দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশের শহরগুলো আজ এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে—’দূষণ’। ধুলো, ধোঁয়া, শব্দ এবং বিষাক্ত বর্জ্যের দখলে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে নগর জীবনের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস।
একসময় যে শহরগুলোকে উন্নয়ন ও আধুনিকতার প্রতীক মনে করা হতো, আজ সেখানেই বাস করা মানুষের জন্য পরিষ্কার বাতাস, নিরাপদ পানি এবং শান্ত পরিবেশ ক্রমশই দুর্লভ হয়ে উঠছে। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, যানজটের কালো ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা এবং শিল্পবর্জ্যের বিষাক্ত প্রভাব নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও জীবনের মানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। ফলে নগর দূষণ এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—দূষণে আচ্ছন্ন নগর জীবনকে কীভাবে আবার বাসযোগ্য করা সম্ভব?
বাংলাদেশের নগর জীবনে বায়ুদূষণ এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা প্রায়শই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় উঠে আসে। অনেক সময় ঢাকার বায়ুমানের সূচক (AQI) ২০০-এর ওপরে চলে যায়, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী “খুবই অস্বাস্থ্যকর” পর্যায় হিসেবে বিবেচিত। এই পরিস্থিতিতে কোটি মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে প্রতিদিনই শরীরে প্রবেশ করছে ক্ষতিকর ধূলিকণা ও বিষাক্ত গ্যাস।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘IQAir’-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক বায়ুদূষিত দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশে সূক্ষ্ম ধূলিকণা PM2.5-এর বার্ষিক গড় ঘনত্ব প্রায় ৭৮ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO)-এর নিরাপদ সীমা ৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারের তুলনায় প্রায় ১৫ গুণ বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন: পাকিস্তান ও ভারতও এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে। একই প্রতিবেদনে ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম দূষিত রাজধানী শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে বছরের বিভিন্ন সময় বাতাসের মান “অস্বাস্থ্যকর” বা “অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর” পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
বায়ুদূষণ শুধু পরিবেশের জন্য নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখের বেশি মানুষ অকাল মৃত্যুবরণ করেন, যার মধ্যে রয়েছে কয়েক হাজার শিশু, যারা পাঁচ বছরের কম বয়সী। একই সঙ্গে লক্ষাধিক মানুষ শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, হৃদরোগ ও স্ট্রোকসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগেও বছরে লক্ষাধিক রোগী বায়ুদূষণজনিত শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার জন্য চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হিসেবে দায়ী পুরনো ও অযোগ্য যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন, ইটভাটার ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধূলিকণা এবং অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন। শীতকালে বাতাসের গতি কমে যাওয়ায় দূষিত কণাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বাতাসে স্থির থাকে, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।
নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে পানি দূষণ, শব্দ দূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটও ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য নদী ও খালে ফেলা, যানবাহনের অবিরাম হর্ন এবং যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা শহরের পরিবেশগত ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
শহরের সবুজ এলাকা ক্রমেই কমে আসছে। গাছপালা কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে বাতাস পরিশোধনের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভৌগোলিক ও মৌসুমি প্রভাব—বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুম বা শীতকালে বাতাসের কম গতিবেগ—দূষণের মাত্রা আরও বৃদ্ধি করছে। এছাড়া প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা দূষণও দেশের মোট বায়ুদূষণের প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব ফেলছে।
নগর দূষণ মানুষের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। দীর্ঘমেয়াদী দূষণের ফলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুসের সংক্রমণ, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। এর ফলে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অসুস্থতার কারণে কাজের সময় কমছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে তীব্র গরমের কারণে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন কমে গিয়ে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ১.৩৩ থেকে ১.৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান। বিশেষ করে নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ যেমন: নির্মাণ শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও খোলা পরিবেশে কাজ করা মানুষ—সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছেন। ফলে কাজের সময় কমছে, আয় কমছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
দূষণ থেকে মুক্তি পেতে হলে নগর দূষণ মোকাবিলায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরশক্তি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি করা শহরের বাতাসকে স্বস্তিদায়ক রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে শহরে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ এবং সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, কারণ গাছপালা প্রাকৃতিকভাবে বাতাস পরিশোধিত রাখে এবং নগরের তাপমাত্রা কমায়।
যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া কমাতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন, সাইকেল বা হাঁটার অভ্যাস বৃদ্ধি করতে হবে। পুরনো এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী গাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণ বা আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা জরুরি। ইটভাটার ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং অবৈধ দূষণকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করাও দূষণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সুসংহত করতে হবে। যত্রতত্র ময়লা বা প্লাস্টিক পোড়ানো বন্ধ করা, পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর। এর সঙ্গে শহরের ছাদ, বারান্দা এবং রাস্তার পাশে গাছ লাগানো, নির্মাণকাজের সময় ধুলাবালু নিয়ন্ত্রণ এবং জলাভূমি ও খোলা জায়গা সংরক্ষণ করা শহরের বায়ু মান উন্নয়নে সহায়ক।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। দূষিত সময়ে এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহার, ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা, এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা এবং ধূমপান বর্জন করলে দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সামাজিক উদ্যোগ মিলিয়ে শহরকে পুনরায় স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য করা সম্ভব। পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণই নগর জীবনের শ্বাসরোধী দূষণ প্রতিহত করার মূল চাবিকাঠি।

