসিক কিস্তি তারা যেকোনো পরিস্থিতিতেই পরিশোধ করবেন। তৃতীয়ত, সুদের হার হ্রাস করতে হবে। ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধ অনেকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
চতুর্থত, পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা প্রয়োজন, যাতে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে শর্তের ব্যত্যয় বা অন্য কোনো অসঙ্গতি না ঘটে। পঞ্চমত, ডাউন পেমেন্ট বাধ্যতামূলক না করে ঐচ্ছিক করা উচিত। অর্থাৎ যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা ডাউন পেমেন্ট দেবেন, আর যাঁদের নেই, তাঁরা দেবেন না। তবে ডাউন পেমেন্ট উৎসাহিত করার জন্য ঋণের ওপর বিশেষ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে; যেমন—ডাউন পেমেন্ট দিলে সুদের হারে ১ শতাংশ ছাড়।
এ ধরনের ঋণগ্রহীতা চিহ্নিত করতে ব্যাংকের ক্রেডিট অফিসারদের প্রতিটি ঋণের নথি ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। ঋণগ্রহীতার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয় ও শর্তাবলি নির্ধারণ করতে হবে। এগুলো নিছক কিছু উদাহরণ মাত্র; ব্যাংক, ঋণ বিভাগের প্রধান ও ক্রেডিট অফিসারদের কাছে আরও কার্যকর সুপারিশ থাকতে পারে।
ব্যাংকের ঋণখেলাপি নির্ধারণের দ্বিতীয় শ্রেণিতে রাখা হবে সেই সব ঋণগ্রহীতাকে: যাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো সুযোগ নেই, ঋণের অর্থ অন্যত্র চলে গেছে বা পাচার হয়েছে। মূলত যাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কোনো সম্ভাবনা নেই, তাঁরা এই গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হবেন। এই ধরনের ঋণ প্রত্যেক ব্যাংকের জন্য ভয়ানক এক ‘ক্যান্সার’, যার নিরাময় একা কোনো ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব নয়।
এ জন্য প্রয়োজন ২০–২৫ বছরের বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা, যেখানে সরকারি সহযোগিতা, বেইল-আউটের মতো পদক্ষেপ অপরিহার্য। এটি একটি আলাদা ও জটিল বিষয়, যা এখানে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা সম্ভব নয়।
- লেখক : নিরঞ্জন রায়, সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

