শেয়ারবাজারে লাভের সম্ভাবনা যত বড়, ঝুঁকিও ততটাই বাস্তব। সঠিক পরিকল্পনা ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত না নিলে বিনিয়োগ সহজেই লোকসানে পরিণত হতে পারে এমনটাই মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, কিছু সাধারণ ভুল এড়াতে পারলেই বিনিয়োগকে অনেক বেশি নিরাপদ ও কার্যকর করা সম্ভব।
প্রথমত, গুজব বা ‘ইনসাইড’ তথ্যের ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ করা বড় ঝুঁকির কারণ। বাজারে দ্রুত লাভের আশায় নানা ধরনের অপ্রমাণিত তথ্য ছড়ায়। যাচাই ছাড়া এসবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষতির সম্ভাবনা বেড়ে যায়!
দ্বিতীয়ত, কোম্পানি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়া বিনিয়োগ করাও একটি বড় ভুল। অনেক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা, ব্যবসার ধরন বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশ্লেষণ না করেই শেয়ার কিনে ফেলেন। এতে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
একই সঙ্গে একটি কোম্পানি বা খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ ঝুঁকি বাড়ায়। কোনো নির্দিষ্ট খাতে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হলে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। তাই বিনিয়োগে বৈচিত্র্য রাখা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশে অনেক বিনিয়োগকারী অন্যের পরামর্শ বা গুজবের ওপর নির্ভর করেন, যা বড় ভুল। তার মতে, বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলে দেরিতে প্রবেশ করাও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় ঘন ঘন কেনাবেচা করাও বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামায় বিচলিত হয়ে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিলে লোকসান বাড়ে। এ ক্ষেত্রে ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট হয়।
বিনিয়োগে মানসিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লোভ ও আতঙ্ক এই দুই প্রবণতা অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্তে ঠেলে দেয়। দাম বাড়লে বেশি দামে কেনা এবং কমলে আতঙ্কে বিক্রি করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, কোনো কোম্পানির ব্যবস্থাপনা, স্পন্সরদের সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা যাচাই না করাও বড় ভুল। একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের দক্ষতা ও অতীত রেকর্ড ভবিষ্যৎ পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতের প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
ডিএসইর সাবেক পরিচালক মো. শাকিল রিজভী মনে করেন, বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, অতীত কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। তার মতে, সার্বিক তথ্য বিশ্লেষণ ছাড়া বিনিয়োগ করা ঠিক নয়।
অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারকে ব্যাংকের মতো নিরাপদ মনে করেন, যা ভুল ধারণা। এখানে ঝুঁকি বেশি এবং ভুল সিদ্ধান্তে অল্প সময়েই বড় ক্ষতি হতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে নিজের ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি।
ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করাকে বিশেষভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাজার অনুকূলে না থাকলে ঋণের চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে এটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
এছাড়া নীতিগত পরিবর্তন, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তগুলো বাজারে প্রভাব ফেলে। এসব বিষয়ে নজর না রাখলে বিনিয়োগকারীরা অপ্রত্যাশিত ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন।
সবশেষে বিশ্লেষকদের মত, শেয়ারবাজার কোনো জুয়া নয়। এটি একটি পরিকল্পিত আর্থিক প্রক্রিয়া। সঠিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ধৈর্য ও কৌশল থাকলে এখান থেকে ভালো মুনাফা অর্জন সম্ভব। অন্যথায়, হঠকারী সিদ্ধান্তই বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

