২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের ভোটাধিকার হরণ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়িষ্ণুতা কাটিয়ে ২০২৬ সালে জাতি এক নতুন সংসদ নির্বাচনের মুখোমুখি।
এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন তরুণ প্রজন্ম ও সচেতন সমাজ দেখেছিল, তার চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা। বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকরা এখন কেবল একজন জনপ্রতিনিধি খুঁজছেন না; তারা খুঁজছেন একজন আইনপ্রণেতা। যিনি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং গভীর দেশপ্রেমের মূর্ত প্রতীক হবেন। অতীতের টেন্ডারবাজি, ক্যাডার নিয়ন্ত্রণ এবং সিন্ডিকেট রাজনীতির যে কলঙ্কিত ইতিহাস মানুষ দেখেছে, তা থেকে চিরস্থায়ী মুক্তির লক্ষ্যেই এখনকার ভোটাররা অনেক বেশি সচেতন ও বিচারপ্রবণ।
শিক্ষাগত যোগ্যতা: আইন প্রণয়নের নূন্যতম ভিত্তি
সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ হলো রাষ্ট্রের জন্য আইন প্রণয়ন করা এবং জাতীয় বাজেটে গঠনমূলক ভূমিকা রাখা। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক সংসদ সদস্য আইন প্রণয়নের পরিবর্তে স্থানীয় উন্নয়ন বরাদ্দের নিয়ন্ত্রণ নিতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। ২০২৬-এর সচেতন সমাজ মনে করে, একজন সংসদ সদস্যের নূন্যতম স্নাতক বা সমমানের উচ্চশিক্ষা থাকা আবশ্যক। আধুনিক বিশ্বে ‘ডেটা-ড্রিভেন’ বা তথ্যনির্ভর নীতি প্রণয়নের যুগে একজন জনপ্রতিনিধি যদি বাজেট বিশ্লেষণ, অর্থনৈতিক সূচক বা আইনের মারপ্যাঁচ না বোঝেন, তবে তিনি সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন না। জেন-জি (Gen-Z) ভোটাররা এখন এমন প্রতিনিধি চায় যারা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং গ্লোবাল পলিটিক্স বুঝতে সক্ষম। সংসদ হবে জ্ঞানভিত্তিক বিতর্কের কেন্দ্র, কোনো স্তুতি বা গালিগালাজের মঞ্চ নয়।
দেশপ্রেম ও নৈতিক মূল্যবোধ: জাতীয় স্বার্থের অতন্দ্র প্রহরী
দেশপ্রেম কেবল নির্বাচনী ইশতেহারে বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সচেতন নাগরিকদের মতে, একজন সংসদ সদস্যের প্রথম এবং প্রধান আনুগত্য থাকতে হবে দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি। যার বিশাল সম্পদ বিদেশে পাচার হয়েছে বা যার পরিবারের প্রধান অংশ বিদেশের মাটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, তাদের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট প্রকট। মানুষ এমন এমপি চায়, যিনি সংকটের সময় দেশ ছেড়ে পালাবেন না। নৈতিকতা ও সততা হবে তার চরিত্রের মূল অলঙ্কার। হলফনামায় আয়ের উৎসের স্বচ্ছতা এবং আয়ের সাথে জীবনযাত্রার সংগতি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
পেশীশক্তি ও কালো টাকার অবসান: স্বচ্ছ নির্বাচনী সংস্কৃতি
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ‘টাকা যার ভোট তার’—এই অপসংস্কৃতি গণতন্ত্রকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে মানুষ এমন এমপি চায় যিনি পেশীশক্তির জোরে নয়, বরং জনসেবা ও মেধার মাধ্যমে জনপ্রিয়। মানুষ আর কোনো ‘ঋণখেলাপি’ বা ‘ভূমিদস্যু’কে সংসদের আসনে দেখতে চায় না। ভোটারদের মতে, সংসদ সদস্য পদটি কোনো ব্যবসায়িক বিনিয়োগ নয় যে, পাঁচ বছরে তা কয়েকগুণ মুনাফাসহ উসুল করতে হবে। সৎ কিন্তু বিত্তহীন মানুষও যেন মেধার ভিত্তিতে সংসদে যেতে পারেন, সেই নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে নতুন বাংলাদেশের সার্থকতা।
স্থানীয় অভিভাবকত্ব বনাম উন্নয়ন সিন্ডিকেট
একটি দীর্ঘস্থায়ী অভিযোগ হলো, এমপিরা স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব ‘বলয়’ বা ‘হেলমেট বাহিনী’ তৈরি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। সচেতন নাগরিকরা চান এমন একজন এমপি যিনি টিআর-কাবিখা বা রাস্তার ঠিকাদারি নিয়ে ব্যস্ত না থেকে স্থানীয় সরকার (ইউপি চেয়ারম্যান বা মেয়র) এবং প্রশাসনের কাজে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবেন। তিনি হবেন এলাকার জনগণের জন্য সহজে প্রবেশযোগ্য (Accessible) এক অভিভাবক। প্রতিটি এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার সমূলে বিনাশ ঘটানোই হবে একজন আদর্শ জনপ্রতিনিধির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা: জানমালের নিশ্চয়তা
রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া। একজন জনপ্রতিনিধি হবেন এলাকার শান্তির অগ্রদূত। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে আশ্রয় না দিয়ে আইনের হাতে সোপর্দ করার মানসিকতা এমপির থাকতে হবে। মানুষ যেন রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারে এবং দিনে নির্ভয়ে নিজের পেশা পরিচালনা করতে পারে, তা নিশ্চিত করার দায়বদ্ধতা এমপির ওপর বর্তায়। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত রেখে পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করতে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করাই হবে নতুন দিনের সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব।
অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাতের আধুনিকায়ন: টেকসই প্রবৃদ্ধি
