বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক রাজধানীর কড়াইল বস্তিসহ দেশের ১৪টি স্থানে এই কর্মসূচির উদ্বোধন সামাজিক সুরক্ষা খাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে এই মহৎ উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করছে এর স্বচ্ছতা, অর্থের সংস্থান এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়নের ওপর।
সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ডের গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট
বিগত ৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে গ্রাস করেছে। পিপিআরসির সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার বর্তমানে প্রায় ২৭ শতাংশ। এই ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য এবং খাদ্য অনিরাপত্তার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা।
পরিবারে যখন খাদ্যের অভাব দেখা দেয়, তখন সাধারণত মায়েরাই প্রথমে তাদের খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিশুদের পুষ্টির ওপর। এই বৈষম্যের চক্র ভাঙতে এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে স্বস্তি দিতে মাসিক ২,৫০০ টাকার এই ভাতা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। এটি কেবল একটি আর্থিক সহায়তা নয়, বরং দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সম্পদের সংস্থান
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা বিশাল। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় দুই কোটি পরিবারের কাছে এই সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৭,৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে এই ভাতার আওতায় আনা হলেও- পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে প্রতি মাসে প্রায় ৫ হাজার কোটি এবং বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বিপুল অর্থের সংস্থান করা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায়ের হার অত্যন্ত কম। এই কর্মসূচি টেকসই করতে হলে সরকারকে অবশ্যই পরোক্ষ করের বোঝা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের পরিধি বাড়াতে হবে এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর সংস্কার আনতে হবে। রাজস্ব খাতের আমূল পরিবর্তন ছাড়া এত বড় সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প সফল করা অসম্ভব।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচন ও স্বচ্ছতা
প্রতিবেদনটির মূল দাবি হলো—এই কর্মসূচিকে অবশ্যই রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিভিন্ন প্রকল্পে প্রকৃত অভাবী মানুষের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা তাদের আত্মীয়স্বজনরাই বেশি সুবিধা পেয়েছেন।
ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে এই পুরনো অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি ঘটলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাবে। উপকারভোগী নির্বাচনে কোনো দলীয় পরিচয় নয়, বরং কেবল দারিদ্র্য ও প্রয়োজনীয়তাকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
যদি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মী হওয়ার কারণে কেউ কার্ড পায় আর প্রকৃত দুস্থ ব্যক্তি বঞ্চিত হয়, তবে তা সামাজিক বৈষম্যকে আরও প্রকট করবে।
সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো ও নকশাগত সংস্কার
বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা খাতের অন্যতম দুর্বলতা হলো এর বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা। বর্তমানে প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১০০টিরও বেশি কর্মসূচি বিচ্ছিন্নভাবে চলছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা পাচ্ছেন, আবার অনেকে কিছুই পাচ্ছেন না। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষিপ্ত প্রকল্পগুলোকে একটি সুশৃঙ্খল ও সমন্বিত ‘এক ছাতার নিচে’ নিয়ে আসা জরুরি।
একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির মাধ্যমে উপকারভোগীদের চিহ্নিত করা গেলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধ হবে।
মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রতারণা রোধে কঠোর ব্যবস্থা
ইতিমধ্যেই দেশের কিছু জায়গায় ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার নামে প্রতারণার খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সরকারি সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় মধ্যস্বত্বভোগী বা ‘দালাল’ চক্র। এই চক্রটি দরিদ্র মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়।
সরকারকে এই ডিজিটাল যুগে সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ প্রেরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো ধরনের প্রতারণা বা অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে সরকারের এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
পরিশেষে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, এটি দেশের কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। ২,৫০০ টাকার এই মাসিক ভাতা একটি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা ও শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
তবে সরকারের জন্য মূল পরীক্ষা হলো এই বিপুল অর্থের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করা এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে যদি এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে দারিদ্র্য বিমোচনের একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন জাতি গঠনে ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচিগুলোকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখাই হবে সময়ের প্রধান দাবি।

