বাংলাদেশে শিক্ষার হার বেড়েছে—এটি নিঃসন্দেহে অগ্রগতির সূচক। গত দুই দশকে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং উচ্চশিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজলভ্য হয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির বিপরীতে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতাও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে—শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও যখন তরুণরা উপযুক্ত কর্মসংস্থান পাচ্ছে না, তখন শিক্ষার এই সাফল্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকট।
বর্তমান বাস্তবতায় প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ উপযুক্ত চাকরির সুযোগ পাচ্ছে না। কেউ দীর্ঘ সময় ধরে চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন, কেউ নিজেদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের মধ্যে সুস্পষ্ট বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে, যা অর্থনীতি ও সমাজের জন্যই উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্ব এখন একটি বড় জাতীয় সংকটে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২৬ লাখ ২০ থেকে ২৬ লাখ ৬০ হাজার যুবক বেকার, যার মধ্যে ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক ডিগ্রিধারী।
দেশে বেকারত্বের সামগ্রিক হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৬৩ শতাংশে, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি—১৩.৫ শতাংশেরও উপরে, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ শিক্ষার হার বাড়লেও কর্মসংস্থান সেই হারে বাড়ছে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষাই বেকার থাকার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন। পুরুষদের মধ্যে বেকারত্ব তুলনামূলক বেশি হলেও শিক্ষিত নারীদের মধ্যেও এটি উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব তরুণদের মানসিক চাপ, হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি সৃষ্টি করছে, যা সমাজের জন্যও উদ্বেগজনক।
শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ নেই; এটি একাধিক কাঠামোগত ও বাস্তব সমস্যার সম্মিলিত ফল। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের পরিস্থিতি দেশের উৎপাদন ব্যাহত করেছে, বিনিয়োগ কমিয়েছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে ধীর করেছে।
শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে বড় অসামঞ্জস্য রয়েছে। শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না। আধুনিক কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা ও সৃজনশীল চিন্তার গুরুত্ব বাড়লেও অনেক শিক্ষিত তরুণ এগুলোতে পিছিয়ে থাকছেন।
বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের ধীরগতি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাঁধা দিচ্ছে। সামাজিক মানসিকতাও সমস্যা জটিল করছে—সরকারি চাকরিকে নিরাপদ পেশা হিসেবে দেখার কারণে অনেক শিক্ষিত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন। কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কম থাকায় দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি হয়। এছাড়া অনেক শিক্ষার্থীর চাকরি ও প্রত্যাশিত বেতনের মধ্যে অমিলও বেকারত্ব বাড়াচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, দক্ষতার অভাব, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ধীরগতি এবং সামাজিক মানসিকতা একসঙ্গে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক নয়; বাস্তব দক্ষতাও অর্জন করতে পারে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং শিক্ষাজীবনের মধ্যেই ইন্টার্নশিপ ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করা শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রে প্রস্তুত করবে এবং চাকরির সম্ভাবনা বাড়াবে।
তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিলে তারা নিজেই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। এছাড়া আইটি, ফ্রিল্যান্সিং এবং আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ক প্রশিক্ষণ তরুণদের দেশীয় ও বৈশ্বিক বাজারে কাজের সুযোগ দেবে।
সবশেষে বলা যায় শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে হলে শিক্ষানীতিতে মৌলিক পরিবর্তন এবং তরুণদের মানসিকতায় নতুন কিছু করার সাহস গড়ে তোলা অপরিহার্য। শুধুমাত্র চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোগ ও সৃজনশীলতা শিক্ষিত বেকারত্বের সংকট থেকে উত্তরণের মূল পথ।
শিক্ষিত বেকারত্ব বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সময়োপযোগী শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে নতুন কিছু করার মানসিকতা গড়ে তোলাই এই সংকট থেকে উত্তরণের মূল পথ।