সংসদ সদস্যদের একটি বড় ভূমিকা থাকা উচিত অর্থনৈতিক পলিসি তৈরিতে। স্থানীয় শিল্প-কারখানা, কুটির শিল্প এবং বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) বিকাশে এমপিকে হতে হবে ভিশনারি। তিনি কেবল ফিতা কেটে উদ্বোধন করবেন না, বরং নিজ এলাকার ব্যবসায়ীরা কেন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বা নতুন উদ্যোক্তারা কেন বিনিয়োগ করতে পারছে না—তার কারণ খুঁজে বের করে সংসদে আওয়াজ তুলবেন। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং স্থানীয় পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন এমপির কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে তাকে সাহসী ভূমিকা নিতে হবে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা
২০২৬ সালে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষিত বেকারত্ব। সচেতন তরুণ সমাজ এমন সংসদ সদস্য চায় যিনি নিজের এলাকায় কোনো লোক দেখানো মেগা প্রজেক্টের চেয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেশি মনোযোগী হবেন। তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাত, ফ্রিল্যান্সিং হাব এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রসারে যিনি দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন, তরুণরা তাকেই বেছে নিতে চায়। দেশের মোট ভোটারের বিশাল অংশ তরুণ জনশক্তি চায় এমন একজন প্রতিনিধি যিনি তাদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং গ্লোবাল মার্কেটপ্লেসে টিকে থাকার সুযোগ তৈরি করে দেবেন।
শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন অসম্ভব। একজন সংসদ সদস্যকে কেবল স্কুল-কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হওয়ার নেশায় মত্ত থাকলে চলবে না। তাকে নজর দিতে হবে শিক্ষার গুণগত মানের ওপর। আধুনিক ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে তাকে কাজ করতে হবে। নিজ এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ করে মেধাবীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা একজন আদর্শ এমপির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
নারী ও সংখ্যালঘুর অধিকার: অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদ
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) সমাজ গঠনে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে সচেতন মানুষ এমন একজন সংসদ সদস্য চায় যিনি জেন্ডার সেনসিটিভ হবেন। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যিনি সোচ্চার থাকবেন। বিশেষ করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর কোনো আঘাত আসলে যিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বুক দিয়ে আগলে রাখবেন—এমন মানবিক জনপ্রতিনিধিই বর্তমান বাংলাদেশের কাম্য।
প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষা ও মর্যাদা প্রদান
বাংলাদেশের অর্থনীতির ফুসফুস হলো প্রবাসী রেমিট্যান্স। কিন্তু প্রবাসীরা বিমানবন্দরে হয়রানি থেকে শুরু করে দেশে নিজেদের জমিজমা রক্ষা করতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। সংসদে এমন প্রতিনিধি থাকতে হবে যারা প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখবেন। প্রবাসীদের বিনিয়োগ সুরক্ষা, তাদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং বিমানবন্দরে সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করতে এমপির তদারকি ও সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি। প্রবাসীরা যেন তাদের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক মূল্যায়ন ও সম্মান দেশে ফিরে পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
কাঠামোগত উন্নয়ন ও টেকসই পরিকাঠামো
উন্নয়ন মানে কেবল ইট-পাথরের জৌলুস নয়, বরং টেকসই ও পরিকল্পিত অবকাঠামো। সচেতন নাগরিকরা চান এমন এমপি, যিনি শুধু টেন্ডারের জন্য রাস্তাঘাট করবেন না, বরং দীর্ঘমেয়াদী ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেবেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উপকুলীয় বা হাওড় অঞ্চলের এমপিদের হতে হবে বিশেষভাবে সচেতন। মেগা প্রজেক্টের চেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ ছোট ও মাঝারি প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন করা এখন সময়ের দাবি।
জবাবদিহিতা ও নাগরিকদের দায়িত্ব: সচেতনতার জয়গান
সংসদ সদস্য হওয়ার পর পাঁচ বছর পর দেখা মিলবে—এই ধারণাটি এখন সেকেলে। মানুষ এখন এমন এমপি চায় যারা নিয়মিত এলাকায় ‘গণশুনানি’ করবেন। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ‘রাইট টু রিকল’ বা প্রতিনিধি প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নিয়ে সংসদে আলোচনার সাহস থাকতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদেরও একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। কেবল টাকা বা সাময়িক আবেগের বশবর্তী হয়ে ভোট দিলে আমরা যোগ্য প্রতিনিধি পাবো না। ভোটারদের উচিত প্রার্থীর অতীত আমলনামা ও দক্ষতা যাচাই করা। নাগরিকরা সচেতন হলেই কেবল দুর্নীতিবাজরা পিছু হটতে বাধ্য হবে।
পরিশেষে: রূপান্তরের নতুন সারথি
পরিশেষে, ২০২৬ সালের বাংলাদেশের মানুষ একজন ‘শাসক’ নয়, বরং একজন ‘সেবক’ চায়। এমন একজন সংসদ সদস্য চাই যার মাঝে থাকবে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মিলিত চেতনা। তিনি হবেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ, জনগণের কাছে বিনয়ী এবং জাতীয় স্বার্থে আপসহীন। সঠিক তথ্য, সৎ উদ্দেশ্য এবং আধুনিক চিন্তা নিয়ে কাজ করতে পারলেই আমাদের জাতীয় সংসদ প্রকৃত অর্থে জনগণের সার্বভৌমত্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন এবং প্রকৃত গণতন্ত্র কায়েম করতে হলে আগামী নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের কোনো বিকল্প নেই।
- লেখক—এফ. আর. ইমরান: নির্বাহী সম্পাদক, সিটিজেনস ভয়েস।

