একবিংশ শতাব্দীতে উন্নয়ন, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা। যে দেশ যত বেশি দক্ষ, সৃজনশীল ও গবেষণাভিত্তিক মানবসম্পদ তৈরি করতে পারে, সেই দেশই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। বাংলাদেশেও শিক্ষার বিস্তারে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে—সাক্ষরতার হার বেড়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণও আগের তুলনায় অনেক বেশি। তবে এই অগ্রগতির পরও বিশ্বমানের শিক্ষার সূচকে দেশ এখনও প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। আন্তর্জাতিক র্যাংকিং, গবেষণা সক্ষমতা, দক্ষতা উন্নয়ন ও শিক্ষা অবকাঠামোর নানা সূচক বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখায়।
বাংলাদেশে শিক্ষার মান উন্নয়নে কয়েকটি কাঠামোগত ও নীতিগত সমস্যা বিশেষভাবে প্রভাবশালী। বাজেট এবং অবকাঠামোর সীমিততা শিক্ষার মান বাড়াতে বড় প্রতিবন্ধকতা। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, শিক্ষায় জিডিপির ৪–৬ শতাংশ বিনিয়োগ করা উচিত, কিন্তু বাস্তবে বরাদ্দ অনেক কম। এর ফলে উন্নত গবেষণাগার, আধুনিক শ্রেণীকক্ষ এবং শিক্ষার আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষণ পদ্ধতিতেও ঘাটতি রয়েছে। অনেক শিক্ষক এখনও মুখস্থনির্ভর ও সেকেলে পদ্ধতিতে পড়ান, যা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা এবং উদ্ভাবনের চর্চাও সীমিত। গবেষণায় জিডিপির তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও শিক্ষার পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং সুশাসনের অভাব শিক্ষার মান বজায় রাখতে ব্যর্থতা ঘটাচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব শিক্ষার গুণগত মানে সরাসরি প্রভাব ফেলে। নীতিগত সমস্যাও বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা মূলত সার্টিফিকেট বা পাশের হারের দিকে মনোনিবেশ করে, যার ফলে মানসম্মত শিক্ষা, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব দক্ষতার বিকাশ সীমিত থাকে।
বিশ্বমানের শিক্ষা অর্জনের জন্য শক্তিশালী গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে এটি এখনও দুর্বল। অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্পন্ন গবেষণা কার্যক্রম সীমিত। STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) শিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, যা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা কঠিন করে তোলে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও দেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৮টি দেশের মধ্যে ১২৯তম। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সীমিত উপস্থিতি দেখায়; অনেক সময় শীর্ষ ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত থাকে না।
টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৬ অনুযায়ী, মাত্র পাঁচটি বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ৮০১–১০০০ অবস্থানের মধ্যে রয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি। এছাড়া কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ১০০১–১২০০ রেঞ্জের মধ্যে রয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য।
শিক্ষার এই দুর্বল চিত্র আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, ১২ বছরের শিক্ষার শেষে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাত্র সপ্তম শ্রেণির সমতুল্য জ্ঞান অর্জন করছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সে শিক্ষার্থীর অন্তত ১১ বছরের সমমানের দক্ষতা থাকা উচিত, অথচ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা মাত্র ৬.৫ বছরের সমমানের শিক্ষা অর্জন করছে। আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণী পরীক্ষায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের গড় স্কোর ৩৬৮, যেখানে ৩০০ হলো ন্যূনতম এবং ৬২৫ হলো উন্নত দক্ষতার সূচক। এটি দেশের শিক্ষার প্রকৃত গুণগত দুর্বলতার প্রমাণ।
শিক্ষার মান কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণগুলো হলো—শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের অভাব, মানসম্মত পাঠ্যপুস্তকের অভাব, শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার অভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা। ২০০৯ সালে দেশে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু হয়েছিল, তবে ২০২৩ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হলেও তা এক বছরের মধ্যেই বাতিল হয়ে যায়। ২০২২ সালের বৈশ্বিক সৃজনশীল ইনডেক্সে ১৩৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১২৯তম অবস্থানে ছিল।
বাংলাদেশকে বিশ্বমানের শিক্ষা অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জিডিপির তুলনায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, গবেষণা ও উন্নয়নে বিশেষ তহবিল গঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের অবকাঠামো আধুনিকীকরণ অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের কার্যক্ষমতা ও উৎসাহ বাড়ানো যাবে।
তৃতীয়ত, কারিকুলাম ও শিক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকীকরণ অপরিহার্য। যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক এবং বাস্তবমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল, বিশ্লেষণাত্মক এবং কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারে। চতুর্থত, প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণীকক্ষে ডিজিটাল ল্যাব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং অনলাইন শিক্ষণ ব্যবস্থার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য উৎসাহিত করা, শিল্পখাতের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।
পরিশেষে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রশাসনের সংস্কার, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার মান ধারাবাহিকভাবে উন্নত করা সম্ভব। এই পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শিক্ষার গুণগত মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনতে পারবে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে সক্ষম হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতা অর্জন করবে।

