ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রুমিন ফারহানা ৩৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। পরে দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর বিপরীতে বিএনপি সমর্থন দিয়েছিল মিত্র দলের এক প্রার্থীকে।
প্রশ্ন: শুরুতেই এই বিজয়ের বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই।
রুমিন ফারহানা: প্রথমেই আমি মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি আমাকে মাঠে টিকে থাকার শক্তি ও সাহস দিয়েছেন। আমার এলাকার নেতা–কর্মী ও আসনের প্রত্যেক ভোটারের প্রতি আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁরা আমাকে সাহস দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন এবং পাশে থেকেছেন। তাঁরা অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন; শ্রম দিয়েছেন। একেকজন কর্মী কতটা কষ্ট করেছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
দিনের পর দিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেছেন। অনেকেই ঠিকমতো ঘুমাননি। এই জয় আমার একার নয়, এটি আমার নেতা–কর্মীদের জয়। এমনকি যাঁরা আমাকে ভোট দেননি, কঠোর সমালোচনা করেছেন বা অশোভন ভাষায় আক্রমণ করেছেন, তাঁদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। কারণ, তাঁদের আচরণ অনেক সাধারণ মানুষকে আমার পক্ষে আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমার আসনের প্রায় পাঁচ লাখ ভোটারের প্রত্যেকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
রুমিন ফারহানা: আমি পরিষ্কারভাবে বলছি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তা ছাড়া এই এলাকায় সুষ্ঠু ভোট সম্ভব হতো না। প্রশাসন পুরোপুরি আমার বিপক্ষে ছিল। প্রশাসন যেকোনো মূল্যে বিএনপির জোটের প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করেছে। শুরু থেকেই প্রশাসন আমার সঙ্গে বৈষম্যমূলক, অবমাননাকর আচরণ করেছে। বিএনপির নেতা–কর্মীরা সমানে আইন ভঙ্গ করলেও প্রশাসন চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। প্রশাসন কানা–বোবা হয়ে ছিল। তবে সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকায় না থাকলে আমি ভোট করতে পারতাম না। পুলিশও সহযোগিতা করেছে। যেখানেই অনিয়ম হয়েছে, আমি সেনাবাহিনীকে জানিয়েছি। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছে। কেউ আমার কাছে কোনো অনৈতিক সুবিধা দাবি করেনি, আমিও কাউকে কিছু দিইনি।
রুমিন ফারহানা: নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। তার কারণ, গত ১৮ মাসে বিএনপি যা করেছে, আমি যদি তাদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতাম, সেই কর্মকাণ্ডের দায় আংশিকভাবে আমার ওপরও আসত। তবে আমি ওই সময় প্রকাশ্যে অনেক বিষয়ে সমালোচনা করেছি। ফলে দল মনোনয়ন না দেওয়াটা আমার জন্য এক অর্থে আশীর্বাদই হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত কাজ, পারিবারিক ঐতিহ্য ও এলাকার মানুষের আস্থা—এসব মিলিয়েই আমি জয় পেয়েছি। বিএনপির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকাটা আমার জন্য সুবিধাজনক হয়েছে বলেই মনে করি।
রুমিন ফারহানা: এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে কিছু ভাবিনি। সময়ই সিদ্ধান্ত দেবে।
রুমিন ফারহানা: নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল। অনেকে বলছেন, স্বামী হয়তো অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন, তবে স্ত্রী বলেছেন, তিনি আমাকে ভোট দেবেন। আমি নারী ভোটারদের আশ্বাস দিয়েছি, তাঁরা সহজে আমার কাছে আসতে পারবেন; নিজেদের সমস্যা জানাতে পারবেন এবং আমি তাঁদের পাশে দাঁড়াব, যা অন্য অনেক প্রার্থীর পক্ষে কঠিন। নারীরা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। বলা যায়, তাঁদের একচেটিয়া সমর্থন আমি পেয়েছি। তাই তাঁদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতাও অনেক বেশি।
রুমিন ফারহানা: গত দুই সপ্তাহে আমার এলাকায় ৪০-৫০টি কর্মসূচি হয়েছে। সপ্তাহে দু-তিনটিও হয়েছে। একটি টাকাও নেতা–কর্মীরা আমার কাছ থেকে নেননি। নির্বাচনের সময় দরিদ্র মানুষ এক হাজার টাকা এনে দিয়েছেন। মধ্যবিত্তরা এক-দুই লাখ টাকা দিয়েছেন। অনেক প্রান্তিক মানুষ তাঁদের এক বছরের সঞ্চয় এনে দিয়েছেন। আমি নিতে চাইনি, তবু তাঁরা জোর করে দিয়েছেন। এ কারণে আমি বলি, আমি একা এমপি হইনি, আমার পাঁচ লাখ ভোটার এমপি হয়েছেন।
রুমিন ফারহানা: আমার প্রথম অগ্রাধিকার অবকাঠামো, বিশেষ করে রাস্তাঘাট। দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। আমাদের এখানে গ্যাসক্ষেত্র আছে, কিন্তু অনেকের ঘরে গ্যাস নেই। আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ গ্যাস পাবে, এটা নিশ্চিত করতে চাই। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, মন্দির-মসজিদসহ শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন করতে চাই। আশুগঞ্জ একটি বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে গ্যাস, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও বন্দর আছে। এসব সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে চাই, যাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
রুমিন ফারহানা: অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাই।
রুমিন ফারহানা: আমি অবশ্যই সোচ্চার থাকব। তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে কারও অধিকার কেউ কাউকে এনে দেয় না, অর্জন করে নিতে হয়। ধরুন, আমাকে তো দল মনোনয়ন দেয়নি। দল কি জানত না, আমার এলাকায় আমার কী অবস্থান? আর যদি না জেনে থাকে, সেটা দলের ব্যর্থতা। কিন্তু দল মনোনয়ন দেয়নি। আমাকে দাঁড়িয়ে যেতে হয়েছে আল্লাহ্র ওপর ভরসা করে; মানুষের ওপর ভরসা করে। বিএনপি নারীদের বিষয়ে খুব সম–অধিকারের কথা বলে। আমরা তো দলে এ কারণেই গিয়েছিলাম যে নারী হিসেবে আমি বৈষম্যের শিকার হবে না। তারা কেন ৩ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেয়? বিএনপিতে নারীদের এই অবস্থান জানলে আমি কখনোই বিএনপি করতাম না।
রুমিন ফারহানা: আমি তা মনে করি না। বরাদ্দ সবার জন্য সমান। সততার সঙ্গে কাজ করতে চাইলে স্বতন্ত্র হিসেবেও সম্ভব। কেউ যদি অযথা বাধা দেন, তার জবাব জনগণ দেবে।
সূত্র: আপনাকে ধন্যবাদ।
রুমিন ফারহানা: আপনাদেরও ধন্যবাদ।
রুমিন ফারহানা নির্বাচনে জয়কে নেতা–কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সম্মিলিত সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয় পাওয়া তাঁর জন্য ইতিবাচক হয়েছে বলে দাবি করে তিনি অবকাঠামো, গ্যাস সরবরাহ ও নারীর অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সূত্র: প্রথম আলোর সাক্ষাৎকার; নিয়েছেন —শুভংকর কর্মকার ও বদর উদ্দিন

