বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ২০২৪–২০২৬ পর্যায়ে একটি জটিল এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কোভিড‑১৯ পরবর্তী পুনরুদ্ধার, বাণিজ্যিক শুল্ক উত্তেজনা, উচ্চ ঋণস্তর, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ভূ‑রাজনৈতিক উদ্বেগগুলো মিলিতভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ২০২৬ সালে বিশ্বের মোট জিডিপি বৃদ্ধিকে ৩.৩% রাখছে, যা কিছুটা কম পূর্বাভাসের তুলনায় স্থিতিশীল কিন্তু প্রাক‑মহামারি গড়ের নিচে।
এই চাপের মধ্যে বাংলাদেশও সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, বিশেষত যখন বিশ্ববাজারে বিনিয়োগ ধীর, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি চাহিদা অস্থিতিশীল। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা মনে করছেন, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি মোটের ওপর স্থিতিশীল থাকলেও মাথাপিছু ঋণ, বাণিজ্য ঝুঁকি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রবৃদ্ধি সীমিত হতে পারে।
ঋণের বৃদ্ধি ও বাধা-
ভবিষ্যতের নীতিমালার ওপর বিশ্বব্যাংক ও IMF-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরকারী ঋণ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ১০০% পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, যা অতীতের চেয়ে অনেক বেশি।
এই ঋণের চাপ দেশগুলোর বাজেট নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে ঋণের পরিষেবা ব্যয় বাড়ছে, যার ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। ঋণের উচ্চতা মানব উন্নয়ন সূচক এবং নাগরিক জীবনে প্রভাব ফেলছে, বিশেষত যখন সুদের হারও উচ্চ অবস্থায় থাকে।
এছাড়া বাণিজ্য শুল্ক ও আন্তর্জাতিক বাধা তখনই আরো চাপ সৃষ্টি করছে যখন দেশগুলো ঋণ মকুব করতে চাইছে বা কখনো কখনো তারা ঋণ পুনরায় সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। এ ধরনের চাপ অর্থনৈতিক নীতির স্থিতিশীলতায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও বাংলাদেশ
ভারতসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল অর্থনীতির শক্ত অবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি গতিশীল হতে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে। জাতিসংঘের “World Economic Situation and Prospects 2026” রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে প্রায় ২.৭% হবে, যা ২০২৫-এর ২.৮% থেকে একটু কম।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিসংখ্যান সামান্য পার্থক্য দেখায়। United Nations Department of Economic & Social Affairs মনে করছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫‑২৬ অর্থবছরে ৪.৬% প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি ৭.১% থাকার সম্ভবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, World Bank-এর সর্বশেষ আপডেটেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জিডিপি ২০২৫‑২৬ অর্থবছরে ৪.৮% পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং ২০২৬‑২৭ অর্থবছরে ৬.১% পর্যন্ত বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে।
তবে, IMF‑এর আরও সাম্প্রতিক রিপোর্টে সংশোধিত অনুমান অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার ২০২৫‑২৬ এ প্রায় ৪.৯% পর্যন্ত নামতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি ৮‑৯% পর্যন্ত থাকতে পারে।
এই ডেটাগুলো দেখায়, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৪.৬%‑৪.৯% স্তরের মধ্যে থাকতে পারে, যা প্রাক‑মহামারি গড়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম গতিশীল অর্থনৈতিক বৃদ্ধি।
মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণে উচ্চ স্তরে বিরাজমান। সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী, দেশের মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.৭% পর্যায়ে আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুলনায় উচ্চ।
উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও হার কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর কঠোর অর্থনৈতিক নীতি চালাতে হচ্ছে, যা ঋণের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং বিনিয়োগের গতিকে চাপ দিচ্ছে। (কঠোর নীতি “tight monetary policy” বা সঙ্কুচিত নীতি “contractionary policy” চালায়, তখন তারা মূলত সুদের হার বৃদ্ধি করে, বাজারে টাকার সরবরাহ কমায় এবং মূল্যস্ফীতি “inflation” নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।)
একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের চাপ ও বিশ্ববাজারে ডলারের ওঠানামা বাংলাদেশে বিনিময় হারের উপর চাপ তৈরি করেছে। এইসব কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারকে কঠোর নীতি নিতে প্রলুব্ধ করছে।

রপ্তানি ও বৈদেশিক খাতের চাপ
বিশ্ববাজারে ধীর বৃদ্ধি, বাণিজ্য শুল্ক এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর ওপর চাপ পড়ছে। গার্মেন্টস, জুতাসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের চাহিদা কিছুট কমে গেছে, বিশেষত ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল হওয়ার কারণে। এই পরিস্থিতি রপ্তানি প্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া আমদানি খাতে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানি দামের ওঠানামা সামগ্রিক উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরো কঠিন হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা জন্মায়, যা বাংলাদেশসহ তেলের ব্যাপক আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি। মধ্যপ্রাচ্য থেকেই প্রায় ৩০% তেল সরবরাহ হয় এবং সেখানকার অস্থিরতা তেলের মূল্যকে তাত্ক্ষণিকভাবে প্রভাবিত করে, ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে—যা মুদ্রাস্ফীতি ও উৎপাদন খরচে প্রভাব ফেলে।
তাছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য ও পরিবহণ খাতে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের পথঝুঁকি বাংলাদেশের আমদানি‑রপ্তানি চাকচিক্যেও ঋণাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভবিষ্যতের ঝুঁকি ও সুযোগ-
যদিও বর্তমান চাপগুলো উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে, কিছু আশা ও সুযোগও আছে। IMF সম্প্রতি জানিয়েছে যে, ২০২৬ ও ২০২৭ সালে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস পেতে পারে—প্রতিভূর দরিদ্র দেশগুলোতে দাম স্থিতিশীল হতে পারে।
এছাড়া কিছু বড় অর্থনীতি—যেমন: ভারত—ভবিষ্যতে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বৈশ্বিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নীতির রূপান্তর, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অনেক দেশ নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।
তবে সমগ্র বিশ্বে উচ্চ ঋণ, বাণিজ্য বাধা, মুদ্রানীতির চাপ এবং ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে উত্তরণ না হলে দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশের ওপর বৈশ্বিক চাপের প্রভাব-
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক এই চাপের সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে। বিশ্ববাজারে উচ্চ সুদের হার ও ডলারের শক্ত অবস্থানের কারণে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ব্যয় বেড়েছে এবং নতুন ঋণ সংগ্রহ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাবে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন করে তুলতে পারে। রপ্তানি খাতেও চাপ বাড়ছে; বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে চাহিদা দুর্বল থাকায় পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি পণ্যের অর্ডার প্রবাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন আমদানি-নির্ভর শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সমাধান ও করণীয়
এই বৈশ্বিক চাপ মোকাবেলায় বাংলাদেশের জন্য জরুরি হলো নীতি‑পরিকল্পনা ও শক্ত নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ।
প্রথমত, বৈদেশিক ঋণের ব্যয় ও রিজার্ভ স্থিতিশীলতা রক্ষা করা অপরিহার্য, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা দেশীয় মুদ্রাস্ফীতি ও বিনিময় হারের ওপর চাপ কমায়। একে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজার‑ভিত্তিক নীতিতে আরো সক্ষম করে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন বাজারে প্রবেশ ও মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা দরকার, যাতে প্রধান রপ্তানি পণ্যের চাহিদা কমার প্রভাব সামলানো যায়। প্রযুক্তি ও ভ্যালু‑অ্যাডেড পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে রপ্তানি আয় এবং মূল্য স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
তৃতীয়ত, জ্বালানি দক্ষতা ও বিকল্প শক্তির উৎস সন্ধান, স্থানীয় উৎপাদন যোগান এবং আমদানি‑খরচ কমানোর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা উন্নত করা প্রয়োজন।
মুদ্রানীতিতে ভারসাম্য বজায় রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ কমানোর দিকেও সরকারের মনোযোগ বাড়ানো দরকার।
এ ছাড়া মনুষ্য সম্পদ উন্নয়ন, দক্ষ কর্মশক্তির সৃষ্টি, স্কিল‑বেসড ট্রেনিং এবং উদ্যোগ‑বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা বাংলাদেশের আর্থিক টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি হতে পারে। এসব পদক্ষেপ যুবশক্তিকে সম্পদে রূপান্তর করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
- লেখক—এফ. আর. ইমরান: নির্বাহী সম্পাদক, সিটিজেনস ভয়েস।
তথ্যসূত্র: International Monetary Fund (IMF): “World Economic Outlook (WEO)” রিপোর্ট। বিশেষ করে ২০২৬ সালের জিডিপি প্রবৃদ্ধি (৩.৩%) এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি সংক্রান্ত তথ্যের জন্য এটি প্রধান উৎস।
World Bank (বিশ্বব্যাংক): “Global Economic Prospects” এবং “Bangladesh Development Update”। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস (৪.৮% – ৬.১%) এখান থেকেই সংগৃহীত।
United Nations (UN): “World Economic Situation and Prospects (WESP) 2026” রিপোর্ট। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২.৭% হওয়ার পূর্বাভাসের মূল উৎস এটি।
UN DESA: United Nations Department of Economic and Social Affairs, যারা মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির (যেমন বাংলাদেশের ৪.৬% প্রবৃদ্ধি) পূর্বাভাস প্রদান করে।
Bangladesh Bank (বাংলাদেশ ব্যাংক): দেশের মুদ্রানীতি (Tight Monetary Policy), মুদ্রাস্ফীতি (৮.৭%) এবং ফরেক্স রিজার্ভ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাসিক প্রতিবেদন।
Export Promotion Bureau (EPB) & BGMEA: বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের চাহিদা ও বৈশ্বিক বাজারের চ্যালেঞ্জ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।
মিডল ইস্ট আই, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, টিবিএস, রয়টার্স, আল-জাজিরা, এনডিটিভি, এএফপি, ইকোনমিক টাইমস

